ঘোড়ার ডিমের গল্প
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
পাশাপাশি দুটো রাজ্য। এক রাজ্যে রাজার এক সুন্দর পুত্র মানে সুদর্শণ রাজকুমার। কেন যে সব গল্পে সুদর্শণ রাজকুমার থাকে জানি না। আমার মতো বেদর্শণ রাজকুমার কোনো গল্পে কেন নাই সেটাও আজ অবধি জানা গেল না। অবশ্য গ্লোবাল কিশোর সিরিজের বইতে একবার ‘‘হ্যানসব্যাক অব নটরডেম’’ নামে গল্পে একবার এক কুদর্শন নায়কের গল্প পড়েছিলাম। এটা অবশ্য পরে সিনেমা হয়েছিল।
যাই হোক। পাশের রাজ্যের রাজার আবার কন্যা। একেভরা ভরা পূর্নিমার শশী। সব গল্পের মতো এ গল্পের রাজকন্যাও খুব সুন্দরী। পুঁথি সাহিত্যের ভাষায়- ‘‘চোখ তুলে বিধুমখী যার দিকে চায়/ লজ্জায় ভাস্কর গিয়ে বারিধে লুকায়’’। বাংলা সাহিত্যের ক্লাস হলে শব্দগুলোর অর্থ বলে দিতাম। জীবন সাহিত্যের ক্লাস চলছে তাই সেদিকে গেলাম না।
যাই হোক লোকের মুখে মুখে রাজকন্যার রুপের প্রশংসা। তা শুনে পাশের রাজ্যের রাজকুমার স্বপ্ন দেখে রাজকুমারীকে পাবার। আজকালকার মতো ক’দিন প্রেম করে ‘‘ব্রেক আপ’’ করার মতো ব্যাপার নয়। রাজকুমার বলে কথা! লোক-লস্কর, হাতি-ঘোড়া আর উপহার নিয়ে হাজির হয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলেইতো কেল্লাফতে। রাজা-রানি আর রাজকন্যা রাজি হয়ে যাবে, তারপর বিয়ে। রাজকুমার হয়তো ফ্যান্টাসি গল্পের বই পড়েছে। কিংবা ঘোমড়া মুখে বসে না থেকে, আমার মতো বিয়ের দিনও শ্বশুরবাড়ীতে মজা করার অভ্যেস আছে।
রাজকুমার সিদ্ধান্ত নিল, একজন সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে ভবিষ্যৎ শ্বশুরালয় মানে পাশের রাজ্যে যাবে তারপর কোনোভাবে রাজবাড়ীতে প্রবেশ করে রাজকন্যাকে দেখবে, তার সম্পর্কে জানবে তারপর সুযোগ বুঝে মনের কথা বলা যাবেখন। শুধু রুপের কথা জানলেতো হবেনা, গুনের কথাওতো জানতে হবে। রমনীর গুন বলে কথা।
যেকথা সেকাজ। রাজকুমার একটি ভালো ঘোড়া আর দরকারী জিনিসপত্র নিয়ে চললো পাশের রাজ্যে। শেষে পথচলার ক্লান্তি মুছে রাজকুমার প্রবেশ করলো শ্বশুর রাজ্যে। আনন্দ একটু হবেই বৈকি। আমাদের টিনেজ বয়সে ছেলেরা দুষ্টুমি করে বলতো প্রেমিকার বাড়ীর কুকুর দেখলেও নাকি একটু মায়া মায়া লাগতো।
রাজকুমার ভাবল, গন্তব্যে যখন এসেই পড়েছি এবার একটু জিরিয়ে নেয়া যাক। ঘোড়াটা পথের পাশে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাজপুত্র একটু বিশ্রাম নিতে গেলো।
অমনি এক বাটপার এসে ঘোড়ার রশি খুলে ঘোড়া নিয়ে ভালোমানুষটির মতো হেঁটে চলল।
‘আরে আরে একি করছেন? ও মশাই আপনাকে বলছি। আরে ও মশাই।’
সে লোকটি যেন শুনতে পায়নি। যেন তাকে বলাই হচ্ছেনা এমনভাবে ঘোড়া নিয়ে পথ চলেছে।
দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রাজকুমার। ‘আরে মশাই আপনি আচ্চা লোকতো। ঘোড়াটা রেখে একটু বিশ্রাম নিতে গেলাম অমনি ঘোড়া নিয়ে রাস্তা মাপছেন। যেন ঘোড়ার মালিক আপনি।’
এতক্ষনে মুখ খুললো সে লোকটি, ‘আরে! যেন মালিক আবার কি জিনিস? আমি ঘোড়ার মালিক। ঘোড়া বেঁধে রেখে একটু সওদা কিনতে গিয়েছি। এখন আমার ঘোড়া আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি কে হে ছোকরা? অযথা সময় নষ্ট করছ। পথ ছেড়ে দাঁড়াওতো বাছাধন। আমার অনেক কাজ আছে। এ ঘোড়াতেই আমি ভিক্ষে করি।’
‘আরে, বললেই হলো। আমার নিজের ঘোড়া এযে দেখেন হাতে আমার চাবুক। আপনি নামুনতো বেশী কথা বাড়াবেন না। ভালো হবে না। তাহলে।’ একটু শক্ত করে কথাটা বলল রাজকুমার।
এবার তো আরো তেঁতে গেল সে স্বঘোষিত ভিক্ষুক যোগ ঘোড়ার মালিক। ‘এ ছেলে তুমি করোটা কি শুনি? ভিক্ষুকের পেটে লাথি মারবে নাকি? এ ঘোড়া নিয়ে আমি ভিক্ষে করি। সে ভিক্ষেতে আমার জীবন জীবিকা চলে। আর তুমি বলছো এটা তোমাকে দিয়ে দিতে।’
‘ওহে, অর্বাচিন। তোমার ঘোড়া আমাকে দিতে বলছিনা। তুমি ঘোড়া থেকে নামো আমার ঘোড়া আমার সাথে এমনিই চলে যাবে।’ রাজকুমার ভিক্ষুকের চোখে চোখ রেখে কথা বলল।
এভাবে বাক বিতন্ডা হতে দেখে সেখানে লোক জমে গেল। লোকেরা বলল, ‘ কি হয়েছে হে তোমাদের মধ্যে’?
ওরা দুজনে নিজেদের কথা বলল। লোকেরা দেখল একজন ভিনদেশী যুবক আরেকজন স্বদেশী ভিক্ষুক। তারা কার কথা শুনবে? বুঝতে না পেরে তারা দুজনকে কাজীর কাছে পাঠালো।
কাজীও যথারীতি দুজনের কথা শুনল। শুনে বলল, ‘যেহেতু ভিনদেশী যুবক। সূতরাং এটা পররাষ্ট্র নীতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়। এর ফায়সালা আমি দিতে পারবনা। এর জন্য রাজ দরবারে যেতে হবে’। পরের দিন তাদের দুজনকে রাজ দরবারে পাঠানো হলো।
যুবককে মহারাজ বললেন, প্রমাণ করতে যে- ঘোড়াটা তার।
যুবক বলল, ‘এ যে ঘোড়ার চাবুক আমার হাতে।’
ভিক্ষুক বলল, ‘বললেই হলো, এটা আমার ঘোড়া’। বলেই সে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলো। এ ঘোড়া না থাকলে সে ভিক্ষে করবে কিভাবে? না খেয়ে মরবে এসব বলে রাজার মন নরম করে ফেলল।
রাজা পড়লেন মহাবিপাকে। ঘোড়াটাকে রাজ দরবারে নেয়া হয়নি। বাইরে রেখে যাওয়া হয়েছে। ঘোড়ারা হয়তো দরবারে যেতে পারে না। সম্ভবত গাধারা যেতে পারে।
মহারাজ ভিখেরীকে বললেন, ঘোড়াটা যে তার সেটা প্রমাণ করতে।
ভিখেরী এক লম্বা গল্প ফাঁদলো। তারপর বলল তার ঘোড়ার ডিম থেকে এ ঘোড়াটা হয়েছে। ডিমটা যেহেতু তার ছিলো। ঘোড়াটাও তার।
সভাসদরা বলল, ‘ঘোড়ার ডিম শুনেছি। কখনো দেখিনি। ঘোড়ার ডিম যখন আছে। তখন নিশ্চই ডিম থেকে ঘোড়াও হতে পারে।’
রাজামশাই যুবককে জিজ্ঞেস করলে, ‘কি হে যুবক তোমার কি কোনো ডিম ছিলো যে, তা থেকে ঘোড়া হবে আর তুমি ঘোড়ার মালিক হবে?’
যুবক সহজ কথা জবাব দিলো। তার কোনো ডিম নেই। কোনোদিন ছিল না। সে তার নিজের আস্তাবল থেকে এ ঘোড়াটা নিয়ে এসেছে।
যেহেতু তার ডিম ছিলো না। তারমানে তার ঘোড়াও ছিলো না। তাই সে ঘোড়া পেলনা। ঘোড়ার মালিক ওই ভিক্ষুকবেশী বাটপার বেটা। সেটা প্রমাণিত হলো তাই রাজা ভিক্ষুকবেশীকে ঘোড়াটা দেয়ার হুকুম দিলেন।
ভেতর থেকে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে সব দেখছিলো এবং শুনছিলো রাজকুমারী স্বয়ং।
তারপর বিচারকাজে হস্তক্ষেপ করলো স্বয়ং রাজকন্যা। রাজকন্যা নেকাব পরা অবস্থায় অন্দর মহল থেকে বেরিয়ে এলো এবং সে তার পিতাকে বলল। আমি জানি কে ঘোড়ার আসল মালিক এবং আমি চাইলে এ বিচারের সঠিক রায় বের করে দিতে পারি। এজন্য পূনরায় দরবার বসাতে হবে। সেখানে আমাকে বিচারকাজ পরিচালনার সুযোগ দিলে আমি এ সমস্যার সমাধান দিতে পারব।
রাজকন্যার এহেন স্বয়ম্ভরি বক্তব্য শুনে রাজা খুশি হলেন। তিনি তার নিজের দেয়া রায় বাতিল করে কন্যাকে কাজী নিযুক্ত করে মামলার আপীল শুনানীর হুকুম দিলেন। সিদ্ধান্ত হলো পরদিন এ বিষয়ে আবারো দরবার বসবে।
যথারীতি ঘন্টাধ্বনি দিয়ে দরবার বসল। রাজা রাণী অন্যান্য আমার্ত্যগণ রাজ দরবারে উপস্থিত হলেন। রাজার পাশে আসন গ্রহণ করলেন রাজকন্যা। মসলিনের নেকাবে মুখ ঢেকে দুটো চোখ খোলা অবস্থায় রাজকন্যা বসলেন। যেন নেকাবের সূতোর সুক্ষ্ম ছিদ্র গলে বেরিয়ে আসছে রুপের দ্যুতি। আর দুটো চোখ যেন স্বর্গদেবীর দৃষ্টি। সেখানে উপস্থিত হলো ছদ্মবেশী রাজকুমার এবং ভিক্ষুকরুপী ঘোড়াচোর। রাজকুমার সবকিছু ভুলে চেয়ে রইলো তার স্বপ্ন কুমারির দিকে। বুঝোইতো এসব গল্পে যা হয়। একালের বাংলা সিনেমা হলে হয়তো তখনি একটা গান জুড়ে দিতো ‘‘ দু নলা বন্ধুক যেন তোমার দু’টি চোখরে’’।
রাজকন্যা তার বসনে লুকিয়ে রাখল কিছু একটা। ঘোড়ার ডিমের দাবী শুনে রাজকন্যা আগেই আন্দাজ করছিল যে, লোকটা আসলে জোচ্চর। রাজকন্যা লোকটাকে জেরা শুরু করল?
‘‘তুমি কি নিশ্চিত যে, তোমার ঘোড়ার ডিম থেকেই এ ঘোড়া হয়েছে’’
‘‘ আজ্ঞে আমি নিশ্চিত’’
একথা শোনার পর রাজকন্যা বড়ো সাইজের একটি ডিম সকলের সামনে রাখল। তারপর জানতে চাইল, ‘‘সে ডিমটা কি এমনই।’’
ভিক্ষুক দেখল বিশাল একটা ডিম, তাতে আবার লেখা রয়েছে ‘‘ঘোড়ার ডিম’’
তখন সে বলল, জি মহামান্য রাজকন্যা ‘‘এরকম একটি ডিম থেকেই আমার এ ঘোড়ার জন্ম হয়েছে?’’
রাজকন্যা জানতে চাইল, ‘‘সেটা কি তোমার বাড়ীতেই হয়েছে?’’
ভিক্ষুক মনে মনে খুশি, সে বলল , ‘‘জি আমার বাড়িতেই হয়েছে।’’
সভাসদরা ততক্ষণে গোঁফে তা দিচ্ছিল। কারণ তারা যা ভেবেছে তাই হতে যাচ্ছে। তারা ভেবেছে ডিম থেকেই ঘোড়ার জন্ম হয়েছে। এখন দেখছে স্বয়ং রাজকন্যার কাছেই আস্ত একটা ঘোড়ার ডিম রয়েছে। সূতরাং ঘোড়ার ডিমের ব্যাপারটা ভূয়া নয়।
এবার রাজকন্যা বলল, আমি তোমাকে এ ঘোড়াটিও দেব এবং তার সাথে আরো একটি তেজি ঘোড়া দেব। তোমাকে আর ভিক্ষে করতে হবে না তুমি ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে খেতে পারবে। প্রয়োজনে তোমাকে একটি গাড়িও দেব। এযে, আমার ডিম এটা তুমি নিয়ে যাও। এর থেকে আমাকে একটি টাট্টুঘোড়া এনে দাও। আমি বাচ্চা ঘোড়া পালব। এটা আমার শখ। বল এজন্য তোমার কতদিন লাগবে?
ভিক্ষুক কোনো কথা বলছেনা।
রাজকন্যা মৃদু ধমক দিয়ে বলল, কথা বলছনা কেন? কতদিনে তুমি আমাকে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে দেবে। তুমি যতদিন সময় চাইবে ততদিন পাবে।
ভিখারী আমতা আমতা করতে লাগল।
রাজকন্যা এবার বেশ জোরে ধমক দিয়ে বলল? কি ব্যাপার? তাড়াতাড়ি বল, কতদিনে তুমি ঘোড়ার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে দেবে?
এবার ভিখারী বুঝতে পারল, তার চালাকি রাজকন্যার কাছে ধরা পড়ে গেছে। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আর তার ঘোড়া চুরির কথা স্বীকার করল। এও স্বীকার করল। ঘোড়ার কোনো ডিম হয় না। তারকাছে কোনো তিন কোনো ঘোড়ার ডিমও ছিলনা।
তখন রাজার অমার্ত্যরা পাল্টা প্রশ্ন করল। ঘোড়ার কোনো ডিম না হলে রাজকন্যার এ ডিমটি কোথাথেকে এলো?
তারপর রাজকন্য নিজহাতে সে কথিত ডিমের উপর লাঠি দিয়ে একটা আঘাত করলো। তারপর তা থেকে একটা ঘোড়ার বাচ্চা বেরিয়ে এলো? না মোটেই তা নয়। বরং সেটা ভেঙেÍ গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। আসলে এটা ছিলো চুন দিয়ে বানানো একটা গোলা বা নকল ডিম। সেগুলো পাউডার হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
তখন সবাই বুঝতে পারল। রাজকন্যা বলে দিলো, ঘোড়ার ডিম আসলে একটা অসম্ভব বস্তু। অস্তিত্বহীন বস্তু বোঝাতে ঘোড়ার ডিম কথাটা ব্যবহার করা হয়। ঘোড়া যেহেতু স্তন্যপায়ী প্রাণী তাই আসলে ঘোড়ার কোনো ডিম হয়না। আর এটা রাজকন্যা চুন দিয়ে বানিয়েছে ভিক্ষুক ব্যাটাকে বোকা বানিয়ে চোর ধরার জন্য।
রাজকন্যার এএই বুুদ্ধিমত্তা দেখে সকলে খুশি হলো। রাজা কন্যাকে আর্শীবাদ করলেন। রানী গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। আর খুশি হয়ে ভিনদেশী রাজকুমার রাজকন্যাকে একটা হীরের আংটি উপহার দিলো।
হীরের আংটি দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। সাধারণ এক মুসাফির কোথা থেকে পেল এ আংটি। তারপর রাজপুত্র নিজের পরিচয় দিলেন। রাজন্যকন্যাকে প্রেম নিবেদন করলেন। রাজপুত্রের পরিচয় জেনে রাজা খুশি হলেন। তিনি তার মেয়ের জন্য এএই কাউকে খুঁজছিলেন। একসময় ধুম ধাম করে রাজকন্য আর রাজপুত্রের বিয়ে হয়ে গেল। অতপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। আমার কথাটি পুরোল, নটে গাছটি মুড়োল।
যেভাবে গল্পে থাকে সেভাবে জীবনে হয়না। কারণ গল্প বা সিনেমা শেষ হয় নায়ক নায়িকার মিলনের মধ্য দিয়ে। আর বাস্তবে আমাদের জীবন ও জীবনের সত্যিকার সমস্যা ও সংকট গুলো শুরু হয় দুজনের মহামিলৈনের পরে। আর সে সংকট না হওয়ার জন্য। মহামিলণের আগে ভাবতে হয়। পরে নয়।
গল্পটি জাহাঙ্গীর আলম শোভনের ‘‘লেখাপড়া করে যে’’ বই থেকে নেয়া।

