কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ভূমিকা
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ (Agriculture & Livestock) খাত অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই খাতের আধুনিকায়ন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি চালুকরণ এবং সাপ্লাই চেইনের মানোন্নয়নে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা (Donors) এবং আন্তর্জাতিক এনজিও কাজ করছে।
সরকার এবং বেসরকারি খাতের (Private Sector) সাথে এই সংস্থাগুলোর কাজের ধরন, অর্থায়নের শর্ত, তাদের কাঠামোগত দুর্বলতা ও তার সুনির্দিষ্ট সমাধান নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে উপস্থাপন করা হলো:
বাংলাদেশে প্রধান দাতা সংস্থা ও এনজিওসমূহ
বাংলাদেশে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রধানত তিন ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করে:
-
বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক তহবিল: বিশ্বব্যাংক (World Bank), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD), এবং ইসলামিক ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (IsDB)।
-
জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা: খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)।
-
দ্বিপক্ষীয় দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিও: ইউএসএআইডি (USAID – যুক্তরাষ্ট্র), জাইকা (JICA – জাপান), ডানিডা (DANIDA – ডেনমার্ক), সুইজারল্যান্ড সরকারের SDC, হেফার ইন্টারন্যাশনাল (Heifer International), এবং সাস্টেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (SAF)।
সহযোগিতার ধরন, তহবিল প্রাপক ও কার্যপদ্ধতি
ক. সরকারের সাথে কার্যপদ্ধতি (Public Sector Interventions)
-
কারা কাজ করে: বিশ্বব্যাংক, IFAD, ADB, IsDB এবং FAO সরাসরি সরকারের সাথে কাজ করে।
-
সহযোগিতার ধরন: এরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি বড় অবকাঠামো নির্মাণ, জাতীয় নীতি ও গবেষণা সংস্কার এবং দেশব্যাপী প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করে। (যেমন- বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত $৫০০$ মিলিয়ন ডলারের LDDP – Livestock and Dairy Development Project এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের PARTNER প্রকল্প)।
-
কাদের তহবিল দেয়: অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডি (ERD)-এর মাধ্যমে সরাসরি সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর (যেমন- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএলআরআই) এই তহবিল পায়।
-
শর্তসমূহ: এগুলো সাধারণত ‘Concessional Loan’ বা সহজ শর্তের ঋণ। ঋণের মেয়াদ ৩০ বছর, গ্রেস পিরিয়ড ৫ বছর এবং সুদের হার ১.২৫% থেকে ২% এর কাছাকাছি থাকে। তবে শর্ত থাকে যে, ক্রয়ের ক্ষেত্রে (Procurement) আন্তর্জাতিক দরপত্র ও কঠোর অডিট গাইডলাইন মানতে হবে।
বেসরকারি খাত ও এনজিওদের সাথে কার্যপদ্ধতি (Private Sector Interventions)
-
কারা কাজ করে: USAID, IFC (বিশ্বব্যাংকের প্রাইভেট উইং), হেফার ইন্টারন্যাশনাল, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।
-
সহযোগিতার ধরন: এরা মূলত বাজার সংযোগ (Market Linkages), খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং এবং কৃষি-প্রযুক্তির আধুনিকায়নে কাজ করে। (যেমন- ইউএসএআইডি-এর অর্থায়নে লাইভস্টক প্রডাক্টিভিটি প্রজেক্ট বা হেফার ইন্টারন্যাশনালের ছাগল ও গরুর মাংসের ব্র্যান্ডিং প্রকল্প)।
-
কাদের তহবিল দেয়: এরা সরাসরি সরকারের কোষাগারে টাকা না দিয়ে স্থানীয় এনজিও (যেমন- ব্র্যাক, ওয়েভ ফাউন্ডেশন, ইএসডিও) অথবা সরাসরি বেসরকারি কোম্পানি (যেমন- ব্যাংক এশিয়া, প্রাণ ফুডস, আইফার্মার)-কে অংশীদারিত্ব বা অনুদান (Grants) হিসেবে তহবিল দেয়।
-
শর্তসমূহ: এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুদান বা ‘ম্যাচিং গ্রান্ট’ (Matching Grant—যেখানে কোম্পানিকে ৫০% বিনিয়োগ করতে হয়, দাতা সংস্থা দেয় ৫০%)। শর্ত থাকে যে, এই অর্থ দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী বা ক্ষুদ্র খামারিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তাদের বাজার নিশ্চিত করতে হবে এবং শতভাগ ‘কমপ্লায়েন্স’ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে।
দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রধান দুর্বলতা ও ভুলসমূহ
বিগত কয়েক দশকে এই খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত টেকসই রূপান্তর না হওয়ার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট গাফিলতি ও ভুল রয়েছে:
১. প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সরকারি চ্যানেলে আসা দাতা সংস্থার প্রকল্পগুলোর অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ে বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেক সময় ৫ বছরের প্রকল্প শুরু হতেই ২ বছর কেটে যায়, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না।
২. ‘টপ-ডাউন’ (Top-Down) পদ্ধতি ও বাস্তবতাবর্জিত মডেল
অনেক দাতা সংস্থা বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতার সাথে মিল না রেখে পশ্চিমা বা আফ্রিকান মডেল চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ, এমন হাই-টেক মিল্কিং মেশিন বা আইওটি ডিভাইস প্রান্তিক খামারিদের দেওয়া হয়, যা নষ্ট হলে মেরামত করার মতো মেকানিক স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না।
৩. টেকসই ব্যবস্থার অভাব (Lack of Sustainability)
প্রকল্প চলাকালীন (৩ থেকে ৫ বছর) খামারিরা বিনামূল্যে বীজ, ফিড বা সার পান এবং মাঠকর্মীদের তদারকি থাকে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এনজিও বা দাতা সংস্থা চলে যায় এবং পুরো কার্যক্রমটি অর্থায়নের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
৪. বড় করপোরেটের সুবিধা ও প্রান্তিক খামারিদের বঞ্চনা
বেসরকারি খাতের অনেক অনুদান বা সিড-ফান্ড ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বড় বড় এগ্রো-করপোরেট কোম্পানিগুলোর কাছেই যায়। ফলে প্রকৃত প্রান্তিক খামারি বা একদম তৃণমূলের স্টার্টআপগুলো এই তহবিল ও কারিগরি সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।
৫. সাপ্লাই চেইনের চেয়ে উৎপাদনমুখী ফোকাস (Supply Chain Oversight)
অধিকাংশ প্রকল্পই ‘উৎপাদন বাড়াতে’ (যেমন- বেশি ডিম বা বেশি দুধ উৎপাদন) ব্যস্ত থাকে। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য কীভাবে বাজারে সংরক্ষিত থাকবে, কোল্ড চেইন কীভাবে চলবে বা খামারি সিন্ডিকেটের হাত থেকে কীভাবে বাঁচবে—সেই বাজারজাতকরণ বা পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় তাদের অর্থায়ন থাকে খুবই সামান্য।
দুর্বলতাসমূহের সুনির্দিষ্ট সমাধান ও ভবিষ্যৎ করণীয়
দাতা সংস্থাগুলোর তহবিলকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নিচের সংস্কারগুলো জরুরি:
১. আউটপুট-ভিত্তিক অর্থায়ন (Result-Based Financing): আমলাতান্ত্রিক ফাইলের কাজের ওপর ভিত্তি করে তহবিল ছাড় না করে, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কতটুকু কাজ হলো (যেমন- কতটি গরুর প্রজনন সফল হলো বা দুধের মান কতটা বাড়ল), তার ডিজিটাল ডেটা দেখে কিস্তিতে অর্থ ছাড় করতে হবে।
২. স্থানীয় প্রযুক্তির আধুনিকায়ন (Appropriate Technology): অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিদেশী ডিভাইস আমদানির চেয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি (যেমন- স্থানীয় মেকানিকদের দ্বারা মেরামতযোগ্য চিলিং ভ্যান বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট)-কে দাতা সংস্থাগুলোর প্রমোট করা উচিত।
৩. প্রস্থান কৌশল বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ (Exit Strategy) বাধ্যতামূলক করা: যেকোনো প্রকল্প শুরুর আগেই এটি বন্ধ হওয়ার পর কীভাবে স্বাবলম্বী হবে, তার ছক থাকতে হবে। খামারিদের সমবায় (Co-operative) বা অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করে দিতে হবে, যেন দাতা সংস্থা চলে গেলেও তারা নিজেদের ফান্ডে ব্যবসা সচল রাখতে পারে।
৪. পিকেএসএফ (PKSF) মডেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সমন্বয়: বড় করপোরেটকে সরাসরি বড় অনুদান না দিয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)-এর মতো আমব্রেলা ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার নিবন্ধিত প্রান্তিক ডেইরি ও পোল্ট্রি খামারিকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে তহবিল ও প্রযুক্তি সুবিধা বণ্টন করতে হবে।
৫. এসএমই ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা: গ্রামীণ সমবায় সমিতি ও এলাকা ভিত্তিক সমিতি মডেল সৃষ্টি করে গ্রামীণ এসএমই, ক্ষুদ্র ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে কনসোটিয়াম মডেল বাস্তবায়ন করা যায়। যার মাধ্যমে একটি লাইভ স্টক ইকোসিস্টিম তৈরী করতে ভূমিকা রাখা যায়।
৬. কোল্ড-চেইন ও প্রসেসিংয়ে ৫০% বাজেট বরাদ্দ: উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রকল্প কমিয়ে আগামী ৫ বছর দাতা সংস্থাগুলোর উচিত তাদের মোট বাজেটের অন্তত অর্ধেক লজিস্টিকস, কোল্ড স্টোরেজ, আন্তর্জাতিক হালাল সার্টিফিকেশন ল্যাব স্থাপন এবং সরাসরি বাজার সংযোগ (Market Linkage) তৈরিতে ব্যয় করা।
উপসংহার
বাংলাদেশে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে দাতা সংস্থাগুলোর অবদান অনস্বীকার্য, তবে কেবল “প্রকল্পের বাজেট শেষ করার” মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সরকার, প্রাইভেট সেক্টর ও দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় জবাবদিহিমূলক সমন্বয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তবেই বিদেশী অর্থায়নের প্রতিটি ডলার বাংলাদেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

