রাখাইন রাজ্য থেকে আরাকান দেশ: এটাই কি অনিবার্য বাস্তবতা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আমরা সবাই জানি সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, আরাকান আর্মি নামক একটি স্বশস্ত্র সংগঠন মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের ৭০% এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। যদিও গণতান্ত্রিক পন্থা না থাকায় স্বশস্ত্র গোষ্ঠি দ্বারা এটি সংগঠিত হচ্ছে ফলে গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ সরাসরি সহযোগিতা বা পক্ষপাত করছেনা। এমনকি পরোক্ষভাবেও সহযোগিতা করতে শুনিনি।
কিন্তু যদি বাস্তবে এই অঞ্চলে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় তাহলে এখানকার অনেক কিছু বদলে যাবে। প্রথমত একটি নতুন রাষ্ট্র মানে নতুন মানচিত্র এবং নতুন সীমানা। যেহেতু নতুন রাষ্ট্রটির সমূদ্র তটরেখা আছে সেহেতু এই রাষ্ট্র দ্রুত বৈশ্বিক যোগাযোগে ভূমিকা রাখবে। এই রাষ্ট্রের সঠিক স্বীকৃতি ও বিকাশ না হলে কিছু সমস্যা তৈরী হতে পারে।
আরাকান রাষ্ট্র সঠিকভাবে বিকশিত না হলে কি কি সংকট তৈরী করতে পারে?
প্রথমত,
জলদস্যুতার বিস্তার ঘটতে পারে। এতে করে আঞ্চলিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। যেসব দেশ সমুদ্রের এই অংশে বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনা করে তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরী হতে পারে।
দ্বিতীয়ত,
মায়ানমারের সরকার দীর্ঘদিন যাবত এই অঞ্চলের লোকদের শিক্ষাবঞ্চিত করে রেখেছে। ফলে নতুন রাষ্ট্র সঠিক পথে পরিচালিত না হওয়ার ভয় রয়েছে। এতে আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট হতে পারে।
তৃতীয়ত,
এখানে জাতিগত এবং ধর্মীয় ইস্যু এবং তাদের বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে মতভিন্নতার কারণে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ বা সংকট দেখা দিতে পারে।
চতুর্থত,
রাখাইন রাজ্য বা তার আশপাশে যেসব দেশ বা কোম্পানীর বিনিয়োগ রয়েছে তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
পঞ্চমত,
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ জনতার কাছে অস্ত্র চলে গেছে। সে অস্ত্র যদি থামানো না যায় তাহলে তার অবারিত, অবৈধ ও সীমানার বাইরে তার ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। যা প্রতিবেশীদের জন্য আতংকের বিষয়।
আরাকান রাষ্ট্র সঠিকভাবে বিকশিত হলে কি কি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে?
একটি নতুন রাষ্ট্র নতুন যেসব সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে সেগুলো আমরা আলোচনা করতে পারি। এই অঞ্চলে নতুন এই রাষ্ট্রের জন্ম কি কি ধরনের সম্ভাবনা, সুযোগ ও ইতিবাচক বিষয় নিয়ে আসতে পারে তা আলোচনা করা যাক।
প্রথমত,
এই অঞ্চলে নতুন একটি শক্তির জন্মের মাধ্যমে শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে কিছু ক্ষেত্রে। মিয়ানমারের একটি প্রতিবেশী ও একটি বিপক্ষ শক্তি তৈরী হবে। এতে করে সেদেশের সামরিক বা যেকোনো সরকার তাদের নতুন প্রতিবেশীর কথা মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি সাজাবে। আশা করা যায় অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা নতুন কিছু সহনীয় দিক উন্মোচন করবে।
দ্বিতীয়ত,
এই নতুন দেশকে বিশ্ব সহযোগিতার মাধ্যমে যদি জনগনের জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে আসে এবং দেশটি যদি গণতান্ত্রিক ধারায় বিকশিত হয় । তাহলে মিয়ানমার সরকার তাদের দেশের জনগনের জন্য কাজ করার প্রয়াস পাবে। উন্নয়নের একটি প্রতিযোগিতামূলক সৃষ্টি হবে
তৃতীয়ত,
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু সমস্যা এখন বাংলাদেশে আটকে থানা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। নতুন রাষ্ট্র হলে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। এতে বিশ্বের বড় একটি সমস্যার সমাধান হবে।
চতুর্থত:
নতুন রাষ্ট্রে নতুন ভূমিতে বিভিন্ন দেশ চাইলে বিনিয়োগ করতে পারবে। কারণ তাদের সমূদ্র সীমা রয়েছে এখানে যেমন কাঁচামাল সহজে আনা যাবে তেমনি উৎপাদিত পণ্য সেবা সহজে অন্যত্র নেয়া যাবে।
পঞ্চমত,
এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শরানার্থী হিসেবে জীবন যাপন করছে। অনেকে ইতোমধ্যে শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতায় উন্নতি লাভ করেছে। তাদের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করবে। তাদের সাথে সারা বিশ্ব খুব ভাতৃত্ব ও সহনশীল সম্পর্কের নতুন যাত্রা শুরু করতে পারবে।
বিশ্ববাসীর করনীয় কি?
আমরা ৫টি খারাপ আশংকা এবং ৫টি ভাল সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললাম। আসলে কোনটি হবে তা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করছে। সেখানকার লোকদের উপর যেমন নির্ভর করছে তেমনি নির্ভর করছে বিশ্বমতের উপর। এই অবস্থায় স্থানীয় প্রতিবেশী দেশ, আঞ্চলিক শক্তি ও বিশ্বের পরাশক্তি সমূহের আসলে কি করা উচিৎ।
প্রথমত,
এখানে মানবাধিকার লঙ্গন ও যুদ্ধাবস্থা বন্ধ কিংবা ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বিবদমান পক্ষসমূহকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত,
যুদ্ধে এলাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ ও দূত পাঠালে সেখানে বিশ্ব মিডিয়ার নজর পড়বে এবং প্রকৃত পরিস্থিতি সবাই জানতে পারবে।
তৃতীয়ত,
যুদ্ধ এলাকায় মানবিক সহযোগিতা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত:
পরিস্থিতি সরকারের পক্ষে না থাকলে সেখানে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করে বেশীরভাগ জনগণ যদি স্বাধীনতা চায় তাদের তা দেয়ার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
পঞ্চমত,
যদি নতুন রাষ্ট্রই অনিবার্য বাস্তবতা হয় তাহলে সেখানে যারা আসবে তাদের আলোচনা শুরু করা যেতে পারে যাতে একটি মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিবেশীদের প্রতি সহনশীল এবং সকল জাতিগোষ্টির সহাবস্থানের মাধ্যমে একটি অগ্রসরমান জাতি রাষ্ট্র গঠন করতে পারে সে ধরনের কৌশলগন পরিকল্পনা এখনি শুরু করা দরকার।
এখানে প্রথম দুই গুরুত্বপূর্ণ ও বিবদমান পক্ষসমূহের করনীয় আলোচনা করা হয়নি। সেটা মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মি তবে উপরের আলোচনা থেকে তাদের কাজগুলো বের হয়ে এসেছে। তাই লেখাটি আর লম্বা করি না।
ধন্যবাদ

