egypt

 ফারাওদের গৌরবময় যুগ

 ফারাওদের গৌরবময় যুগ

মিশরীয় সভ্যতা মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সমৃদ্ধতম সভ্যতাগুলোর একটি। খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালের দিকে প্রথম ফারাও নরমার (Narmer বা Menes) উত্তর ও দক্ষিণ মিশরকে একীভূত করার পর থেকে হাজার বছর ধরে এই সভ্যতা টিকে ছিল। গিজার পিরামিড, স্ফিংক্স, লুক্সরের মন্দির, কারনাকের বিশাল স্থাপত্য এসব আজও প্রমাণ করে কত উন্নত ছিল তাদের স্থাপত্য ও প্রকৌশল। তারা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ও কৃষিতে বিস্ময়কর জ্ঞান অর্জন করেছিল। নীলনদকে কেন্দ্র করে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে এবং তা থেকেই জন্ম নেয় একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র। ধর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বহু দেব-দেবীর পূজা, ফারাও ছিলেন তাদের প্রতিনিধি। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী অর্ধমানব অর্ধদেবতা।

তাদের চূড়ান্ত উন্নতির পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় পুরাতন রাজবংশ (Old Kingdom, খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬–২১৮১ খ্রি.) এর পিরামিডে, মধ্য রাজবংশ (Middle Kingdom, খ্রিস্টপূর্ব ২০৫৫–১৬৫০ খ্রি.) এর সাহিত্য ও শিল্পকর্মে, এবং নতুন রাজবংশ (New Kingdom, খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০–১০৭০ খ্রি.) এর সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্য বিস্তারে। রামেসিস দ্বিতীয়, হাটশেপসুট, আখেনাতেন কিংবা তুতানখামুন—তাদের শাসনামলই ছিল মিশরীয় সভ্যতার গৌরবের প্রতীক।

কিন্তু সময়ের আবর্তে এই সভ্যতা একটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এবং তার ধর্ম, সংস্কৃতি ও লিপিও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়।

 

মিশরীয় সভ্যতার উত্থান ও পতন: ধর্ম, বর্ণমালা ও বিস্মৃতির ইতিহাস

পতনের ধাপসমূহ

১. অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও রাজনৈতিক ভাঙন (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১১০০–৬৬৪ খ্রি.)

  • নতুন রাজবংশের শেষদিকে মিশরের ফারাওরা দুর্বল হয়ে পড়েন। রাজকোষ শূন্য হয়ে যায় সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধ ও বিশাল স্থাপত্য নির্মাণের কারণে।
  • পুরোহিতরা (বিশেষ করে আমুন মন্দিরের পুরোহিতরা) রাজশক্তির সমকক্ষ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। রাজশক্তি ও ধর্মশক্তির দ্বন্দ্বে প্রশাসনিক অস্থিরতা দেখা দেয়।
  • বিদেশি আক্রমণকারীরা সুযোগ নেয়। প্রথমে লিবিয়ান, পরে নুবিয়ানরা আংশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। নুবিয়ান হলো- উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা আজকের দক্ষিণ মিশরউত্তর সুদান জুড়ে বিস্তৃত।

২. আসিরীয় ও পারস্য আক্রমণ (খ্রিস্টপূর্ব ৭ম–৫ম শতক)

  • খ্রিস্টপূর্ব ৬৭২ খ্রিস্টাব্দে আসিরীয়রা মিশরে আক্রমণ চালায় এবং রাজশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
  • খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ সালে পারস্য সম্রাট কাম্বাইসিস মিশর দখল করেন। মিশর হয়ে পড়ে পারস্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ।

৩. গ্রিক শাসন (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২–৩০ খ্রি.)

  • আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সালে মিশর জয় করেন। পরে টলেমি বংশ প্রতিষ্ঠা হয়। যদিও তারা ফারাও উপাধি ব্যবহার করতো, কিন্তু আসলে গ্রিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মিশরীয় সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে যায়।
  • আলেকজান্দ্রিয়ার মতো শহর হয়ে ওঠে জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্র, তবে তা গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে।

৪. রোমান শাসন (খ্রিস্টপূর্ব ৩০ – খ্রিস্টীয় ৩৯৫)

  • ক্লিওপেট্রা তৃতীয় ও মার্ক এন্টনি পরাজিত হওয়ার পর অক্টাভিয়ান (অগাস্টাস সিজার) মিশরকে রোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত করেন।
  • ফারাও উপাধির অবসান ঘটে। প্রশাসন সম্পূর্ণ রোমানকরণ হয়। পুরনো দেবতাদের মন্দির ধীরে ধীরে হারায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।

৫. খ্রিস্টধর্মের বিস্তার (খ্রিস্টীয় ১ম–৪র্থ শতক)

  • প্রথম শতক থেকেই খ্রিস্টধর্ম মিশরে প্রবেশ করে। আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে ওঠে খ্রিস্টীয় তত্ত্বচিন্তার অন্যতম কেন্দ্র।
  • খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলে মিশরের প্রাচীন বহুদেবতাবাদী ধর্মের অবসান ঘটে।
  • মন্দিরগুলো ধ্বংস বা পরিত্যক্ত হয়, পুরোহিত শ্রেণি বিলীন হয়। মানুষ নতুন বিশ্বাসে আকৃষ্ট হয় এবং পুরনো দেবতাদের পূজা “ভ্রান্ত-বিশ্বাস” হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

৬. আরব,মুসলিম বিজয় (খ্রিস্টীয় ৬৪১)

  • সপ্তম শতকে আরব মুসলিমরা মিশর জয় করে। আরবি হয়ে ওঠে প্রশাসন ও ধর্মের ভাষা।
  • ধীরে ধীরে গ্রিক ও কপটিক ভাষা পিছিয়ে যায়, আর প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক লিপি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে।

ধর্ম ভুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া

  • বহুদেবতাবাদী ধর্ম ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়।
  • খ্রিস্টধর্ম ও পরে ইসলাম মানুষকে একেশ্বরবাদে আকৃষ্ট করে।
  • পুরোনো ধর্ম ও মূর্তিপূজাকে “অতীতের অন্ধকার” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
  • নতুন প্রজন্মেরা ফারাওদের দেবতাদের সম্পর্কে জানলেও, সেগুলো গল্প বা কল্পকাহিনি হিসেবে দেখতে শুরু করে।

 

বর্ণমালা ভুলে যাওয়ার ইতিহাস

  • মিশরীয়রা লিখত হায়ারোগ্লিফিক (চিত্রলিপি), হায়ারাটিক (সরলীকৃত লিপি) ও পরে ডেমোটিক লিপি দিয়ে।
  • রোমান যুগে গ্রিক লিপি প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
  • খ্রিস্টধর্মের আগমনের পর কপটিক ভাষা তৈরি হয় (মিশরীয় ভাষার পরবর্তী রূপ, গ্রিক অক্ষরে লেখা)।
  • সপ্তম শতকে আরবি ভাষার প্রাধান্য আসার পর কপটিকও বিলুপ্তির পথে যায়।
  • হায়ারোগ্লিফিক লিপি ধীরে ধীরে একেবারে অচল হয়ে যায়। খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতকে শেষবারের মতো সরকারি কোনো শিলালিপিতে তা ব্যবহার হয়।
  • প্রায় ১৪০০ বছর ধরে এই লিপি কেউ পড়তে জানত না। ১৭৯৯ সালে রোজেটা স্টোন আবিষ্কার ও ১৮২২ সালে জাঁ ফ্রঁসোয়া শঁপোলিয়ঁর (Champollion) পাঠোদ্ধারের পর আবার তা পড়া সম্ভব হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply