ডিজিটাল যুগের প্রযুক্তিকে জানতে হবে।

এসক্রো কি ও কেন?

এসক্রো কি ও কেন?

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

এসক্রো সেবা কী?

এসক্রো (Escrow) হলো একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরাপদ লেনদেন সেবা, যা ক্রেতা এবং বিক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতা করে। অনলাইনে পণ্য কেনার সময়, ক্রেতার অর্থটি এসক্রো সিস্টেমের মাধ্যমে আটকে রাখা হয়। পণ্য ডেলিভারির পর ক্রেতা সন্তুষ্ট হলে অর্থটি বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি ক্রেতার জন্য একটি নিরাপত্তার গ্যারান্টি, যা প্রতারণার ঝুঁকি হ্রাস করে।

এসক্রো কি শুধুই ই-কমার্সের জন্য?

মূলত হ্যাঁ, এসক্রো সেবা অনলাইন লেনদেনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি ক্রেতাকে সুরক্ষা প্রদান করে যদি বিক্রেতা নির্ধারিত মানের পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। তাই, এটি ই-কমার্স লেনদেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।

এসক্রো সেবা কি শুধুই বাংলাদেশে আছে?

এসক্রো সেবা কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। অ্যামাজন, আলীবাবার মতো বিশ্বখ্যাত অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসক্রো ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব মার্কেটপ্লেসে, বিক্রেতারা সরাসরি অর্থ পান না; প্রথমে অর্থটি এসক্রোতে জমা থাকে। তবে বাংলাদেশে শুধুমাত্র ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোই অর্থ জমা রাখার অনুমতি পায়। তাই পেমেন্ট গেটওয়ে বা অন্যান্য এসক্রো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিচালনা করে।

এসক্রো ব্যবস্থার সুবিধা কার জন্য বেশি?

এসক্রো ব্যবস্থায় ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই উপকৃত হয়, তবে ক্রেতার নিরাপত্তা বেশি জোর দেওয়া হয়। এটি ক্রেতাকে নিশ্চিত করে যে, পণ্য সঠিকভাবে পাওয়া গেলে তবেই বিক্রেতা অর্থ পাবে। যদিও কিছু বিক্রেতার জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে, বিশেষত যারা অগ্রিম অর্থ ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান।

বাংলাদেশে এসক্রো সেবা কবে থেকে চালু হয়েছে?

বাংলাদেশে এসক্রো ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে ২০২০ সালে ই-ক্যাবের ডিজিটাল হাটে চালু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে, ম্যানুয়েল বা হাতে হাতে এসক্রো সেবা প্রদান করা হয়। এতে প্রায় ৫২ জন ক্রেতা এই সুবিধা গ্রহণ করেন। এরপর ২০২১ সালে, বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েগুলোতে এসক্রো পদ্ধতি চালুর জন্য একটি সার্কুলার জারি করে। ফলে পেমেন্ট গেটওয়েগুলো গ্রাহকের অর্থ ধরে রাখার নিয়ম প্রবর্তন করে।

এসক্রো সেবা কি ম্যানুয়েল নাকি স্বয়ংক্রিয়?

আদর্শ এসক্রো সেবা ১০০% স্বয়ংক্রিয় হওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশে ২০২১ সাল থেকে এটি ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যা বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করছে। অটোমেশন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ফোনের মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ।

এসক্রো কিভাবে কাজ করে?

ক্রেতা যখন কোনো পণ্যের পেমেন্ট করেন, তখন অর্থটি এসক্রোতে জমা হয়। ক্রেতা পণ্য পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তুষ্ট হলে, এসক্রো সিস্টেম থেকে অর্থটি বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, ক্রেতার অভিযোগ না থাকলে ৩ থেকে ২১ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ছাড় করা হয়।

বাংলাদেশে এসক্রো সেবা ভাল না খারাপ?

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে গ্রাহকের টাকা নিয়ে প্রতারণার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে এসক্রো সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং ক্রেতার অধিকার সুরক্ষিত করে।

বর্তমানে কেন গ্রাহকের টাকা এসক্রোতে আটকে থাকে?

গ্রাহকের অর্থ আটকে থাকার বেশ কয়েকটি কারণ হতে পারে:

  1. পেমেন্ট গেটওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের একাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে।
  2. ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে, আদালত বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অর্থ আটকে রাখা হয়।
  3. ক্রেতার কাছ থেকে সন্তুষ্টির বার্তা না পাওয়া গেলে অর্থ আটকে থাকতে পারে।

এই সমস্যার সমাধান কী?

বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বয়ংক্রিয় এসক্রো সেবা চালুর জন্য কাজ করছে। এটি চালু হলে, পণ্য ডেলিভারির পর অটোমেটিকভাবে অর্থ ছাড় করা হবে। এর ফলে ফোন বা ম্যানুয়েল প্রসেসের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।

স্বয়ংক্রিয় এসক্রো সেবা না থাকলে কী করা যেতে পারে?

কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান:

  1. ১০ হাজার টাকার উপরে লেনদেনের ক্ষেত্রে এসক্রো বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
  2. লেনদেনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ অর্থ আটকে রাখা যেতে পারে, বাকিটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাড় করা যেতে পারে।
  3. ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতিতে এসক্রো সেবা অপশনাল রাখা যেতে পারে।

এসক্রো চালু হলেও কি সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে?

সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না, তবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা প্রয়োগে সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। যেমন, ডেলিভারির নিশ্চয়তা কে দেবে, বা ক্রেতা পণ্য পেয়ে অভিযোগ করলে কী হবে, এ বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন।

উপসংহার

এসক্রো সেবা বাংলাদেশে একটি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবা। বাংলাদেশ ব্যাংক এর স্বয়ংক্রিয়করণে কাজ করছে, যা সম্পন্ন হলে গ্রাহক এবং বিক্রেতা উভয়ের জন্য লেনদেন নিরাপদ এবং সহজ হবে। এসক্রো ব্যবস্থার প্রসার ই-কমার্স খাতে আস্থা বাড়াবে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

আশা করি, এই আলোচনা থেকে এসক্রো সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply