রাশিয়ার জনসংখ্যা ও এর ভবিষ্যৎ

রাশিয়ার জনসংখ্যা ও এর ভবিষ্যৎ

রাশিয়ার জনসংখ্যা হ্রাস: কারণ ও উত্তরণের উপায়

ভূমিকা

রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম ভূখণ্ডবিশিষ্ট দেশ হলেও, দেশটির জনসংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এটি একটি গুরুতর সমস্যা, যা রাশিয়ার অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং ভবিষ্যত প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রবন্ধে রাশিয়ার জনসংখ্যা হ্রাসের মূল কারণসমূহ বিশ্লেষণ করা হবে এবং সম্ভাব্য সমাধানসমূহ আলোচনা করা হবে।

জনসংখ্যা হ্রাসের কারণসমূহ

১. কম জন্মহার

রাশিয়ায় জন্মহার হ্রাস পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন। অনেক রাশিয়ান দম্পতি সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, কারণ তারা মনে করেন যে সন্তান লালন-পালন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

২. উচ্চ মৃত্যুহার

রাশিয়ার মৃত্যুহার বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রধানত হৃদরোগ, মাদকাসক্তি, মদ্যপান এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এটি ঘটে। বিশেষ করে, মদ্যপানের উচ্চ হার রাশিয়ান পুরুষদের গড় আয়ুষ্কাল হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ।

৩. দক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগ

অনেক তরুণ ও দক্ষ কর্মী উন্নত জীবনযাত্রার সন্ধানে পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রাশিয়ান নাগরিকদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করছে।

৪. জনসংখ্যার বার্ধক্য

রাশিয়ার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রবীণ। নবীন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভাব এবং কম জন্মহার এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তুলছে, ফলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

৫. যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করেছে। অনেক তরুণ যুদ্ধ এড়াতে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, যা জনসংখ্যা হ্রাসকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

উত্তরণের উপায়

১. জন্মহার বৃদ্ধি

ক) পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক প্রণোদনা, যেমন সন্তান জন্মগ্রহণের পর সরকারি ভাতা বৃদ্ধি করা।
খ) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুন ও যুগলদের জন্য লেখাপড়া ও কারিগরি শিক্ষায় বৃত্তি ও নাগরিকত্বের ব্যবস্খা করা।
গ) উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, ডাক্তারদের জন্য নাগরিকত্ব, সন্তান জন্মদানের সময় চিকিৎসা ব্যয় বহন ইত্যাদি
ঘ) দীর্ঘমেয়াদী মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান।
ঙ) শিশু যত্ন ও শিক্ষা খরচ কমানোর জন্য সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি।
চ) সরকার কতৃক তরুনদের উদ্যোগে ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা।

২. স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ ও বহৃমাত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা

ক) স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
খ) বিদেশ থেকে ডাক্তার ও নার্স আনার নীতি প্রণয়ন করা।
গ) মুসলিম, খ্রিষ্টান ও হিন্দু মিশনারী হাসপাতাল তৈরীর সুযোগ করে দেয়া। এসব হাসপাতালে কমমূল্যে বিদেশী ও স্বদেশীদের জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
ঘ) মাদকাসক্তি ও মদ্যপানের হার কমানোর জন্য প্রচারাভিযান ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা।
ঙ) মাদকের প্রতি আগ্রহ কম এমন দেশ ও সম্প্রদায়ের মানুষকে পূনবাসন করা।
চ) নগরসমূহে বহুমাত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া।
জ) পরিবারকেন্দ্রীক সমাজ গঠনে সামাজিক কল্যাণমুলক সংগঠনসমূহকে কাজের সুযোগ দেয়া।

৩. অভিবাসন নীতি সহজীকরণ

ক) দক্ষ শ্রমিক, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের অভিবাসন নীতি শিথিল করতে হবে।

খ) আফ্রিকা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে থেকে শ্রমিক অভিবাসী আসার পথ সুগম করতে হবে।

গ) যেসব দেশে যুদ্ধ চলছে এবং যেসব দেশে প্রাকৃতিক দূর্যোগ হয় সেসব দেশ থেকে অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে নাগরিক সুবিধা দিয়ে বসবাসের সুযোগ দেয়া।

ঘ) অভিবাসীদের রাশিয়ান সমাজে দ্রুত অন্তর্ভুক্তির জন্য ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এবং তারা যেন নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম চর্চা করতে পারে সে সুযোগ দেয়া।

ঙ) চীন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, মিশর, আফ্রিকা, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া সহ বেশকিছু দেশের মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান ও কাজ করে সেসব দেশ গঠনে কাজ করছে। এসব দেশের মানুষকে রাশিয়ান শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি নিজেদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করে বসবাস ও কাজের সুযোগ দিলে তারা আগামী দিনের রাশিয়া পূণর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে। এজন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।

৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

ক) নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ করা এবং দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা। দেশের নাগরিক বাড়লে চাহিদা বাড়বে চাহিদা বাড়লে নতুন নতুন উদ্যোগ তৈরী হবে।

খ) উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রথমত বিদেশী বিনিয়োগ সহজতর করা যেতে পারে। বিদেশী এসএমই বিনিয়োগ নীতি তৈরী করে ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এতে করে যেমন লোক আসবে তেমন বিনিয়োগ আসবে আবার নতুন নতুন উদ্যোগ তৈরী হবে। তবে যেন অপব্যবহার না হয় সেজন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা তৈরী করতে হবে।। যেমন যারা এসএমই বিনিয়োগ ভিসায় অভিবাসী হবেন তারা কোনো অবসথায় সরকারের অনুমতি ব্যতিত চাকরী করতে পারবেন না।
খ) প্রযুক্তি ও গবেষণার ওপর বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত করা। বিশেষ করে কৃষিতে গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারলে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে এবং কোনো নিষেধাজ্ঞা তখন কাজ করবেনা। মধ্য আয়ের এবং দরিদ্র দেশের নতুন আবিষ্কারকদের নাগরিকত্ব প্রদান ও তাদের আবিষ্কারকে বাজারজাত করণে বিশেষ স্কিম চালু করা যেতে পারে।

গ) এলাকাভিত্তিক অর্থনীতির পণ্য (কৃষি বা শিল্প) নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী বিনিয়োগ ও উন্নয়ন করা যেতে পারে। প্রতিটি এলাকায় এমনভাবে নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের ছক করতে হবে। যাতে সে এলাকায় পণ্য উৎপাদন করে বিদেশেও রপ্তানি করা যায়।

ঘ) দেশের অঞ্চলসমূহকে একটি রুট এর মধ্যে এনে তাকে গ্রীণ রুট বা এগ্রো রুট অন্যকোনো নাম দিয়ে সে রুট ধরে রাস্তা, ট্রেণ, কৃষি ক্ষেত্র, শিল্পাঞ্চল তৈরী করার মাধ্যমে জাতীয় সাপ্লাই চেইন তৈরী করতে হবে এবং তাকে আন্তজাতিক সাপ্লাই চেইনের সাথে যুক্ত করতে হবে। এতে খরচ কমবে উৎপাদন হবে এবং একটি পণ্য আরেকটি পণ্য উৎপাদনের জন্য সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হবে এবং অর্থনীতি আরো গতিশীল হয়ে উঠবে। অভিবাসীরাও আকৃষ্ঠ হবে।

৫. রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

ক) যুদ্ধ এড়িয়ে কৌশলগতভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের রাস্তা বের করা।

খ) যেক্ষেত্রে যুদ্ধ এড়ানো যাবে না সেক্ষেত্রে যুদ্ধের ক্ষতিকারক প্রভাব রোধ করতে কৌশলগত বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করা।

গ) রাষ্ট্রের বিভিন্নক্ষেত্রে নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

ঘ) তরুণদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা।

ঙ) কৃষি, খাদ্য ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো

চ) বিদেশী বিনিয়োগের জন্য অনুকূল নীতি প্রস্তুত করা।

রাশিয়ার জনসংখ্যা হ্রাস একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধু নিজ দেশের চিন্তা নয় বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও চিন্তাবিদদের স্কলারশিপের মাধ্যমে ‍যুক্ত করতে হবে। তাহলে তাদের সংযুক্তিতে নতুন ধারণা বেরিয়ে আসবে এবং বিভিন্ন দেশে ইতিবাচক বার্তা যাবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply