রাষ্ট্র ও পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার শক্তি ও আগামী দিনের করনীয়

রাষ্ট্র ও পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার শক্তি ও আগামী দিনের করনীয়

রাষ্ট্র ও পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার শক্তি ও আগামী দিনের করনীয়

রাশিয়ার ইতিহাস শুরু হয় ৩য় ও ৮ম খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব স্লাভদের মাধ্যমে, যারা ইউরোপের একটি স্বীকৃত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ভারাঞ্জিয়ান যোদ্ধা ও তাদের বংশধররা রাশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নবম শতকে দেশটির উত্থান শুরু হয়। ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য থেকে খ্রিস্টান ধর্মের গোঁড়া রীতি গ্রহণের মাধ্যমে স্লাভ সংস্কৃতি ও বাইজান্টাইন সংস্কৃতির মধ্যে এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ঘটে, যা রাশিয়ার সাংস্কৃতিক চেহারা দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবিত করে।

রাশিয়া অনেক ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায় এবং মোঙ্গলদের আক্রমণের ফলে বেশিরভাগ এলাকা দখল হয়ে যায়। যাযাবরদের কাছে এই অঞ্চলটি ছিল এক ধরনের স্বর্গ, তবে মস্কোর গ্র্যান্ড ডিউক তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পার্শ্ববর্তী রুশ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত রাশিয়া বিজয় ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইউরোপের পোল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকার আলাস্কা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, যা ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য। রুশ শব্দটি পুরনো ল্যাটিন ভাষার “রুথেনিয়া” থেকে উদ্ভূত, যা দক্ষিণ ও পশ্চিম রাশিয়ায় ব্যবহৃত হত, এবং আজকের রাশিয়া নামটি কিয়েভান রাশের বাইজান্টাইন গ্রিক শব্দ “Ρωσσία” থেকে এসেছে

রাশিয়ার বর্তমান রাষ্ট্র ও পরাশক্তি হিসেবে শক্তিশালী দিক এবং দুর্বলতাগুলি বিশ্লেষণ করলে, কিছু প্রধান বিষয় উঠে আসে:
শক্তিশালী দিকসমূহ:

সামরিক শক্তি:
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তার কাছে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, এবং সামরিক বাহিনী অত্যন্ত উন্নত। রাশিয়ার অস্ত্র ও সামরিক কৌশল বিশ্বের অন্যান্য শক্তির তুলনায় যথেষ্ট ভয়ঙ্কর।

প্রাকৃতিক সম্পদ:
রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পন্ন দেশগুলোর একটি, বিশেষ করে তেল, গ্যাস, এবং খনিজের ক্ষেত্রে। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার বিশেষ প্রভাব রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান:
রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিস্তৃত, যা তাকে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করে। এটি কৌশলগত অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।

রাজনৈতিক প্রভাব:
রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, যা তাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি ভূমিকা দেয়। এছাড়া, রাশিয়া বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরানো প্রভাবশালী এলাকা যেমন পূর্ব ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, এবং দক্ষিণ ককেশাসে তার প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম।

প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা:
রাশিয়া প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় একটি শক্তিশালী জাতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ অনুসন্ধান কর্মসূচি থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে রাশিয়া এখনও তার মহাকাশ কর্মসূচি চালু রেখেছে এবং এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সাধন করেছে।

আগামী দিনের করনীয়

অর্থনৈতিক দুর্বলতা স্থায়ী হতে পারে না।
রাশিয়ার অর্থনীতি তেল ও গ্যাসের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে বা রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য তা বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া, রাশিয়ার অর্থনীতি তেমন বৈচিত্র্যময় নয়, যার কারণে এটি সংকটের মুখে পড়তে পারে। রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য আরো ১টি বা দুটি বিকল্প নিয়ে আসতে হবে। অস্ত্র ছাড়াও মহাকাশ বিদ্যা রপ্তানি ও মহাকাশ বিদ্যায় অন্যদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নে কম খরচে সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়া চাইলে যেমন অনেক মধ্যম আয়ের দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নত করতে পারে। তেমনি আবার তাদের সাথে কৌশলগত কিছু আঞ্ছলিক শক্তি বিনিময় করতে পারে।

অন্তর্দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে হবে।
রাশিয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা সংকুচিত। দেশটি গণতান্ত্রিক নয় এবং সরকার বিরোধী মতামত দমন করে থাকে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং মানুষের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। এখানে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পর্যায়ক্রমে এবং ক্ষেত্র বিশেষে নাগরিকদের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র তৈরী করতে হবে। সরকার ও রাজনীতি কতটা গণতান্ত্রিক হবে সেটা রাষ্ট্রের কৌশলগত বিষয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে আরো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বতষ্ফুর্ত দেশ গঠনের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সংক্রান্ত কৌশল মোকাবিলা করতে হবে।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংযুক্তির পর থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ নিষেধাজ্ঞাগুলি রাশিয়ার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসিব নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর দিক দূর করতে রাশিয়াকে অগ্রসর পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করতে হবে।

রাশিয়ার আরো নাগরিক দরকার
রাশিয়ার জনসংখ্যা স্থির বা হ্রাসমান। স্বাস্থ্য সেবার অবস্থা, নিম্ন জন্মহার, এবং উচ্চ মৃত্যু হার এই প্রবণতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে শ্রমবাজারে সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। রাশিয়া কৌশলগত কিছু উদোগ নিলে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। যেমন
ক) রাশিয়াকে সারা বিশ্বের কাছে এই বার্তা আরো পরিষ্কার করে দিতে হবে যে সেদেশে ধর্ম ও সংষ্কৃতির কোনো বিভেদ নেই।
খ) রাশিয়ার আবাদী অংশের প্রদেশগুলোতে বিদেশীদের জন্য শর্ত সহজ করতে হবে। বিবাহরীতির উদারতা। নাগরিকত্বের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে আকর্ষনীয় জীবন উপহার দিতে হবে।
গ) খাদ্য ও কৃষি উৎপাদনে গবেষণা ও বৈচিত্রের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে।

শক্তিশালী মিত্রের দরকার
রাশিয়া কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে রয়েছে এর কারণ পশ্চিমা সকল শক্তি ইউরোপ বলয়ে থাকে। তাদের সাথে ন্যাটো জোটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রা। রাশিয়ার প্রধান যেমন চীন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায়শই উত্তপ্ত থাকে, যা রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাবকে সীমিত করে। তবে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে থাকলে মিত্র বাড়তে পারে। এছাড়া ইরান ও ভারত রাশিয়ার বেশ ভাল মিত্র।

রাশিয়া, সামরিক শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে শক্তিশালী হলেও, তার অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তার জন্য ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এসব দুর্বলতাগুলির মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply