AI hub

সরকারী প্রতিষ্ঠানে এআই হাব প্রসঙ্গ

সরকারি প্রতিষ্ঠানে এআই হাব (AI Hub) প্রতিষ্ঠা

প্রযুক্তি যখন মানুষের জায়গা দখল করছে ঠিক সে সময়ে এসে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ বিশ্বজুড়ে শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক সেবা প্রদানের ধারণা খোল নলসে বদলে দিচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সূচনা লগ্নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)  এক নতুন বিপ্লবের সুচনা করেছে। যা ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর বিষয় নয়, তা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার এক অন্যতম মৌলিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে।  সেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা এবং নাগরিক সেবার ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন ফরম্যাটে ‘AI Hub’ (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করছে। স্মার্ট গভর্ন্যান্স (Smart Governance) বা বুদ্ধিমান শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পৌঁছে দিতে এই হাবগুলো কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সব দেশ ও সরকার একই নামে কাজ করছে বিষয়টি তা নয়। তবে নাম যাই হোক প্রত্যেকের লক্ষ্য কিন্তু এক। সেটা হলো সেবার মান বাড়ানো ও জনগনের জন্য উপযোগিতা বৃদ্ধি করা। এরকম কিছু উদ্যোগ নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।

 প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা

প্রথাগত সরকারি সেবা ব্যবস্থায় প্রায়শই জনবলের অভাব, তথ্যের অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের মতো চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। এই চ্যালেঞ্জগুলো দূর করে শাসনব্যবস্থাকে আধুনিক ও নাগরিক-বান্ধব করার লক্ষ্যেই মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানে এআই হাবের জন্ম। এর মূল প্রয়োজনীয়তাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

স্মার্ট গভর্ন্যান্সের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা: কাগজ-কলম বা সাধারণ ডাটাবেজ নির্ভর ফাইল ম্যানেজমেন্ট থেকে বের হয়ে স্বয়ংক্রিয় এবং বুদ্ধিমান ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এআই হাব একটি সার্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

নীতি নির্ধারণে নির্ভুলতা ও ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ: একটি দেশের বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি ডেটা (Big Data) উৎপাদিত হয়। এআই হাব এই বিশাল ডেটা ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঠিক, বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

সম্পদ ও প্রযুক্তির অপচয় রোধ করা এবং গতিবৃদ্ধি করা: সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ যদি আলাদা আলাদাভাবে প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে যায়, তবে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের অপচয় হয়। একটি কেন্দ্রীয় ‘হাবে’র মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ও টুলস ভাগাভাগি (Share) করে ব্যবহার করা হলে খরচ এবং শ্রম দুটোই বাঁচানো সম্ভব হয়।

 এআই হাবের প্রধান কাজসমূহ

একটি সরকারি AI Hub মূলত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, গবেষণা এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান কাজগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

নাগরিক সেবার স্বয়ংক্রিয় ও সহজীকরণ (Automation): এআই হাবের অন্যতম প্রধান কাজ হলো চ্যাটবট (Chatbot) বা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো প্রযুক্তি তৈরি করা, যা ২৪/৭ সাধারণ মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং সরকারি ফরমে ভুলত্রুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনাক্ত করতে পারে।

ভবিষ্যৎবাণী ও দূরদর্শী বিশ্লেষণ (Predictive Analytics): আবহাওয়া, কৃষি, স্বাস্থ্য কিংবা যানজটের মতো জটিল বিষয়ের অতীত ডেটা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে (যেমন: ফসলের ফলন কেমন হবে, সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ কোথায় বাড়তে পারে বা কোন রাস্তায় যানজট তৈরি হতে পারে) তা আগে থেকেই অনুমান করা এই হাবের অন্যতম কাজ।

নথিপত্র ডিজিটালাইজেশন ও সংরক্ষণ: এআই-ভিত্তিক ওসিআর (OCR) প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরনো ঐতিহাসিক ফাইল, দলিল বা হাতে লেখা সরকারি নথিকে দ্রুত ডিজিটাল ও অনুসন্ধানযোগ্য টেক্সটে রূপান্তর করার কাজটি এআই হাবের মাধ্যমে করা হয়।

দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরি: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উপযুক্ত করে তুলতে এবং সরকারি কাজের গতি বাড়াতে বিভিন্ন কর্মশালা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা এই হাবের দায়িত্ব।

  • নৈতিকতা ও নিরাপত্তা গাইডলাইন প্রণয়ন: সরকারি পর্যায়ে AI ব্যবহারের নৈতিকতা (Ethical AI), ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা।

এআই হাবের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধাসমূহ

সরকারি প্রতিষ্ঠানে এআই হাব প্রতিষ্ঠার ফলে সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়।

সরকারের জন্য সুবিধাসমূহ:

১. রিয়েল-টাইম মনিটরিং: এআই চালিত ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে দেশের যেকোনো খাতের প্রকৃত চিত্র (Real-time data) দেখা সম্ভব হয়, যা দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

