মেয়েশিশু
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে গাছের পাতা থেকে ঝুরে পড়ে ফুলশিশু

বড় গল্প: আমার রাতজাগা পাখি, পর্ব : ৩

আমার রাতজাগা পাখি

পর্ব: ৩ (বড় গল্প)

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

(চলমান গল্প)

কষ্টমাখা বুকে কষ্ট যেন জোরো চেপে ধরে। স্কুলে গেলাম মেয়েটাকে দেখতে। মেয়ে নাকি দেখা করবেনা। আর বাচ্চা দেখা করতে না চাইলে স্কুল থেকে এলাও করা হয়না। অদ্ভুৎ? মেয়ে কেন এমনটা করবে বুঝতে পারছিনা। পরে শুনলাম, মেয়ের মা স্কুল অথরিটিকে বলে দিয়েছে আমি আসলে এই কথা বলে দেয়ার জন্য। বুকটা ভেঙ্গ হু হু করে উঠলো। ছুটির পর মেয়েটাকে দূর থেকে দেখে ফিরে এলাম।

আইনজীবিদের সাথে কথা বললাম। তারা বলল আইনত মেয়ে মার কাছেই থাকবে। কোনো রাস্তা না পেয়ে সরাসরি বাসায় চলে গেলাম। আমার কলিজার টুকরা যেখানে সেখানে আমার মান ইজ্জতের ভয় করে কি লাভ?

ঘরে কেউ দরজাই খুললনা। অগত্যা বাইরে বসে রইলাম। শেষে আমার শাশুড়ি ফোন করে পাড়ার ছিচকে মাস্তানদের ঢেকে আনলেন। বিশ বাইশ বছরের ছেলেপেলে। বললাম দেখ ভাই, আমি কারো খেতে আসিনি, পরতেও আসিনি। আমি আমার মেয়েটাকে দেখতে এসেছি। ওরা কোনো কথা শুনলনা কলারটা টেনে দিলো, দুইবার ধাক্কাও দিলো কালোমত ছিকন একটা ছেলে। আমি হাতটা ঘোরালো হয়তো পড়ে গিয়ে উঠতেও পারবেনা। কিন্তু হাত ঘোরানো হলো না। তারা দলীয় পোলাপান।

জানিনা কোন পাপের এমন প্রায়শ্চিত্ত হয়। এর মধ্যে এসবের একটা বিহিত করা দরকার। তাই তাদের আত্মীয় স্বজন এর কছে ধর্ণা দিলাম। মামাশ্বশুর, খালা শাশিুড়ি, ফুফাতো শালা সবার কাছে গেলাম। কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি হলো না। পরামর্শ দিলো, সমবেদনা জানালো, আমার শাশুড়ি আর তার মেয়েদের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলল। না জেনে বিয়ে করাটা আমার ঠিক হয়নি। সেটা মনে করিয়ে দিলো। হায়রে এখনতো আমার সেকথা ভাবার সময় নেই।

এভাবে মাস দুয়েক চলে গেল। এর মধ্যে একদিন উকিল নোটিশ পেলাম। আমার নামে। আমি নারী নির্যাতনকারী, যৌতুকের জন্য স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছি। স্ত্রীর বাড়ী গিয়ে স্ত্রী, স্ত্রীর মা বোন সবাইকে মেরেছি। আসার সময় বিশভরি গয়না, ২ লাখ টাকা নিয়ে এসেছি। পাড়া প্রতিবেশী অনেকে স্বাক্ষী আছে। আমাকে আদালতে গিয়ে হাজির হতে হবে।

আর এটাই বাকী ছিলো। ভাবলাম ভালোই হলো আদালতে গেলে একটা ফায়সালা হয়ে সমাধা হয়ে যেতে পারে। তবে তাই হোক।

কোর্টে গেলাম। তিনমাস হলো চাকরী ছেড়ে দিয়েছি। হাতে তেমন টাকা পয়সা নেই যে উকিল নিয়োগ করবো। মনে করলাম। আমার কথা আমিই বলবো। তবুও একজন সরকারী উকিল দাঁড়ালেন। কোটে আমি অভিযোগ অস্বীকার করলাম। গত ৩ মাস মেয়ের ভরনপোষন দিতে পারিনি সেটা স্বীকার করলমা। কোট আমার জামিন না মঞ্জুর করে আমাকে হাজতে পুরার নির্দেশ দিলেন। আমার স্ত্রী কোটে দাড়িয়ে আমার সাথে ডিভোর্স চাইলেন। এটাও আশংকা জানালেন। আমি মুক্ত থাকলে তার জীবন নিরাপদ নয়। আমি তাকে হত্যা করতে পারি। তাছাড়া আমি দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করার ভয়ে পালিয়েও যেতে পারি।

একমাস পর কোর্টে আরেকটা ডেট হলো। এই ডেটে বেল ক্যানসেল হলো। জেলে পুরে দেয়া হলো আমাকে। এই একমাস আমি মা বাবা কাউকে বলিনি মামলার ব্যাপারে। জেলে যাওয়ার পর মা বাবার কাছে লোকমারফত খবর দিলাম যেন টেনশন না করে। বাবা বয়স্ক মানুষ ডায়বেটিক, পেশার আর কমদেখা চোখ নিয়ে আমাকে ছাড়াতে দৌড়ঝাপ শুরু করে দিলেন। একমাসের মাথায় ডেট দিয়ে আমার জামিনের চেষ্টা করলেন। জামিন হয়নি। একটা কাজ হয়েছে ডিভোর্সটা ফাইনাল হয়ে গেছে। আমার মেয়েটা ভীষন শুকিয়ে গেছে আর শুধু ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছিলো। চিৎকার করে বললাম। আমার মেয়েকে আমার কাছে দিয়ে দিন। আর আপনারা সে সিদ্ধান্ত নেবেন আমি মেনে নেব। শুধু আমার মেয়েকে আমাকে দিয়ে দিন। সব দেখে বাবা হতাশ হয়ে গেলেন। আমার বৃদ্ধ মা আদালতে শত মানুষের সামনে আমাকে জড়িয়ে কেঁদে উঠলেন।

কয়েকমাস চলে গেল। বাবা তার সম্পত্তি থেকে কিছু অংশ বিক্রি করে স্ত্রীর পাওনা পরিশোধ করার ব্যবস্থা করলেন। উকিল দিয়ে আলোচনা চালালেন যাতে নারী নির্যাতনের মামলাটা তারা তুলে নেয়। জেলে বসে খবর পাচ্ছিলাম। ক’দিন পর পর মা আসেন বাবার সাথে তখন শুনতে পাই। কিছু বলি না। কি বলবো বুঝতে পারি না। এতদিন ধরে স্ত্রীর ইচ্চাপূরনের দিকে নজর দিতে দিতে মা বাবার কথা শুনতে পাইনি। কি করবো বুঝতে পারছিনা। মেয়ের জন্য গোপনে কিছু ডিপোজিট করেছি। সেটাতে হাত দিতে ইচ্ছে করছেনা। ভাবছি জেল থেকে বের হয়ে আবার একটা চাকরী ধরে নিলে ওখান থেকে মাসে মাসে বাবাকে কিছু টাকা দিলে বাবা হয়তো আবার তার জমি কিনে নিতে পারবেন। মনে মনে তাই সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছু টাকা মেয়ের জন্যও দেব।

পরের তারিখে সমঝোতা হয়ে গেল। পাওনা পরিশোধ। তিনি অভিযোগ তুলে নিলেন। আশা করি জামিনও হবে। কিন্তু কেন জানি জামিন আরো এক তারিখ পিছিয়ে গেল। তবুও মুক্তির জন্য স্বস্তি পেলাম। কিন্তু আমার কলিজার টুকরাকে দেখবো কিভাবে সে ভাবনায় দিনরাত এক হয়ে গেলো। অনেক কষ্টে পনেরটা দিন পার হলো। জেল থেকে বের হলাম যেদিন। সেদিনই মেয়ের স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো ২ সপ্তাহের ছুটি। বাবা পাশে দাড়ালেন। স্বান্তনা দিলেন। বাসায় গিয়ে কয়টাদিন বিশ্রাম নিতে বললেন।

আমার আর বিশ্রাম নেয়া হয়না। একদিকে চাকরীর জন্য লোকজনের কাছে ধর্ণা। অন্যদিকে মেয়ের জন্য উতলা। তবুও দুটি সপ্তাহ অপেক্ষা করে রইলাম। স্কুল খোলার জন্য।

আজ স্কুল খোলা। ৮টায় মেয়ের ক্লাস। ৭টা থেকে স্কুলের সামনে দাড়িয়ে। সাড়ে সাতটা। আটটা। সোয়া আটটা। সাড়ে আটটা এমনকি নয়টা বেজে গেল। মেয়েটা এলো না। স্কুলে গিয়ে জানলাম। মেয়ের মা স্কুল বদলিয়ে মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। অনেক কষ্টে সে স্কুলের নাম জানা হলো। আরো ২ কিলোমিটার দুরে সে স্কুলে গিয়ে শুনি মেয়ে স্কুলে আসেনি। আমার মেয়ের নাকি খুব অসুস্থ্য।

স্কুলের মিসরা খুব বাজেভাবে আমার দিকে তাকালো। মেয়ের বাবা হয়ে মেয়ের অসুস্থতার খবর জানি না। নিশ্চয় খুব খারাপ একজন বাবা আমি। তাদের চোখের ভাষা আর তাচ্ছিল্যের কাছে নিজেকে হার মানিয়ে সোজা চলে গেলাম শ্বশুর বাড়ি, সাবেক শ্বশুর বাড়ি।

না কেউ আটকায়নি। কেউ মারতেও আসেনি। বাসায় যে কেউ নেই। মেয়ের মা তার বন্ধুর সাথে শপিংএ বেরিয়েছেন, মেয়ের নানি গিয়েছেন তার আত্মীয়বাড়ী। কাজের মেয়ে আছে। জ্বরে মেয়ের সমস্ত গা পুড়ে যাচ্ছে। মাথার কাছে মামুলি কয়েকটা ঔষধ। মামনি আমার বিড় বিড় করে কি যেন বলছে। আমি গিয়ে ঝাপটে বুকে নিলাম আমার সাত রাজার ধনকে। গায়ের গরমে মনে হলো আমার গা পুড়ে যাবে। কোনোদিকে তাকানোর সুযোগ হয়নি। আমার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোজা হাসপাতালে। মেয়েকে ভর্তি করলাম। কিছু বন্ধু বান্ধবকে ফোন দিলাম। কারো কাছ থেকে পাওনা টাকা নিলাম। কারো কাছে ধার করলাম। কিছু টেস্ট দিলে ডাক্তার সেগুলো নিয়ে দৌড়াতে থাকলাম। বাড়ি থেকে মা বাবাও এসে পড়েছে। মেয়ে ঠিক সেভাবে কথা বলতে পারছেনা। তবে বুঝতে পারছে ঘটনা কি ঘটছে।

হাসপাতালে এসে দেখি। মেয়ের মা পাশে বসে কাঁদছে। আমি কিছু বলতে যাইনি। অনেক্ষণ হলো তিনি আছেন। রাত হয়ে গেছে। রাত ১০টার দিকে আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে দেখি। মেয়ের নানী এসে হাজির। আমার মা বাইরেই আমাকে এই খবর দিলো। কিন্তু খবর না দিলেও আমি বুঝতে পারতাম কারণ তখন মা মেয়ের ঝগড়া হচ্ছিলো।

প্রতিটি শব্দ বোঝা যায়না। তবে এইটুকু বোঝা যায় যে, মেয়ের প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে। মেয়ের মা বলছিলো সে আগেই বলেছে মেয়েকে হাসপাতালে আনতে আর মেয়ের নানী বলছিলো লাগবেনা। আমার স্ত্রীকে সরি সাবেক স্ত্রীকে আমি এই প্রথম দেখলাম মায়ের সাথে বিদ্রোহ করতে। এক পর্যায়ে হাসপাতালের নার্সরা এসে বাঁধা দিলো কারণ হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমি অবশ্য তাদের মা মেয়ের আলাপে বাগড়া দিতে চাইনি।

আমার সাবেক শাশুড়ি রাগে ক্ষোভে একাই চলে গেলেন। তার মেয়ে গেলনা। তার রাগের কারণ পাঠকদের জানা উচিত। আগামী কাল তার কন্যার বিবাহ। আজ গায়ে হলুদ।

মেয়ের বাবা যখন এসেছে। মায়ের কি দরকার? তার এখন ঘরে ফেরা উচিত। আসলে তিনি চেয়েছিলেন বিয়েটা হয়ে গেলে মেয়েকে হাসপাতালে আনতে যেহেতু তারিখ আগে থেকে ঠিক করা ছিলো। আর এই মুহুর্তে বিয়ে পেছানোর সম্ভব নয় কারণ সব আয়োজন হয়ে গেছে। দাওয়াত বাজার করা সব। এমনকি ছেলে বিয়ের এক সপ্তাহ পরই বিদেশে চলে যাবেন। তিনমাস পর তিনি এসে তার স্ত্রীকেও নিয়ে যাবেন। স্ত্রীর সাথে একটা কন্যা আছে। এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত কি তা তাদের কথাবার্তায় বের হয়ে আসেনি বলে জানা হলো না।

চলবে….

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply