মানচিত্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে: তেঁতুলিয়া-টেকনাফ পদযাত্রা নির্দেশিকা
পায়ে হেঁটে দেশ ভ্রমণের এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে সফল করতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, মানসিক প্রস্তুতি এবং কারিগরি জ্ঞান। নিচে এই ভ্রমণের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি
এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা। প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ কিলোমিটার হাঁটার জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে যাত্রার অন্তত এক মাস আগে থেকে নিয়মিত ৫-১০ কিলোমিটার হাঁটার অভ্যাস করা জরুরি। এছাড়া দীর্ঘ সময় একটানা হাঁটার ফলে পায়ে ফোসকা পড়া বা পেশিতে টানের মতো সমস্যা মোকাবিলায় প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
সঠিক সরঞ্জামের গুরুত্ব
পায়ে হাঁটা ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হলো একজোড়া আরামদায়ক ‘রানিং’ বা ‘ওয়াকিং’ শু। নতুন জুতো পরে যাত্রা শুরু না করে কয়েকদিন পুরনো ও পায়ের সাথে মানিয়ে যাওয়া জুতো ব্যবহার করা ভালো। ব্যাকপ্যাকের ওজন যেন শরীরের ওজনের ১০-১৫ শতাংশের বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাগে হালকা ও দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন পোশাক (ড্রাই-ফিট), রেইনকোট, একটি ছোট ফার্স্ট এইড বক্স এবং পাওয়ার ব্যাংক রাখা জরুরি।
রুট পরিকল্পনা ও আবহাওয়া
সাধারণত পদযাত্রীরা দুটি রুট বেছে নেন। একটি মহাসড়ক ধরে এবং অন্যটি বিকল্প মেঠোপথ দিয়ে। মহাসড়ক দিয়ে হাঁটলে নিরাপত্তা ও থাকার সুবিধা বেশি পাওয়া যায়, তবে মেঠোপথ দিয়ে হাঁটলে বাংলার প্রকৃত রূপ দেখা সম্ভব। ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এই সময়ে রোদের তীব্রতা কম থাকে এবং আবহাওয়া মনোরম হয়।
পুষ্টি ও বিশ্রাম
দীর্ঘ হাঁটার ফলে শরীর থেকে প্রচুর লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। তাই সাথে সবসময় খাবার পানি এবং ওরস্যালাইন বা গ্লুকোজ রাখা বাধ্যতামূলক। শর্করা ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার (যেমন—কলা, ডিম, খেজুর, বাদাম) শরীরে শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া পরবর্তী দিনের হাঁটার গতি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সামাজিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা
একা হাঁটার চেয়ে অন্তত দুই বা তিনজনের দলে হাঁটা নিরাপদ। স্থানীয় মানুষের সাথে নম্র আচরণ করা এবং রাতের বেলা অপরিচিত জায়গায় একা না থাকা ভালো। সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং জরুরি কন্টাক্ট নম্বর রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রমাণক স্মৃতি কথা
যারা ভ্রমণের প্রমাণ রাখতে চান। তারা নানা উপায় ব্যবহার করতে পারেন। জাহাঙ্গীর আলম শোভন ৪টি উপায় ব্যবহার করেছেন। একটি ট্রাকার সেবা নিয়ে তাদের সিস্টেমে তার সমস্ত তথ্য রেখেছেন। তিনি প্রতি ১ কিলোমিটারে অন্তত ৩টি করে ছুবি তুলেছেন। যেসব জায়গায় খাওয়া দাওয়া করেছেন সবার কাছ থেকে বিল নিয়েছেন। অন্যদিকে অন্যান্য ভ্রমণকারী ডায়রী স্থানীয় মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে থাকেন।
ভ্রমণকারীদের মধ্যে ৩ জনের বই পাওয়া যায়। মো ওসমান গতি যিনি পাকিস্তান আমলে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণে ২২ দেশ ২১ হাজার মাইল তথা ৩০ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরের বাসিন্দা। তার বইয়ের নাম: মো ওসমান গনির পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ, জাহাঙ্গীর আলম সম্পাদিত।
এছাড়া ২টি বই লিখেছেন জাহাঙ্গীর আলম শোভন তার পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণ নিয়ে। একটি দেখবো বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ অন্যটি পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।
সর্বশেষ বইটি লিখেছেন, ডা. বাবর আলী তার পায়ে হেঁটে ৫৪ জেলা ভ্রমণ নিয়ে।
সাফল্যের পদচিহ্ন: যারা পাড়ি দিয়েছেন এই দীর্ঘ পথ
বাংলাদেশের এই ‘ক্রস-কান্ট্রি’ পদযাত্রার ইতিহাসে বেশ কিছু নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। জাহাঙ্গীর আলম শোভন ২০১৬ সালে পর্যটন ও উদ্যোক্তা বিকাশের লক্ষ্যে ৪৬ দিনে এই পথ পাড়ি দেন, যা ভ্রমণ সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মুসাফির মিজান মাত্র ১৯ দিনে এই পথ পাড়ি দিয়ে গতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ডা. বাবর আলী সুস্থতার বার্তা নিয়ে এবং নাসিম তালুকদার মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়তে এই দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন।
মোহাম্মদ সামসুজ্জামান আরাফাত দৌড়ে এই পথ পাড়ি দিয়ে রেকর্ড গড়েন এবং তহুরা সুলতানা রেখা প্রথম নারী হিসেবে এই অসাধ্য সাধন করে নারীদের জন্য নতুন পথ উন্মোচন করেন।
এছাড়া সবুজ কুমার বর্মন প্রবাল ছুটির দিনগুলোতে হাঁটার মাধ্যমে ১৭ দিনে (খণ্ডকালীন) এই পথ জয় করে প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা থাকলে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝেও লক্ষ্য ছোঁয়া সম্ভব।
ছবি: পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণকারী ওসমান গনির মূল অস্পষ্ঠ ছবি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিশীলিত ছবি।