২. দুর্নীতি ও জালিয়াতি রোধ: বাজেট বরাদ্দ, ত্রাণ বিতরণ বা সরকারি অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে সনাক্ত করা যায়, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হয়।

৩. নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা: সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

নাগরিকদের জন্য সুবিধাসমূহ:

১. হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত সেবা: কোনো সরকারি অফিসে সশরীরে না গিয়েই এআই-চালিত পোর্টাল বা অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন সনদপত্র, লাইসেন্স বা ভাতার আবেদন করা এবং দ্রুত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাক করা হয়, তাই ফাইলের স্থবিরতা দূর হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

৩. যোগাযোগের সহজতা: সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় বা মুখে বলেই সরকারি সেবা বা তথ্য সহজে বুঝে নিতে পারে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো

বিশ্বের উন্নত এবং উদীয়মান অর্থনীতির অনেক দেশই সরকারি কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে এবং দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য সরকারি AI Hub বা বিশেষায়িত এআই কাঠামো গড়ে তুলেছে। নিচে চারটি শীর্ষস্থানীয় দেশের মডেল আলোচনা করা হলো:

সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ২০১৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত একজন পৃথক এআই মন্ত্রী (Minister of State for AI) নিয়োগ দেয়। ২০২৭ সালের মধ্যে তারা বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ AI-Native Government (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সরকার) হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।

কাঠামো ও সাফল্য: তাদের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘National AI Strategy 2031’। তাদের ‘TAMM’ নামক একটি এআই-সক্ষম হাবের মাধ্যমে সরকারের হাজারেরও বেশি নাগরিক সেবাকে একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে। এর ফলে নাগরিকরা সরকারি দপ্তরে না গিয়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে চ্যাট বা ভয়েসের মাধ্যমে চোখের পলকে ট্রেড লাইসেন্স, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত জটিল আইনি কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন।

ভারত (India)

ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) এবং তৃণমূল স্তরের জনগণের কাছে সেবা পৌঁছানোর জন্য ভারত এআই হাবের একটি অনন্য মডেল তৈরি করেছে।

কাঠামো ও সাফল্য: ভারত সরকারের ইলেকট্রনিক্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি मंत्रालয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে ‘IndiaAI Mission’। এর কাঠামোটি মূলত একটি বড় “পাবলিক কম্পিউট পুল” (Public Compute Pool)-এর মতো, যেখানে দেশের স্টার্টআপ, গবেষক এবং সরকারি বিভাগগুলো খুব কম খরচে এআই অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পায়। এর অধীনে তৈরি ‘Bhashini’ (ভাষিণী) এআই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভারতের সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায় মুখে কথা বলে সরাসরি কৃষি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিষয়ক সঠিক পরামর্শ পাচ্ছেন।

সিঙ্গাপুর (Singapore)

নিখুঁত নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিবান্ধব সরকারি সেবার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম সেরা রোল মডেল মনে করা হয়।

কাঠামো ও সাফল্য: সিঙ্গাপুরের কাঠামোটি মূলত ‘Smart Nation and Digital Government Office (SNDGO)’ এবং ‘AI Singapore (AISG)’-এর যৌথ সমন্বয়ে গঠিত। তারা এআই হাবের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নগরীর একটি লাইভ ডিজিটাল রেপ্লিকা বা ‘Virtual Singapore’ (ডিজিটাল টুইন) তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তারা শহরের রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বর্ব্য ব্যবস্থাপনা এবং পাবলিক হাউজিংয়ের বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

যুক্তরাজ্য (United Kingdom)

জনসেবা ও স্বাস্থ্যখাতে এআই-এর নিরাপদ ও নৈতিক ব্যবহারের জন্য যুক্তরাজ্য অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী।

কাঠামো ও সাফল্য: যুক্তরাজ্য সরকার এআই হাবে দ্বিমুখী কাঠামো ব্যবহার করেছে।

-একটি হলো জনসেবায় এআই-এর ব্যবহার বাড়ানোর জন্য তৈরি ‘AI Opportunities Action Plan’

– অপরটি হলো নিরাপত্তার জন্য বিশ্বের প্রথম ‘AI Safety Institute’

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় কাউন্সিলগুলো এআই হাবের মাধ্যমে সমাজকর্মীদের সাহায্য করার জন্য বিশেষায়িত এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করেছে। আবাসন সমস্যা দূরীকরণ এবং গৃহহীন হতে যাওয়া পরিবারগুলোকে আগে থেকে সনাক্ত করে পুনর্বাসনে তারা বড় সাফল্য পেয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ কী করবে? যেকোনো সচেতন পাঠক বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশের করনীয় ঠিক করতে পারবে। এখন কাজ হলো একটি এআই নীতিমালা, কৌশলপত্র ও টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ শুরু করে দেয়া। পাশাপাশি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর শিক্ষা কাঠামোতে নিয়ে আসা।  বাংলাদেশ সরকারের করনীয় নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে অন্য লেখায়।

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply