বাণিজ্য সংগঠনে প্রশাসক নিয়োগ প্রসঙ্গে
বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২ বাংলাদেশের ব্যবসা, শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর ভূমিকা, কার্যক্রম, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা সুসংহত করতে প্রণীত একটি আইন। এই আইনের মাধ্যমে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর লাইসেন্স, নিবন্ধন, কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিধানাবলী নির্ধারিত হয়েছে। এটি বাণিজ্য সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য সংগঠন বা ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনসমূহ নিবন্ধিত হয় কোম্পানী আইনে এবং পরিচালিক হয় বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ১৯৯৪ ও বাণিজ্য সংগঠন আইন ২০২২ (সংশোধিত ২০২৩) অনুসারে। বাণিজ্য সংগঠন আইন ২০২২ এর বাণিজ্য সংগঠনে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগ প্রয়োজনে বাণিজ্য সংগঠনে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। এটা সরকার যেকোনো পরিস্থিতি করতে পারলেও সাধারণত কিছু বিষয় বিবেচনা করে ডিটিও এটা করে থাকে। কারণ এটি যেকোনো পক্ষ কতৃক আদালতের শরনাপন্ন হলে সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে সাধারণত দেখা যায় আদালত কোনো পক্ষ যদি রিট করে তাহলে ৬ মাসের বা ৩ মাসের স্থগিতাদেশ দিয়ে থাকে।
আর যে পরিস্থিতি দেখে ডিটিও প্রশাসক নিয়োগ দেয় সেটা হলো
১। সময়মতো নির্বাচন, এজিএম না হলে প্রশাসক নিয়োগ হয়।
২। কমিটি না থাকলে প্রশাসক নিয়োগ হয়।
৩। নিয়ম বহিভূতভাবে কমিটি গঠিত হলে প্রশাসক নিয়োগ হয় যদি কেউ অভিযোগ করে এবং শুনানিতে তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
৪। কমিটির বেশীরভাগ সদস্য পদত্যাগ করলে বা সব সদস্য পদত্যাগ করলে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যেসব অ্যাসোসিয়েশনে কমিটি নিয়ে সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছে সেসব অ্যাসোসিয়েশনের বেশীরভাগ গুলোতে সরকার প্রশাসক নিয়োগ করেছে। ২/১টি ছাড়া বাকীগুলোতে তা বহাল ছিল।
প্রশাসক নিয়োগ হলে যে সমস্যা হয়
১। প্রশাসক নির্বাচন কেন্দ্রীক কাজ করে এবং দৈনিন্দিন রুটিন ওয়ার্ক করে। ফলে সেক্টরের উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ হয়।
২। প্রশাসক এজিএম, ইজিএম, অডিট করে না বা করতে পারে না। কারণ একটি ধারায় নিরীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করার বিষয়ে প্রশাসকের কাজের ক্ষেত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
৩। সদস্যরা সচেতন ও একটিভ না হলে এবং পলিসি না বুঝলে প্রশাসকেরা পলিসি বিষয়ে মতামত দেয়ার ক্ষেত্রে নিরব থাকে কারণ তারা বিতর্ক এড়াতে চায়।
৩। প্রশাসক বিভিন্ন সভায় ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে সব সময় ভূমিকা রাখতে পারে না। কারণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবকে সাধারণত প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। তার নানারকম মূলক দায়িত্বের ব্যস্ততা থাকে। তিনি অনেক সময় ঠিকভাবে সময় দিতে পারেন না। কিছু কিছু অ্যাসোসিয়েশনে প্রশাসক সহায়ক কমিটি গঠন করলেও। সহায়ক কমিটি নির্বাহী কমিটির সমকক্ষ নয় বলে অনেক সভায় তাদের সেভাবে ডাকা হয়না বা মতামত গুরুত্ব দেয়া হয় না। কখনো কখনো দেখা যায় অভিজ্ঞতার অভাবে তারা ভাল পরামর্শ দিতে পারে না। তবে শুধু প্রশাসক থাকার চেয়ে সহায়ক কমিটি থাকলে সেক্টরের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। সহায়ক কমিটিতে সঠিক লোক বাছাই করলে সমস্যা অনেকটা দূর করা যায়।
৪। প্রশাসক নিয়োগের কারণ যথেষ্ঠ শক্তিশালী না হলে যে কেউ আদালতে যেতে পারে। এবং আদালত প্রশাসক নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ দিতে পারে।
৫। প্রশাসক নিয়োগ হলে তিনি আর্থিক কোনো দায়িত্ব নেবেন না। বরং তিনি আর্থিক সম্মানি গ্রহণ করতে পারেন। তাই সংগঠন আর্থিক সংকটে পড়ে পুরো কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। কারণ নির্বাহী কমিটি যেকোনোভাবে নিজেরা অনুদান দিয়ে বা ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনুদান সংগ্রহ করে আর্থিক সংকট দূর করে থাকে। যদিও আমাদের দেশে সদস্যরা নির্বাহী কমিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে থাকে। ট্রেড বডিতে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ কম হলেও বিরল নয়। তবে সাধারণত অ্যাসোসিয়েশন এর বিরুদ্ধে মামলা করা যায়না বিধায় এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সংগঠনে খুব বেশী আর্থিক লেনদেন হয়না বিধায় এগুলো সরকারী কতৃপক্ষ তেমন একটা আমলে নেয় না। আবার আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো ফৌজদারী অপরাধের আওতায় পড়ে বিধায় একজন প্রশাসকের তা নিয়ে কাজ করার এখতিয়ার থাকে না।
এই আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী, সরকার কোনো বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। প্রশাসক নিয়োগের সময়, উক্ত সংগঠনের কোনো সদস্য ফেডারেশনের নির্বাচনে প্রার্থী বা ভোটার হতে পারেন না এবং ফেডারেশনের সাধারণ পরিষদে সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব স্থগিত থাকে।
প্রশাসক নিয়োগের বিকল্প
১। যদি কমিটির মেয়াদ থাকে আইন অনুযায়ী একজন করে সদস্য পদত্যাগ করবে। এবং একজন করে সদস্য নির্বাহী কমিটি কতৃক মনোনীত হয়ে কমিটি পুরণ হবে। এভাবে কমিটি পূনগঠিত হতে পারে কোনো নির্বাচন ছাড়াই। তবে তাদেরকে অবশ্যই বিগত নির্বাচনে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম রাখতে হবে বিশেষ করে যারা মনোনীত হবেন। মেয়াদ না থাকলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে মেয়াদও বৃদ্ধি করতে পারে।
২। দুই তৃতীয়াংশ ইসি মেম্বার কটিমিতে থাকবে। এক তৃতীয়াংশ ইসি মেম্বার গত নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্ধন্ধি থেকে নেয়া হবে। কমিটি পূর্নাঙ্গ করে নতুন বোর্ড বা পুরনো বোর্ড দিয়ে নতুন তফসিলে নির্বাচন হবে। এই বিধানটি সরাসরি কোনো আইনে না থাকলেও যেহেতু দুই তৃতীয়াংশ সদস্য অনুপস্থিত থাকলেও কোরাম হয় সেক্ষেত্রে ১ তৃতীয়াংশ সদস্য না থাকলেও কমিটি টিকে যায় এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে যদি বহালকৃত সবাই উপস্থিত থাকে। যেহেতু অন্য একটি বিধানে বিশেষ করে সেসব বডির মেয়াদ ৩ বছর তাদেরকে প্রতি বছর পর ১ তৃতীয়াংশ সদস্য স্বেচ্চায় বা লটারি বা ভোটের মাধ্যমে পদত্যাগ করে সে জায়গায় নির্বাহী কমিটির ভোটে ভোটার তালিকা থেকে সদস্যপূরণ করা যায়। সে মোতাবেক পদত্যাগকারী এক তৃতীয়াংশ সদস্যকে বাকী সদস্যরা ভোটার তালিকা থেকে নির্বাচন করতে পারার কথা।
বাণিজ্য সংগঠন নিয়ে নানা জটিলতা রয়েছে এসব নিরসনে বাণিজ্য সংগঠন আইন সংশোধন করা হলেও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ১৯৯৪ এখনো সংশোধন করা হয়নি। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ২০২১, ২০২২, আবার ২০২৩এ এটি সংশোধন চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেটা পাস হয়নি।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
নির্বাহী পরিচালক, ই-ক্যাব

