বাবা বলে ছেলে নাম করবে
উদ্ভাবনের দিক থেকে বাংলাদেশের তেমন কোনো অবদান নেই। এমনকি এশিয়ার মধ্যেও সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০১-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে কম উদ্ভাবনী দেশের কাতারে আছে বাংলাদেশ, কাজাখস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান। তৃণমূলে কীভাবে উদ্ভাবন হয় এবং ক্ষুদ্র পরিসরে নবায়নযোগ্য ব্যবস্থার কীভাবে উত্থান ঘটছে জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা-ও দেখানো হয়েছে। অধিকাংশ সূচকে সিঙ্গাপুর ভালো অবস্থানে আছে। সামনের দিকে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের পেছনে আছে জাপান, এশিয়ায় যাদের অবস্থান তৃতীয়। এশিয়ায় চতুর্থ স্থানে আছে চীন। চীনের পর আছে মালয়েশিয়া। মধ্য আয়ের দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ উদ্ভাবনে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে মালয়েশিয়া অন্যতম। উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতি, জ্ঞান বিতরণ ও সৃজনশীল পণ্য ও সেবার উদ্ভাবনের কল্যাণে এ বছর তারা উন্নতি ঘটিয়েছে। এশিয়ায় ষষ্ঠ স্থানে আছে থাইল্যান্ড। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়ন সাপেক্ষে উদ্ভাবনে তারা বেশি অগ্রগতি অর্জনে করেছে। অর্থাৎ তাদের উদ্ভাবনের গতি উন্নয়নকে ছাপিয়ে গেছে। এরপর সপ্তম ও অষ্টম স্থানে আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম ও মঙ্গোলিয়া। ভারতের স্থান ৯ নম্বরে। যেসব দেশ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে এগিয়েছে, তাদের মধ্যে ভারত অন্যতম। সূত্র: প্রথম আলো, ১ আগষ্ট, ২০১৯।
মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত নয়। মানুষের মাঝে সৃজনশীলতা আছে বলেই পৃথিবী আজ এত সুন্দর ও আরামদায়ক। পড়া লেখার পাশাপাশি অনেক সময় দেখা যায় বা”াদের মাঝে বিশেষ গুনাবলী ফুটে উঠে। যেমন অংকন, গান, বিতর্ক, খেলা ইত্যাদি। এসব যদি সে মনের মাধুরী মিশিয়ে করতে না পারলে বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয।
এগুলো আমাদের প্রয়োজন কারণ, তুমি ভাল গায়ক কিংবা শিল্পী হতে পারবে, কিন্তু সে সাথে ভাল লেখাপড়া থাকলে সেটা তোমাকে আরো ভালো করতে সাহায্য করবে। লেখাপড়ার ছাপ বেশী হলে শিল্পী সত্তার বিকাশ সঠিকভাবে নাও হতে পারে। কোনো বিষয়ে খুব বেশী ভালো আগ্রহ থাকলে লেখাপড়ায় নাম্বার ওয়ান হওয়া জরুরী নয়। যেমন ধরে সাকিব খান ও মাশরাফি নিশ্চই লেখাপড়ায় নাম্বার ওয়ান ছিলনা। আমি লেখাপড়ায় হেলা করে ক্রিকেট শিখলে একসময় জাতীয় দলে সুযোগ পাব। নাকি ক্রিকেটটাকে অপশনাল রেখে লেখাপড়া শিখে বিসিএস অফিসার হবো। সেই সিদ্ধান্ত একান্তু আমার। তবে আমাকে নিজেকে চেনার এবং নিজের সিদ্ধান্তের অগ্রাধিকার গ্রহণ করতে হবে।
বলা হয়ে থাকে প্রয়োজন আবিষ্কারের জননী। মানে কোনো কিছুর চাহিদাই আমাদেরকে সমস্যা সমাধানে পথ দেখায়। যত মুশকিল তত আসান। কিন্তু বছরের পর বছর আমাদের দেশে নানা সমস্যার মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এখান থেকে খুব কম সৃজনশীল আইডিয়া আসছে। অথচ ষোলোকোটি মানুষের দেশ। প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে সম্ভাবনা।
তোমাদের আর ফেসবুক, ইউটিউব, গার্লফ্রেন্ড, আড্ডা আর অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে পড়ে থাকার সময় নেই। যেহেতু এ দেশে অনেক সমস্যা। তোমারও সুযোগ আছে। কোনো একটা বিষয় নতুন উদ্ভাবনী ধারণা সৃষ্টি করার কাল নয়। আজ এখনি শুরু হোক। তোমার পরিকল্পনা।
কিভাবে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো যায়
সৃজনশীলতায় আসে নতুনত্ব। সৃজনশীলতায় প্রাচীনত্ব ভেঙে কাঠামোগত পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। নতুন নতুন চিন্তায় প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব তৈরী করে। সৃজনশীলতার উন্নয়ন হলে এগুলোর রেখা উধ্বমুখী হয় যেমন, কর্মস্পৃহা, ইচ্ছাশক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, জ্ঞানপিপাসা, স্বত:স্ফূর্ততা, মুক্ত চিন্তা, সৌন্দর্যবোধ, ব্যক্তিত্ব, অগ্রসর চিন্তা, খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্য, সংগীত চর্চা এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা ও চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষমতা।
আর সৃজনশীলতা কিসে উন্নত হয়। তা আমরা এবার আলোচনা করে নেব। সৃজনশীলতা উন্নয়নের সহজ সূত্র হলো একটি সমস্যাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।
কেন কাজটি করবে অথবা করবেনা?
পাঁচটি “কেন?” হল যেকোনো সমস্যা বা সিদ্ধান্তের মূল কারণ বিশ্লেষন করার একটি সাধারণ মানদণ্ড। এ ৫টি ‘‘কেন’’কে একটি যন্ত্র ভাবতে পার? মূল কথা হল প্রশ্ন করতে হবে “কেন?”, যে কোন ভুলের আশানুরূপ আসল কারণটি খুঁজে বের করার জন্য অন্তত পাঁচবার এ প্রশ্ন করতে হবে। এ প্রশ্নের কমপক্ষে ৫টি উত্তর চাই, অথবা ১টি অবিসংবাদিত উত্তর চাই। যার মধ্যে ৫টি প্রশ্ন নিহিত আছে। আবার অন্যভাবেও প্রশ্নগুলো আসতে পারে?
ক. কেন এ কাজটি করবো?
খ. কেন অন্য কোনো বিকল্প খুজবোনা?
গ. কেন বিষয়টা সম্পর্কে আরো জানার প্রয়োজন মনে করছিনা?
ঘ. কেন এ কাজটা আমার জন্য সঠিক মনে করছি
ঙ. কেন এ কাজের পেছনে সময়/অর্থ/মেধা/চিন্তা ব্যয় করবো?
এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে যেমন এর মধ্যকার ফাঁক ফোকর বেরিয়ে আসবে তেমনি কাজটি সঠিক ভাবে সম্পন্ন করার পথ উন্মোচিত হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা আসবে। এমননকি কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা কোনো দ্বিধা দ্ধন্ধের কারণে নয় বরং জানা বোঝার কারণেই হবে।
তুমি একটি সাম্প্রতিক অভ্যাস বা আচরণ বা কাজ বাছাই করো। বিশেষ করে যেটা তোমাকে ভোগাচ্ছে অথবা সিদ্ধান্ত হীনতায় রাখছে। নিজেকে প্রশ্ন করো যে তুমি এটা কেন করবে? বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকো, তুমি এটা কেন করবে? তুমি যত বেশি বার নিজেকে প্রশ্ন করবে, প্রতিটি উত্তরের পর তুমি সবকিছু আবার নতুন ভাবে দেখতে শুরু করবে।
প্রচলিত সমস্যাগুলোতে নিজেকে রেখে দেখো
প্রতিনিয়ত সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভিন্ন্ সমস্যা দেখা দেয়। সেগুলো আমরা কখনো ভয় পাই, কখনো জয় পাই। তুমি নিজে একবার ভাবো যে, সেখানে তুমি থাকলে তুমি কি করতে। একটি ছেলেকে এক জন কুপিয়ে মারছে সেখানে থাকলে তুমি কি করতে আর কিভাবে করতে? নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। সেখানে থাকলে তুমি কি করতে? এসব ভাবনা তোমার চিন্তা ও স্বপ্নের পরিধি বাড়াবো তবে কি করবে? সে করাটা যেন ইতিবাচক কিছু হয়। ব্যক্তিজীবনে যেকোনো সমস্যা সমাধানে তোমার মস্তিস্ক খুব দ্রুত কাজ করবে। কারণ তুমি এমন অনেক সমস্যায় তোমার করনীয় সম্পর্কে তুমি আগেই ভেবে রেখেছো।
নিয়ম জেনে রাখো আর নিয়ম ভাঙার কথা ভাবো।
প্রতিটি কাজ করার নিয়ম আছে। আমরা নিয়মগুলো মানি। কিন্তু সময়ের সাথে সেগুলো কখনো ভেঙ্গে যায়। কেউ না কেউ প্রথমবার সেগুলো ভাঙ্গে। কখনো কখনো নিয়ম ভাঙ্গে বলে কেউ তিরষ্কৃত হয় আবার কখনো নিয়ম ভাঙঙ্গার জন্য কেউ পুরষ্কৃত হয়। কেমন এমনটা হয়? কারণ নিয়ম ভাঙ্গারও একটা নিয়ম আছে।
নিয়ম মেনে অথবা নিয়ম ভেঙ্গে একবার নিজেকে প্রমান করো। প্রথমে ভাবো তুমি কি নিয়ম গুলো পছন্দ কর? তুমি এগুলো হাসিমুখে মেনে নাও নাকি তোমার ভালো লাগে না বা এগুলো প্রয়োগ করতে গিয়েও কিছু সমস্যা তৈরী হয়? তাহলে তুমি এর সমাধান নিয়ে ভাবো? কি হতে পারে নতুন নিয়ম? তাতে তুমি সেগুলো ভেঙ্গে পড়তে পারবে নতুন কিছু।
মনে করো সেরা কাজটিই তোমাকে করতে হবে
তুমি যখন একটা এসাইনমেন্ট তৈরী করবে। এটাই প্রথমে মনের মধ্যে নেবে যে, তোমারটাই হবে সবার সেরা। এটা পুরোপুরি তৈরী না হওয়া পর্যন্ত তুমি এটাই ভাববে। এমনকি খুব ছোট একটা কাজ, হতে পারে একটা বিজনেস কার্ড ডিজাইন করা। কাজটা যখন করবে তুমি ভাববে দেশের সবচেয়ে সুন্দর কার্ডটি ডিজাইন করার দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয়েছে। ধরো, তুমি যখন কোনো মিউজিক কম্পোজ করবে। ভাববে এটা হবে সময়ের সেরা একটি পরিবেশনাা। এভাবে সবসময় সেরাটাই ভাববে। তাহলে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে।
সাম্ভাব্য সমস্যার উপর মহড়া দাও
উদ্ভাবনের বিশেষজ্ঞগণ ক্রমাগত পরীক্ষণ সুপারিশ করেন। একটি পরীক্ষণের কথা চিন্তা করলে কতগুলো সৃজনশীল স্তর প্রয়োজন, যেগুলো সীমাব্ধ ধারণার অনেক বাইরে। তুমি বুঝতে চেষ্টা করো কি সমস্যা গুলো হবে? সেগুলোর জন্য তোমার কাছে যে সমাধান আছে? সেগুলো কিভাবে প্রয়োগ করবে? সাম্ভাব্য ক্ষেত্রে তার একটা ডেমোনেস্ট্রশন বা মহড়া করতে পারো। এটা চোখে সমস্যার ভেতরের সমস্যাকে বের করে নিয়ে আসতে পারে। তাই একটু ঘুরিয়ে কাজ করো এবং যেটি কাজ করে সেটিই বেছে নাও। সহজ কথায় ‘‘থিংক আউটসাইড দ্যা বক্স’’। পুরনো কথা কিন্তু বেশ কাজের। যদিও অনেকে মনে করেন বর্তমানে বক্স বলতে কিছু নেই। সবটাই উন্মুক্ত।
তথ্য সমৃদ্ধ হও
একটি সৃজনশীল আইডিয়ার মধ্যে অন্তত তিনটি তথ্য থাকে। যেমন কেউ যদি মনে করে আমি নিজেই একটা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট বানাবো সেটাই হবে আমার পোর্টফোলিও আর চাকরী পাওয়ার জন্য আমি সেটাকে ব্যবহার করব। এখানে অন্তত ৩টি তথ্য আছে। ক) ব্যক্তিগত ওয়েব সাইট বানানো যায়। খ) ওয়েবসাইটে নিজের তথ্য ও প্রোফাইল থাকতে পারে। গ) ওয়েবসাইট বর্তমানে তথ্য প্রর্দশেনর ভালো জায়গা।
সৃজনশীল বিষয়গুলোকে বুঝতে চেষ্টা করো
কবিতা, ছবি, গান, ভাস্কর্য, গল্প, আর্টফিল্ম কেন মানুষ দেখে? এ প্রশ্নের আলোকে এগুলো থেকে কিছু খুঁজে নেয়ার চেষ্টা কর। একটি বিমুর্ত চিত্র প্রদর্শণীতে শিল্পী কি বোঝাতে চেয়েছে তার ক্যানভাসে সেটা বোঝার চেষ্টা কর।
ইতিবাচক চিন্তা করা
ইতিবাচক চিন্তা সৃজনশীলতার বিকাশে সাহায্য করে। তুমি যখন কোনো কাজ করতে চাইবেনা তখন তোমার সামনে কোনো অপশন নেই। আর যখন তুমি কাজটি বা কাজগুলো করতে চাইবে তাহলে তোমার সামনে অনেক অপশন থাকবে। আর এই অপশনগুলো তোমার সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
সুন্দরী প্রতিযোগীতার প্রশ্ন
আন্তজাতিক সুন্দরী প্রতিযোগীতায় চিন্তামুলক প্রশ্ন করা হয়। যদিও আমাদের দেশে অনেকসময় চিন্তামূলক প্রশ্নের জায়গায় সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন করতে দেখা যায়। আবার সুন্দরীরাও হাস্যকর উত্তর দেয়। সুন্দরী প্রতিযোগীতায় তথ্যভিত্তিক প্রশ্নের কি মূল্য বিশেষ করে একেবারে শেষ পর্ব? ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর নামের সাথে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ এর চাকরীর যেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তেমনি ধুমকেতু লেজের সাথে সুন্দরীর সম্পর্ক নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন সুন্দরী প্রতিযোগীতায় যেসব সৃজনশীল প্রশ্ন করা হয়। আমি তোমাদেরকে সেগুলো কিছু তুলে ধরছি? তোমরা নিজেরা সেগুলো ভাবতে পারে এতে তোমাদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত হবে। সহজ কথায় সৃজণশীলতার উন্নয়ন ঘটবে।
সবচেয়ে খারাপ যা ঘটতে পারে সেটা ভাবো
তোমার যদি কোনো সহযোগী বা সহযোগিতা না থাকত। তবে কি তুমি এ জগতে বসবাস করতে না? জীবন ও জীবিকা নিয়ে লড়াই করতে না? তখন তুমি কি করতে? এটা ভাবো। এবং সেটা একটা নয় অনেকগুলো বিকল্প ভেবে রাখ। সম্ভব সেটাও তোমার আত্ম-উন্নয়ন নোটবইতে লিখে রাখো। তবে এটা স্রেফ ভেবে রাখা। নেতিবাচক ভাবনাটাই যেন তোমার মনের চালক হয়ে না যায়।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বই: লেখাপড়া করে যে
ছবি: ইন্টারনেট

