Balu River

অন্তবর্তী সরকারের দূর্বলতা, উদাসীনতা ও ভুল সুখ

অন্তবর্তী সরকারের দূর্বলতা, উদাসীনতা ও ভুল সুখ

আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি যেকোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ঠদের চেয়ে অবশ্যই কম জানি। আমি রাজনীতিবিদদের চেয়ে কম ধারণা করতে পারি। আমি বিশেষজ্ঞদের চেয়ে অনেক কম বুঝি।

আমি এই দেশ ও এই দেশের মানুষকে যতটা বুঝি। তার ভিত্তিতে আমি বিগত অন্তত ২৫ বছর ধরে লিখছি বলছি। এদেশের মানুষের উপযোগী রাষ্ট্র, বিচার ও শাসন ব্যবস্থা লাগবে। অন্য কোনো দেশের অনুলিপি নয়। নিজস্ব আইন বিচার ও সংবিধান তৈরীর ক্ষেত্রে কোনো দেশের ভাল কিছু গ্রহণ করা যেতেই পারে।

স্কুল জীবন থেকে পত্র-পত্রিকার চিঠিপত্র কলাম আর সরকারী দপ্তরে সমস্যার সমাধান নিয়ে লেখার অভ্যাস আমার। প্রথমবার সম্ভবত ২০১৩ কি ১৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরে আমার লেখার প্রেক্ষিতে একটি সুনামিতে দাওয়াত পাই। পরে তারা পলিথিন নিয়ন্ত্রণের একটি ‘‘ধারণাপত্র’’ জমা দিতে বলে। জমা দিই। সেটা সেখানে শেষ। পরবর্তী ৫ বছর শতাধিক চিঠির বিপরীতে ডজন খানেক সরকারী দপ্তরে সভায় গিয়ে পরামর্শ দেয়ার সুযোগ পাই। ফলাফল ১%। ১শ পরামর্শের হয়তো একটি কোনো নীতিতে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু কার্যকর হয়নি।

২০২০ থেকে বিগত ২৪ এই ৫ বছরে শতাধিক চিঠি দেই। একটি দায়িত্বেও সুবাদে এই সময়ে শতাধিক সরকারী সভায় যোগদান করি । সব মিলিয়ে শতাধিক বিষয়ে অন্তত ৫ শতাধিক পরামর্শ তুলে ধরি। এখানেও ফলাফল ১০%। বিভিন্ন নীতি পলিসিতে গড়ে আমার মতামতের ১০% প্রতিফলন আছে। ক্ষেত্রে বিশেষে ০% থেকে ৩০% পর্যন্ত। অবশ্য কিছু কিছু বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখার পর হয়তো ১ টা প্যারা নিয়েছে। ভলিউম এর দিক থেকে চিন্তা করলে এটাও ১% এর বেশী হবে না। বেশ কয়েকটি আইডিয়া বাস্তবে প্রমাণও করে দিয়েছি।

২০২৪ এর আগষ্টের পরে আমি ১ বছরেই শতাধিক চিঠি অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ধারণাপত্র, আইনের খসড়া বিধিমালা পররাষ্ট্রনীতি ব্যতিত প্রায় সকল বিষয়ে মোট ৪৯টি অধ্যায়ে ৭শ পৃষ্ঠায় ৫টি বইতে ২ লাখ শব্দের ‘‘রাষ্ট্র সংষ্কার’’ বিষয়ক পরামর্শমালা সরকারের সকল উপদেষ্ঠা ও দপ্তরে মেইল প্রেরণ করি। কোনো দপ্তরে মূদ্রিত কপিও জমা দিয়ে আসি।

What to do? How to do? Who to do? Why to do? When to do? Where to do? ইত্যাদি বিস্তারিত এমনকি কোন উদ্যোগ নিলে কি সমস্যা হবে তার সমাধান কি? সব লিখে দিই। এসবের ব্যাখ্যা এবং কর্মপরিকল্পনা বা Action Plan দিতেও প্রস্তুত ছিলাম।

এখন কোনো কিছু সামাজিক মাধ্যমে লিখতে ইচ্ছে করে না। বিশাল জনগোষ্ঠিকে এক নেতা ও তার দল সাইকো বানিয়ে রেখে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে লিখলে তারা হামলে পড়ে। কারণ তাদের আপা বলছে। যারা তাদের বিরুদ্ধে লিখবে তাদের পোস্টে কমেন্ট করে তাদেরকে দূর্বল করে দিতে হবে। আর যদি বর্তমান সরকার এর বিপক্ষে কোনো কিছু যায়। তাহলে এরা পাশবিক আনন্দে মেতে উঠে। আমরা সচেতন মানুষ হিসেবে যার যা অন্যায় তা লিখি।  এটা আমাদের বিবেকের বিষয়। হয়তো সব ইস্যু সব কিছু নিয়ে লিখি না। হয়তো ১০টা বাদ দিয়ে ১টাতে লিখি। সাইকো রিজিমেও ১শটা বাদ দিয়ে ১টা লিখেছি। বছরে হয়তো ২টা প্রতিবাদ করেছি। এখন হয়তো ২ মাসে ১টা করি।

কারণ একটা বিষয়ে উন্নয়ন হয়েছে সেটা হলো, মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেটা আগে ছিল না। এমনকি সাইকোরা এখনো সাযোমাতে মানুষের পেছনে লেগে আছে। ৫ আগষ্টের পর যা কিছু ভাল এবং মন্দ হয়েছে এক কথায় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এটা বলতে হবে।

প্রথমত, সাইকো রিজিমে যা ভাল হয়েছে তাও আশার অতীত। উন্নয়ন হয়তো দূর্নীতি দিয়ে কেটে গেছে। কারণ উন্নয়নের চেয়ে দূর্নীতি ৯গুণ বেশী হয়েছে। কিন্তু ১০ হাজার ঘটনার মধ্যে ২টার বিচার হয়েছে। সেটাও কম না। কারণ সেটাও তাদের করার কথা ছিল না। হ্যাঁ তারা সেটা বিপদে পড়ে করেছে বা সেটার উদাহরণ দিয়ে বক্তৃতা দেয়ার জন্য করেছে হতে পারে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, ৮৬ সালে যে নিজেকে জাতীয় বেইমান ঘোষনা করেছে। তাকে ৯৬তে মানুষ ভোট দিয়েছে। থাকুক তাদের জাল ভোটের মহড়া কিন্তু  ৩০% শতাংশ ভোটারতো তার পক্ষে ছিল। আদালত যাকে ‘‘রং হেডে ‘’ পার্সন বলেছে।  যারা প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছে ১৭৩ দিন হরতাল জাহাজ পুড়িয়ে, পরেরবার এসেছে লগি বৈঠা দিয়ে মানুষ মেরে, ‍মিছিলে গুলি করে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে লাশের উপর দিয়ে তারা যতটা ভাল করেছে। সেটা কম না।

হ্যাঁ পরিসংখ্যানে তাদের ভাল কাজ কম। খারাপ কাজ বেশী। সেটা হতে পারে। এমনকি যে কারণে এই সরকার আত্মতৃপ্তিতে ভোগে সেটা হলো বিগত ১৫ বছরের প্রতিদিনের গুম, খুন, হত্যা লুট ইত্যাদি বর্তমানের চেয়ে পরিসংখ্যানে অনেক বেশী। কিন্তু তাদের দলের নীতি ছিল এগুলো করা। এবং অনেকে হয়তো আগে বিশ্বাস করতোনা এখন সবাই জানে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব করার নির্দেশনা ও অনুমোদন দেয়া হতো। তাদের কাছে অল্প কিছু ভাল কাজ পাওয়াও কম নয়।

পক্ষান্তরে ১৬শ মানুষের জীবনের বিনিময়ে যে সরকার বসলো তারা কেন তাদের চেয়ে তুলনামূলক ভাল হবে। তাদের সময়ে কেন পাথর দিয়ে মানুষ মারবে। মাথর লুট হবে। রাঘব বোয়ালদের ছেড়ে দিয়ে সাধারণ দলীয় কর্মীদের উপর নির্যাতন হবে?

আমি মোটেও অস্বীকার করছি না যে, সাইকোরা মাঠে আছে। আছে বিশাল চোর বাটপার শ্রেণী। সেইসাথে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনের দূর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। তাতে দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারতো। তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু যেসব বড় ঘটনা ঘটছে। সেগুলোর দায়তো সরকারকে নিতে হবে। এবং দায় নিয়ে পদত্যাগও করতে হবে সংশ্লিষ্ঠদের। দরকার হলে পুরো সরকার নতুন করে গঠন করতে হবে।

প্রশাসনে সরকারের লোকের বদলে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর লোক আছে। সেটাই স্বাভাবিক। প্রধান উপদেষ্ঠার কার্যালয়ে ৭৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১১ জন সেনা অফিসার দিয়ে তাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেটাও লক্ষ্য করা গেছে। তা সত্বেও সরকার কাজ করছে চেষ্টা করছে। এটা কম কিসের? এটা বলার কোনো সুযোগ নেই।

কারণ আপনাকে পরিবর্তন ও সংষ্কারের জন্য বসানো হয়েছে। তুলনামূলক ভালোর জন্য নয়। কোনো রকম সময় পার করে নির্বাচন দেয়ার জন্য নয়। শুধু নির্বাচন হলে আরো অনেক মানুষ ছিল। একটা নির্বাচনের জন্য নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত লোক লাগে না। কাজ করতে না পারলে সরে যান। জানি দেখুক কারা কি করে?

ভারতীয় জুজুর ভয়ে সংষ্কার না করে বিদায় নেবেন। আপনারা জাতির আরো বড় ক্ষতি করে গেলেন। কারণ সাইকোদের কাছ থেকে জাতি ভাল কিছু আশা করেনি। আর আপনাদের কাছ থেকে আকাশসমান প্রত্যাশা ছিল।

প্রশাসন সহযোগিতা না করলে কি করতে হবে। সেটাও আমি আমার পরিকল্পনায় দিয়েছি। কোনটার পর কোনটা করতে হবে? কোন কোনটা না করলেই নয়। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। কিছু ক্ষেত্রে গুটিকয়েক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তা ১%ও নয়।

আমি জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে ৪৫০টির বেশী অভ্যুত্থান হয়েছে। এর মধ্যে ২শটির বেশী ছিল অসামরিক অভ্যুত্থান। কোনোটিতে স্থিতিশীলতা আসেনি। এবং কোনো কোনো দেশে এখনো সে অস্থিরতা চলছে দশকের পর দশক। যেসব দেশে ভাল নেতৃত্ব ছিল তারা সাড়ে ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে একটি কাঠামো উপহার দিয়েছে এবং পরে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সে লক্ষণটুকু নেই।

প্রথমত, পৃথিবীর কোনো দেশে গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী এসে সরকার গঠনে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। সরকার বিপ্লবীরাই করেছে। আবার যেসব ক্ষেত্রে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। সেখানে জনগনের অংশগ্রহণ ছিল না। আমাদের প্রথম অভ্যুত্থান বেহাত হয় সরকার গঠনে সেনা হস্তক্ষেপ মেনে নেয়ার মাধ্যমে।

এখানে ৩ তারিখে সেনাবাহিনী জনতার পক্ষ নেয়াতে অভ্যুত্থানে বিজয় সহজ হয়েছে সত্য। কিন্তু সেনাবাহিনী তখনি এই অবস্থায় গিয়েছে যখন তারা বুঝতে পেরেছে তারা আর ঠেকাতে পারবে না। তাছাড়া র‌্যাব এবং বিডিআরে যেসব অফিসার গুলি চালিয়েছে তারা সেনাদেরেই লোক। আমরা হয়তো অনেকে সেটা ভুলে গিয়েছি। এটাও সত্য সব সেনারাই জনতার পক্ষে সবসময় ছিল এবং তারা জনতার এ ধরনের উত্থানের অপেক্ষায় ছিল। যদিও কতিপয় দালাল সেনা সংস্থাকে বিতর্কিত করেছে। কারণ তারা সাইকো ইনজেকশন নিয়েছিল।

 

বিগত রাজনৈতিক সরকারগুলো দেশের যে ক্ষতি করেছে অন্য দৃষ্টিতে চিন্তা করলে এই সরকার তারচেয়ে বেশী করেছে। কারণ তাদের সংষ্কার ও পরিবর্তনের সে সুযোগ, ইচ্ছা ও যোগ্যতা ছিল না। এদের সুযোগ ও ম্যান্ডেট ছিল। কিন্তু এরা ফেসবুক দেখে দেশ চালায়। শেষ পর্যন্ত ফেসবুকারদেরকেও খুশি করতে পারেনি।

এখন যদি হয় তারা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সেনা সহযোগিতা পায়নি যেটা অন্যান্য অস্থায়ী সরকার পেয়েছে। আমি বলব তাহলে তাদের ক্ষমতা ধরে বসে থাকার কোনো মানে ছিলনা। নির্বাচন বহু হয়েছে আরো হবে। কিন্তু সংষ্কারের এই সুযোগ আর আসবেনা। তাই আমি মনে করে এরা যদি সংষ্কার করতে না পারে তাহলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেয়া উচিৎ।

যদিও সে দায়িত্ব কে দিবে এটা বিরাট প্রশ্ন। একদিনে সেনাবাহিনী প্রধানের ভূমিকা নিয়ে ধোয়াশা ও অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি থেকেও না থাকার মতো। সাইকোরা পুতুল রাষ্ট্রপতিতে বিশ্বাসী ছিল। তাদের সেসব রাজনৈতিক কৌশল জাতিকে বিভিন্নভাবে ধ্বংস করেছে আরো করবে। আর বর্তমান এবং পরবর্তী সরকারের দূর্বলতা ও ভুলনীতি হয়তো আরো ২০ বছরের জন্য বা তারো বেশী সময়ের জন্য পরিবর্তনের রেখাচিত্রকে ভুল পথে পরিচালিত করবে।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

( লেখকের অণ্য একটা লেখার সংক্ষিপ্তরুপ)

ছবি: লেখক

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply