Mohial

মোহিয়ালদের ব্রাহ্মণদের যুদ্ধজীবন ও কারবালা অধ্যায়

মোহিয়ালদের ব্রাহ্মণদের যুদ্ধজীবন,  কালাপানি তত্ত্ব, ও কারবালার বিস্ময়কর অধ্যায়

ভারতের ব্রাহ্মণদের আমরা সাধারণত পুরোহিত, বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান, শাস্ত্রপাঠ ও ধর্মচর্চার সাথে যুক্ত বলেই জানি। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে খুঁজলে দেখা যাবে, এই একই ব্রাহ্মণসমাজ নানা সময়ে যোদ্ধা, দূত, বণিক ও অভিযাত্রী হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। তাদের জীবনে যেমন বেদমন্ত্রের মধুর ধ্বনি শোনা যায়, তেমনি শোনা যায় যুদ্ধের ঢাক, তলোয়ার ও বর্শার ঝনঝনানি। 
আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্রাহ্মণদের একটি অংশ সরাসরি কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইনের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল— যা দক্ষিণ এশিয়ার বহুধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

 ব্রাহ্মণদের যুদ্ধজীবন ও মোহিয়াল ব্রাহ্মণ

 মোহিয়াল ব্রাহ্মণ হলো সরস্বত ব্রাহ্মণদের এক বীর শাখা। পাঞ্জাব ও কাশ্মীর উপত্যকায় সরস্বত ব্রাহ্মণদের একটি বিশেষ শাখা মোহিয়াল ব্রাহ্মণ, যারা প্রায় হাজার বছর ধরে যোদ্ধা ব্রাহ্মণ (Warrior Brahmin) পরিচয়ে পরিচিত। মোহিয়ালদের সাতটি প্রধান উপগোত্র রয়েছে: দত্ত (Datt), বালি (Bali), চিব্বর (Chhibber), লাউ (Lau), ভীমওয়াল (Bhimwal), মোহন (Mohan), ভেদ (Vaid)।

এই ব্রাহ্মণদের মূল কাজই ছিল শাসকের সেনাপতি, দুর্গাধিপতি ও সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করা।
তারা যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে বহুবার পাঞ্জাব, কাশ্মীর থেকে আফগান সীমান্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে।
মোহিয়ালদের অনেক পরিবার এমনকি শক্তিশালী সিখ সাম্রাজ্য গঠনেরও ভিত্তি স্থাপন করেছে।

 “ব্রাহ্মণরা কেবল পূজারী” — এই ধারণা ভেঙে মোহিয়ালদের ইতিহাসই প্রমাণ করে, ব্রাহ্মণরা সব সময় কেবল পূজারী বা গ্রন্থি ছিলেন না, অনেক সময় রাজন্যবর্গের কনিষ্ঠতম ও বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন।

কালাপানি তত্ত্ব ও সমুদ্রযাত্রার ধর্মীয় বিধি

হিন্দু সমাজের একটি ধারায়  এক সময় সমুদ্র পাড়ি দেওয়াকে পাপ আর সমূদ্রকে “কালাপানি” বলতো, যার মানে অশুভ জল। কারণ ছিল— সমুদ্রযাত্রায় বৈদিক ও শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান ঠিকভাবে করা সম্ভব নয়, তাদের ধারণা এর ফলে ধর্মীয় শুচিতা নষ্ট হয়। মনুস্মৃতি (১১.২০৩) পর্যন্ত বলা হয়েছে, সমুদ্রযাত্রা করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

তবে বাস্তবে দেখা যায়— দক্ষিণ ভারতের চোলা, পাণ্ড্য, চের রাজারা বিশাল নৌবাহিনী গঠন করে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অনায়াসে কালাপানি পার হয়ে সুদূর চীন, জাপান পর্যন্ত গেছে।  ভারতীয় বণিকদের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস বেশ পোক্ত। গুজরাট, কর্ণাটক, তামিল উপকূল থেকে বহু বণিক আরব, পারস্য, পূর্ব আফ্রিকায় গিয়েছিল। তারা মসলা, তুলা, হাতির দাঁত ও বস্ত্র বাণিজ্যে বিশ্বজুড়ে সমৃদ্ধ ছিল।

  স্থলপথের দূর অভিযান ও ব্রাহ্মণ দূত

ব্রাহ্মণরা স্থলপথে ভারত থেকে— নেপাল, তিব্বত, চীন পর্যন্ত গিয়েছিল বৈদিক ধর্ম, জ্যোতিষ ও বৌদ্ধ দর্শন প্রচার করতে। কামরূপ (অসম) থেকে মণিপুর, মায়ানমার পর্যন্ত ব্রাহ্মণরা রাজদরবারের পুরোহিত ও সভাকবি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

  মোহিয়াল ব্রাহ্মণ ও কারবালার বিস্ময়কর অধ্যায়

সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় হলো কারবালার যুদ্ধে ভারতীয় ব্রাহ্মণদের (দত্ত পরিবারের) অংশগ্রহণ। মোহিয়াল ব্রাহ্মণদের বংশ ইতিহাসে বলা হয়— রাহাব সিধ দত্ত (বা রেহর সিধ দত্ত) নামে এক ব্রাহ্মণ পাঞ্জাব থেকে আরব গিয়েছিলেন।  তিনি তার ৭ পুত্রসহ কারবালায় ইমাম হোসাইনের পক্ষে ইয়াজিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং শহীদ হন। এই কাহিনীর জন্য দত্ত পরিবারের মোহিয়ালরা নিজেদের “হোসাইনি ব্রাহ্মণ” বলেন।  আজো মহররমে তারা তাজিয়া মিছিলে অংশ নেন, ইমাম হোসাইনের জন্য শোক প্রকাশ করেন।

আরবের প্রাচীন সূত্র যেমন তাবারির ইতিহাস বা ইবনে কাসীরের গ্রন্থে এই ভারতীয় যোদ্ধাদের সরাসরি উল্লেখ নেই।তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় লোককাহিনী ও পারিবারিক গর্বের অংশ হয়ে উঠেছে। ভারতের পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের বহু দত্ত পরিবার আজো এই পরিচয় ধরে রাখে।

ইন্দো-ইসলামিক শিয়া স্কলার গুলাম রসুল দেহলভির মতে, স্বৈরাচারী ইয়াজিদ যখন ইমাম হোসাইনকে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে মেরে ফেলার চক্রান্ত করলেন, তখন তিনি বিশ্ব মানবতার উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘হাল মিন নাসিরিন ইয়ানসুরনা!’ – যার অর্থ কেউ কি কোথাও আছে, যারা আমাদের সাহায্য করতে পারে?

সেই ডাকে সাড়া দিলেন সুদূর ভারতের (হিন্দুস্তান) রাজা সমুদ্রগুপ্ত, যিনি ইমাম হোসাইনের পুত্র আলি আকবরের কাছ থেকেও সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পাঠানো একটি বার্তা পেয়েছিলেন।

 রাজা সমুদ্রগুপ্ত এর সেনাদলের  নেতৃত্বে ছিলেন বীর যোদ্ধা রিহাব সিধ দত্ত – যিনি পাঞ্জাবের একজন মোহিয়াল ব্রাহ্মণ। দেহলভির কথায়, দত্ত সেনারা যখন কারবালায় পৌঁছলেন, ততক্ষণে ইমাম হোসাইন শহীদ হয়েছেন।  রিহাব দত ও তার বাহিনী ঠিক সেটাই করেছিলেন – ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করে প্রাণোৎসর্গ করবেন। শেষে তারাও প্রাণ হারান। পরে বাহিনীর যারা বেঁচে যান, তাদের কেউ কেউ  মাতৃভূমি ভারতে ফিরে আসেন। তাদের কাছে তাদের গোত্রের লোকেরা জানতে পারে ইতিহাস।

হিন্দি সাহিত্যের বিখ্যাত কথাকার মুন্সী প্রেমচন্দও তার ১৯২৪ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত নাটক ‘কারবালা’তে রিহাব সিধ দতের সাহসিকতার কথা লিখে গেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইমাম হোসাইনের সমর্থনে ভারত থেকে যাওয়া ‘সাতজন যোদ্ধা’র অসমসাহসী বীরত্বের কথা কারবালার লোকগাথার অংশ হয়ে উঠেছিল।

 আরবে আগেই ছিলেন হিন্দুরা?

গবেষক শিশির কুমার মিত্র-র আকরগ্রন্থ ‘দ্য ভিশন অব ইন্ডিয়া’তে জানানো হয়েছে, ‘আরাবিয়া’ বা আরব পেনিনসুলাতে একটা বিরাট সংখ্যক হিন্দু কারবালা যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই বসবাস করতেন। তিনি আরও লিখেছেন, আফগানিস্তানেও টানা ১২০ বছর ধরে (৮৩০ – ৯৫০ খ্রীষ্টাব্দ) একটি হিন্দু ‘দত’ রাজবংশের শাসন কায়েম ছিল – যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সোমানন্দ দত। তবে এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা কারবালা যুদ্ধেরও দেড়শো বছর পরের কথা।

১৯৮৬তে ‘দ্য হিস্ট্রি অব মোহিয়ালস’ নামে আর একটি বই লেখেন ইতিহাসবিদ পি এন বালি, যিনি নিজেই ছিলেন একজন হুসাইনি ব্রাহ্মণ। তিনি দাবি করেছেন, হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের চরিত্র অশ্বত্থামা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তার পিতা দ্রোণাচার্যের করুণ মৃত্যুর পর উদাস হয়ে ঘুরতে ঘুরতে না কি আরাবিয়াতে চলে আসেন– এবং সেখানেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে দিন কাটাতে থাকেন।

এই অশ্বত্থামার বংশধরদের সূত্র ধরেই আরবে হিন্দুদের বসতি, আর তারাই পরে ইমাম হোসাইনের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন– এমনও মতবাদ প্রচলিত আছে।

 

  ব্রাহ্মণদের যুদ্ধজীবন বনাম তুর্কি ঘোড়সওয়ার

প্রশ্ন আসে, ব্রাহ্মণরা কি তুর্কিদের মতো দূর দেশে পেশাদার সৈনিক ছিল? পূর্ণরূপে “মারকানারি” বা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে তুর্কিদের মতো ইতিহাস নেই। তবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সেনাপতি বা দুর্গরক্ষক হিসেবে মোহিয়াল ব্রাহ্মণরা রাজন্যবর্গের হয়ে নিয়মিত যুদ্ধ করতেন। কাশ্মীর থেকে আফগান সীমান্ত পর্যন্ত তাদের যুদ্ধ অভিযানের নথি আছে।

সঠিক ইতিহাস নিয়ে আজ অস্পষ্টতা আছে অবশ্যই– কিন্তু কারবালায় যাওয়া সেই হিন্দু ব্রাহ্মণদের বংশধররা যে আজও ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালবাসাতেই হিন্দু হয়েও বহু মুসলিম রীতিনীতি পালন করে যাচ্ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিষয় সংক্ষিপ্ত সার
ধর্ম ব্রাহ্মণ সমাজ মূলত বৈদিক, শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব আচার পালন করতো।
 যুদ্ধ মোহিয়াল ব্রাহ্মণরা সেনাপতি ও দুর্গাধিপতি হতেন।
 বাণিজ্য গুজরাট, কর্ণাটক, তামিল উপকূল থেকে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য চলতো।
 কারবালা মোহিয়াল দত্তরা ইমাম হোসাইনের পক্ষে যুদ্ধের কিংবদন্তি বয়ে নিয়ে চলে।
 কালাপানি সমুদ্রযাত্রা পাপ ধরা হলেও দক্ষিণ ভারতের রাজারা, বৌদ্ধরা নিয়মিত সমুদ্র পাড়ি দিত।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ছবি: চ্যাট জিপিটি

 

তথ্যসূত্র :

  • মোহিয়াল ব্রাহ্মণদের পারিবারিক বংশতালিকা (Datt Family Chronicles)

  • প্রচলিত গ্রন্থ ও লোককাহিনী

  • “History of the Muhiyals” – By G.D. Mahajan

  • “The Rise of Islam and the Bengal Frontier” – Richard Eaton

  • মনুস্মৃতি, ধর্মশাস্ত্র

  • ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব (ASI রিপোর্টস)

  • বিভিন্ন লোককাহিনী ও তাজিয়ার সাথে ব্রাহ্মণদের অংশগ্রহণের রিপোর্ট (BBC, Scroll.in)