সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কিভাবে পাঠানো যায়।

পিআর বিতরণ মডেল

প্রেস রিলিজ বিতরণ মডেল

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

পিআর লিখে ফেলার পরই যদি কাজ শেষ হয়ে যেতো তাহলে কতনা সহজ হয়ে যেতো সবকিছু। এই পিআর লিখার পর তা যদি ছাপাই না হয় তাহলে তার স্বার্থকতা কিসে? নাহয় মাল তুললেন দোকানে কিন্তু বিক্রি হলো না সেরকম ব্যাপারে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো কষ্ট করে সঠিক কাজে সঠিক পিআরটা তৈরী করার পর সেটি প্রকাশের চ্যালেঞ্জেও জয় লাভ করতে হবে।

১. প্রতিষ্ঠান কতৃক সরাসরি সংবাদ মাধ্যমে পিআর প্রেরণ করে-
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায়শই এই পদ্ধতির ব্যবহার করে। ইউরোপের সাংবিধানিক আদালত, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সরকারী এজেন্সিগুলোও একইভাবে সংবাদ মাধ্যমে পিআর পাঠান। রাজনৈতিক দল বা অন্যকোনো প্রতিষ্ঠানও একইভাবে লিখিত পিআর সংবাদ মাধ্যমে পাঠায় বা পাঠাতে পারে।

২. কোনো পিআর সংস্থার সেবা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে পিআর প্রেরণ করা হয়-
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পিআর এজেন্সিকে নিয়োগ করে। কেউ কেউ পিআর ম্যানেজার নিয়োগ করে। কেউ আবার কোনো সাংবাদিককে পিআর এজেন্ট বা পিআর কনসালটেন্ট নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তাদের কাজ হলো পিআর লেখা ও ছাপার যাবতীয় ব্যবস্থা করা।

৩. উপস্থিত পিআর-
সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে হাতে হাতে পিআর বিতরণ একটা পুরনো উপায়। যখন কোনো সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত বলার পাশাপাশি সংবাদ কর্মীদের হাতে পিআর তুলে দেয়া হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পিআর আগে লেখা থাকে। কখনো কখনো অতিথিদের কাছ থেকে তাদের বক্তব্য জেনে তা আগেই লিখে রাখা হয়। অথবা উদ্দৃতি বাদ দিয়ে বাকী অংশ লিখে রাখা হয়। পরে উদ্বৃতি যোগ করে তা সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এটা জনপ্রিয় একটা পদ্ধতি। বর্তমানে হার্ডকপি এর পাশাপাশি সাংবাদিকদের ই-মেইলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কপি ও ছবি প্রেরণ করতে হয়। সম্ভব হলে ভিডিও ক্লিপও।

৪. প্রতিনিধির মাধ্যমে সরাসরি সংবাদ মাধ্যমে পিআর প্রেরণ
একসময় এটাই সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল। কিন্তু আজকাল ই-মেইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে যখন কোনো পণ্য নমূনা পিআর এর সাথে দিতে হয় সেক্ষেত্রে এখনো সরাসরি পিআর পাঠানো হয়। প্রতিনিধিরা পত্রিকা অফিসে গিয়ে বার্তা সম্পাদকের সাথে দেখা করে অথবা না করে প্রিন্টিং কপি দিয়ে আসেন। আজকাল সাথে কোনো গিফট থাকলে এভাবে পিআর দেয়া হলেও সফটকপি এখন আর এড়িয়ে যাওয়া যায়না। কারণ এখন হার্ডকপি থেকে লেখার মতো অবস্থা কারো নেই। সফটকপি থাকলে তা এডিট করে তাকে একটা জাতে তুলে আনা যায়।

৫. ডাক বা কুরিয়ার যোগে লিখিত পিআর প্রেরণ
এটা একটু পুরনো পদ্ধতি। আজকাল কেউ এভাবে পিআর পাঠান না। তবে এই উপায়টা একেবারে উঠে যায়নি। বিশেষ করে যখন কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ পাঠানোর ক্ষেত্রে ই-মেইল প্রতিবাদ পাঠায় আবার ফোন করে বলে দেয়। তারপর সে পত্রিকা যেন অস্বীকার করতে না পারে যে, প্রতিবাদ পাঠানো হয়নি। আক্ষরিক অর্থে এখন আর ডাকে পাঠানো হয়না। কারণ প্রতিনিয়ত ঘটনা এত দ্রæত ঘটে ইলেকট্রনিক্স মাধ্যম ছাড়া সেগুলোর সাথে তাল মিলানো সম্ভব নয়।

৬. ফ্যাক্সযোগের পি আর প্রেরণ
১০ বছর আগেও ফ্যাক্সে পিআর পাঠিয়েছি। ফ্যাক্সে পাঠানো পিআরকে গুরুত্ব দেয়া হতো। এমনকি ই-মেইল সেবা গণহারে চালু হওয়ার আগে জেলা উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা তাদের সংবাদ ফ্যাক্সে পাঠাতো। এজন্য এখনো অনেক পত্রিকা তাদের যোগাযোগ নাম্বারের মধ্যে ফ্যাক্স নাম্বার দেখায়। এখনো আপনি পত্রিকার যোগাযোগ বিভাগে ফ্যাক্স নাম্বার দেখতে পাবেন। একসময় টরে টক্কা টেলিগ্রামের প্রচলন থাকলেও এখন সেটা উঠে গেছে। তখন মফস্বলে সংবাদকর্মীরা জরুরী প্রয়োজনে টেলিগ্রামের মাধ্যমেও সংবাদ প্রেরণ করেছে।

৭. ই-মেইল যোগে পিআর প্রেরণ
বর্তমানে এই উপায় সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত এবং বেশী জনপ্রিয়। ই-মেইল টেক্স আকারে পাঠানো হলে এটা পত্রিকা অফিসকে আবার নতুন করে টাইপ করতে হয়না। তবে বাংলাভাষায় পিআর পাঠানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই বিজয় বাংলা এবং ইউনিকোড উভয়ভাবে পাঠালে ভাল। তাতে প্রিন্ট এবং অনলাইন উভয় ক্ষেত্রে প্রিন্ট করা সহজ হয়ে যায়। এতে করে পিআর ছাপানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

৮. মিডিয়া গ্রæপ তৈরী করে পিআর শেয়ার
এটা একেবারে নতুন পদ্ধতি। কিছু ননফরমাল বা নন অফিসিয়াল। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পরিচিত সাংবাদিকদের নিয়ে ফেসবুক বা হোয়াটসআপ গ্রæপ তৈরী করে। ফলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো বিষয় শেয়ার করতে পারে। এতে করে সংবাদকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয় এবং সম্পর্ক উন্নয়ন হয়। সংবাদকর্মীরা দ্রæত পিআর পেয়ে যান। তবে এটা অফিসিয়াল পদ্ধতি নয় বিধায় এভাবে পিআর শেয়ার করার পরও অফিসিয়াল মেইল থেকে পিআর প্রেরণ করতে হয়।

৯. ভিডিও নিউজ রিলিজ
আজকাল টেক্স এর পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্বৃতি দেয়ার জন্য ভিডিও বার্তা শেয়ার করতে পারে। সেটা যেকোনো মাধ্যমে হতে পারে। তাতে কোনো উত্তপ্ত ইস্যুতে নিউজ করার করার জন্য সংবাদকর্মীরা উদৃতি ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমেরা সংবাদকর্মীরা সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তির কাছ থেকে ভিডিও বাইট দিতে বলে।

১০. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পিআর প্রকাশ
আজকাল নিজেদের অবস্থান দ্রæত জানানোর জন্য প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনগুলো তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেইজে পিআর প্রকাশ করে থাকে। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হয়ে যাওয়া ইস্যু নিয়ে মিডিয়া অনেকসময় তা প্রকাশ করতে চায়না। বিশেষ করে খুব জরুরী বা জনস্বার্থ ইস্যু না হলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এজন্য অনেক প্রতিষ্ঠান প্রথমে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করে। পত্রিকায় প্রকাশের পরে তারা সামাজিক মাধ্যমে তা শেয়ার করে।

১৩. নিজস্ব বøগ বা ওয়েবসাইটে পিআর প্রকাশ
অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজেদের বøগ থাকে। কেউ আবার একাধিক বøগে স্পন্সর করেন। কারো নিজেদের ওয়েবসাইটে বøগ বা নিউজ সেকশন থাকে। পত্রিকায় পাঠানোর পর নিজেদের বøগেও ভিজিটরদের জন্য পিআর প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এতে সাইটও সমৃদ্ধ হয়। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভিজিটর প্রতিটি বিষয়ে আপডেটের থাকেন। অনেকে আবার পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সে সূত্রসহ নিজেদের সাইটে লিংক প্রকাশ করে থাকেন। এটা একটা কৌশলগত ব্রান্ডিং ভিজিটরকে দেখানো যে, আমাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। নিজেদের সাইটে নিজেদের পিআর প্রকাশ কোনো গর্বিত কাজ না হলেও এখানে অন্তত ৩টা সুবিধা আছে।
১. আপনি আরেকটি অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করে বিষয়টির একটি ব্যাকলিংক বাড়িয়ে নিলেন।
২. আপনার সাইটে বা বøগে প্রকাশের মাধ্যমে আপনার সাইটের এসইও বাড়িয়ে নিলেন।
৩. আপনার পণ্যটি নিয়ে কেউ গুগলে সার্চ দিলে সরাসরি আপনার সাইটে আসারও একটা লিংক করে দিলেন। সেক্ষেত্রে পিআর এর নিচে পণ্যের লিংকটা দিলে তা আরো কার্যকর হবে।

১৪. স্পোকসম্যান বা মূখপাত্র :
কখনো কখনো কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা জনসম্পৃক্ত বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমে এবং সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যকে বিষয়টি জনসাধারণতে জানিয়ে দিতে। আলোচনা শেষে বা সিদ্ধান্ত গৃহিত হওয়ার পর তা স্পোকসম্যান বা মূখপাত্রের মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়ে দেয়া হয়। এটা কখনো পিআর আকারে. কখনো বক্তব্য আকারে কখনো মৌখিক প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দেয়া হয়। এবং ছাপা হওয়ার ক্ষেত্রে এটা নিউজ উপাদান হিসেবে ছাপা হয়। খবরের সূত্র হিসেবে মূখ্যপাত্রের উদৃতি টানা হয়। সরকারী বা আন্তজাতিক এজেন্সির ক্ষেত্রে এটা করতে দেখা যায়।

১৫. প্রেস সার্ভিস
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পিআর লেখা ও প্রকাশের জন্য প্রেস সার্ভিস বিভাগ রাখেন অথবা তৃতীয়পক্ষকে নিয়োগ দেন। তাদের কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের পিআর তৈরী করে মিডিয়াতে পাঠানো এবং শীর্ষ ও বেশীরভাগ মিডিয়াতে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করা। পিআর এজেন্সিও এই কাজ করে থাকে।

১৬. সাবমিশন সফটওয়ার:
আজকাল সবকিছু বেশ এগিয়ে। ই-মেইল ও ফ্যাক্স ছাড়াও অনেকের নিজস্ব পিআর সাবমিশন সফটওয়ার রয়েছে। যার মাধ্যমে তারা নির্ধারিত সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমকে পিআর পাঠিয়ে থাকেন। সংযুক্তরা দ্রæতই সব পেয়ে যায়। যাদের সফটওয়ার বানানোর ক্ষমতা নেই। তারা বিশেষ করে পিআর এজেন্সিগুলো সাবমিশন সফটওয়ার বা ই-মেইল গেটওয়ে ব্যবহার করে পিআর প্রেরণ করে থাকেন।

১৭. প্রেস কনফারেন্সে
প্রেস কনফারেরেন্স সরাসরি সাংবাদিকদের হাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তি ধরিয়ে দেয়া হয়। এই বিষয়ে আমরা আগে আলোচনা করেছি। অনেকে পিআর এজেন্সি, নিউজ এজেন্সি, মার্কেটিং এজেন্সি হায়ার করে রাখেন। তাদের মাধ্যমে পুরো কাজটি সম্পন্ন করেন। এছাড়া আরো কিছু উপায়ে পিআর প্রকাশ হয়। তবে সেগুলো মূল উপায় নয়। মূল উপায় হলো সংবাদ মাধ্যমে পিআর পাঠানো। এর পাশাপাশি অন্যান্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ড, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্টদের ইমেইল। এখানে অবগতির জন্য বা সূত্র হিসেবে পিআর প্রদর্শন করা হয় মাত্র। পিআর বা প্রেস রিলিজ এর মূল স্বার্থকতা পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

১৮। প্রেস নোট

প্রেস নোট নিয়ে কি আরেকটা লেখা হতে পারে?

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply