কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস জীবনকে পিছিয়ে দেয়
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
কিছু বিষয় থাকে, যা আমরা খুব ভালো জানি না। তখন আমাদের অবচেতন মন যদি বিষয়গুলো আমাদের মাঝে নিয়ে আসে; আমরা কাল্পনিক যুক্তি দিয়ে এক ধরনের সাময়িক সমাধান বের করি। পরে সেটাকে বিশ্বাসে রূপান্তর করি। কখনো কখনো যে বিষয়গুলো আমরা বুঝি, সেগুলোর সাথেও আমরা আমাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলোকে জুড়ে দিই। যখন সেসব বিশ্বাসের উপর ভর করে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি তখন ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে না পেরে ভাগ্যকে দোষারোপ করি। কখনো কখনো সৃষ্টিকর্তা কিংবা বাবা-মা ও বড়দের দোষারোপও করে থাকি।
যে ভুল আমরা করেছি বা যে কাজ করার কারণে কিংবা না করার কারণে আমাদের আজকের পরিণতি সে কাজটা যদি অন্যভাবে করতাম তা হলে কি সবকিছু এমনই হতো? এরকম কিছু বিষয় নিয়ে এখানে ভাবনার অবতারণা করব, যাতে ভুলের গÐি থেকে বেরিয়ে আমরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
বেশি খেলে বেশি লাভ
কখনো কখনো খাবার টেবিলে বসে শিশুদের দেখা যায় খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে। আসলেই বিষয়টি শিশুসুলভ। অনেকে অনুষ্ঠানে ভালো খাবারের লোভ করে থাকেন। আজকাল এমন মানুষ আছে ভাবতে অবাক লাগে। হোস্টেল কিংবা মেসে খুব ভালোভাবে দেখে মাছের বড় পিসটা কিংবা তরকারি কোন বাটিতে বেশি আছে সেটা নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখান থেকেই হীনম্মন্যতা শুরু হয়। কারণ, আমরা ধরে নিয়েছি আমি বেশিটা নেব, বড়টা নেব, আমি জিতব এবং আমি লাভবান হব।
এমনকি যে, কোনো বিষয়ে আমাদের ভোগের সীমাবদ্ধতাও আছে। যেমন ধরুন, পেট ভরে গেলে মন চাইলেও আর খেতে পারব না। তেমনি একটা মানুষ নিশ্চয় অনেক জামা একসাথে পরতে পারে না, অনেক বাড়িতে একসাথে থাকতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের লোভহীন হতে শেখায়।
আসলে কি বেশি খেলে লাভবান হওয়া যায়? তার চেয়ে বরং কোনটি বেশি পরিষ্কার, কোনটিতে তেল-ঝাল কম, কোনটি বেশি পুষ্টিগুণসম্পন্ন সেটা নিয়েও যদি প্রতিযোগিতা হতো তা হলে একটু জেতার আশা ছিল। অবশ্য কোনো নির্জন দ্বীপে আমি যদি একদল মানুষের সাথে আটকা পড়ি আর সেখানে খুবই সীমাবদ্ধ খাবার থাকে তখন বেঁচে থাকার তাগিদে খাবারের জন্য প্রতিযোগিতা করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
আমি বলি কি! আমাদের ভোগের ইন্দ্রিয় একটা করে। যেমন মুখ একটা। আর কাজের ইন্দ্রিয় দুটো করেÑ যেমন হাত, পা, চোখ, কান এমনকি নাকেরও দুটো ছিদ্র। এই শারীরিক গঠন আমাদের এটাই শেখায়Ñ আমি যা ভোগ করব তার চেয়ে দ্বিগুণ অর্জন করব। প্রতিটি মানুষ এই শিক্ষা গ্রহণ করলে পৃথিবী কতই-না সুন্দর হতো।
একটা ব্যবস্থা হবেই, না খেয়ে মরব নাকি?
অলস লোকেরা নিজেরা কোনো কাজ শিখে না এবং কোনো কাজ খোঁজে না। তারা মনে করে, একটা ব্যবস্থা হবেই। না খেয়ে মরব নাকি? আমিও আশা করি হয়তো একটা ব্যবস্থা হবে।
দেখুন, না খেয়ে মরেছে এমন ঘটনা পৃথিবীতে কতবারই না ঘটেছে। অনেকে বলেন ‘দুনিয়াতে যখন আসা হয়েছে রিজিক এসে গেছে’ আমিও কথাটার সাথে একমত। দুনিয়াতে সবারই রিজিক আছে, তবে সেটা কারো হাতের কাছে নয়। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, পৃথিবীর মাত্র ১ ভাগ লোকের কাছে দুুনিয়ার অর্ধেক সম্পদ। আর দেশে দেশে, যুগে যুগে অনেক মানুষ না খেয়ে মরেছে! এখনও মরছে। আমাদের দেশে আজো না খেয়ে মানুষ মরার নজির আছে। ২০১৭ সালের শেষের দিকে কেবল ভাতের জন্য কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরকম ঘটনা সা¤প্রতিককালে কয়েকটি ঘটেছে। যুগে যুগে দেশে দেশে দুর্ভিক্ষে মানুষের না খেয়ে মরার ইতিহাস অনেক আছে! সুতরাং রিজিক তালাশ করার জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। আর তা না হলে না খেয়ে মরার দলে পড়ার সম্ভাবনা যে একেবারে নেই, সেটা বলা যায় না।
পরীক্ষায় পাস করেছি, লেখাপড়া শেষ। আর কী শেখব, কী পড়ব?
হায় হায় বলছেন কি! তা হলে বলুন তো, এ প্লাস বি হৌল স্কয়ারের সূত্রটি কর্মজীবনের কোথায় কাজে লাগবে? যদি ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা ম্যাথের টিচার না হোন। তা হলে আপনার কর্মজীবনে যা লাগবে, তা শেখার জন্য শিক্ষাজীবনে একটি প্লাটফরম বা মিডিয়াম তৈরি করেছেন মাত্র।
আমাদের জীবনযাত্রা যেমন বদলে যাচ্ছে, তেমনি বদলাচ্ছে কাজের ধরনে। তার সাথে চাকরি ও ব্যবসার ধরনও। আর প্রতিদিনের এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ার জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত শেখার মধ্যে থাকতে হবে। বরং ছাত্রজীবনে শিখেছেন একটা সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম ধরে। আর কর্মজীবনে কোনো প্রশ্ন সাজেশন নেই, যেমনটা আমরা পরীক্ষার আগে তৈরি করি। যা নিয়ে আমাদের জীবনের চলার পথে যা-কিছু প্রয়োজন, তা-ই জানতে হবে, শিখতে হবে। বলতে পারেন, এই পৃথিবীর সবকিছুই সিলেবাস।
কম দিয়ে জিতে গেলাম
এই প্রবণতা আমাদের দেশের সর্বত্র। দোকানে গেলে ওজনে কম দেয়া, বাসে ভাড়া না দেয়া ইত্যাদি। দুই টাকা, পাঁচ টাকা কম দিয়ে সত্যি জেতা যায় না। বিশেষ করে বাসে উঠার সময় আগে উঠে জিততে চায় সবাই। আসলে কি তাই? আমি যখন দুই পাশে দুই জনকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বাসে উঠি তখনই আমি মানুষটা স্বার্থপর আর বিশৃঙ্খল হয়ে গেলাম আশপাশের মানুষদের কাছে। এটা যদি জেতা হয় তা হলে বলতে হয়, সত্যি আমি জিতে গেছি!
প্রতিনিয়ত জিতে যাওয়ার চেষ্টা করে মানুষের কাছে নিজের ইমেজ নষ্ট করছি। ফলে আমার সাথে কেউ কখনো ব্যবসা করার কথা ভাবেনি অথবা আমাকে ভালো কাজ দেয়নি। যখন আমার কথা কারো মনে হয়েছে, তখনই তারা মনে করেছেÑ নাহ, লোকটার সাথে কাজ করা যাবে না, সে খুব স্বার্থপর। এভাবে নিজের অলক্ষ্যে আমি কত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি!
আমাদের চারপাশে এমন লোক আছে, যাদের ব্যাপারে আমরা ধারণা করেছি লোকটা চালাক আছে। জীবনে কিছু একটা করতে পারবে। বাস্তবে সে কিছুই করতে পারেনি। আর, ‘লোকটা কী করে খাবে’? এমনটা যার সম্পর্কে ভেবেছি, তিনি একজন সহজ-সরল মানুষ হয়েও ভালো আছেন। এর কারণ, ওই যে, যে ব্যক্তি অতিমাত্রায় চালাক, তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। আর যে লোকটি সহজ-সরল ও সৎ ছিল, তাকে বিশ্বাস করেছে এবং সুযোগ দিয়েছে। তবে খেলায়, পরীক্ষায় কিংবা ব্যবসায় গঠনমূলক প্রতিযোগিতা হতে পারে অবশ্যই।
বেশি পড়লে বেশি ভালো
কিছু অভিভাবক এই ধারণায় বিশ্বাস করেন। ফলে তারা তাদের সন্তানকে সারাদিন বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। একসময় দেখা যায়, সে হয়তো ভালো ফলাফলও করে; কিন্তু কর্মজীবনে সে ভালো করছে না।
কারণ, সে তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নেতৃত্ব দিতে পারে না। সে জানে না, কীভাবে সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়, কীভাবে ঝুঁকি নিতে হয়। ফলে সে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে।
তারপর কখনো আফসোস করে, কখনো ব্যঙ্গ করে। ‘আমি নিজে ফাস্ট বেঞ্চে বসেছিলাম আর এখন বাসে ঝুলে অফিসে যাই। যার অফিসে চাকরি করি তিনি তার ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের ছাত্র। তার বাপের চালের আড়ত ছিল’। আমরা ভুলেই গেছি, সেই লাস্ট বেঞ্চের ছাত্রই চালের আড়তে বসে ঠিকই জীবনের অনেক কিছু শেখতে পেরেছিল।
যেটা ফাস্ট বেঞ্চ আর টিউশন টিচারের জন্য আমার সে-সব শেখার সময়ই হয়নি। আসুন, আমরা ভুলের বৃত্ত ভেঙে জেগে উঠি নতুন দিনের উচ্ছ¡াসে। অবশ্য যিনি ঠিক করেছেন একটা যেনতেন চাকরি করেই জীবনটা পার করে দেবেন তার জন্য হয়তো কিছুটা ঠিকই আছে, তবে পুরোটা নয়। কারণ, চাকরি মানেই যে শুধু হুকুম তামিল করা তা নয়। যতটুকু কাজ করতে হয় সেটা কিন্তু দায়-দায়িত্ব নিয়েই করতে হয়।

