শিকড়ের টানে: সুলিভান ব্রাদার্সদের অবিশ্বাস্য যাত্রা
আজকের বাংলাদেশ ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রে দুটি নাম—রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান। তবে এই গল্পটা শুধু দুই ভাইয়ের নয়; এটি একটি পরিবারের, একটি শিকড়ের, আর এক অদ্ভুত সংযোগের গল্প—যেখানে রাজবাড়ী থেকে ফিলাডেলফিয়া, আর সেখান থেকে আবার ফিরে আসা লাল-সবুজের পতাকার নিচে।
এই গল্পের শুরুটা কিন্তু একেবারেই হঠাৎ নয়। কয়েক বছর আগে প্রথমবার সুলিভান পরিবারের খোঁজ পান বাংলাদেশের এক নীরব কর্মী—তোফাজ্জল হোসেন তানভীর। বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করার কাজে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তিনিই প্রথম বড় ভাই কুইন সুলিভানকে খুঁজে বের করে বাংলাদেশের ফুটবল কমিউনিটিতে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সূত্র ধরেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় পুরো সুলিভান পরিবারের গল্প।
চার ভাই—কুইন, কাভান, রোনান ও ডেকলান। সবাই ফুটবলার। সবাই একই একাডেমি থেকে উঠে আসা। কিন্তু তাদের গল্পকে আলাদা করে তোলে একটি বিষয়—তাদের শিকড়।
তাদের নানি, সুলতানা আলম—একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসেই তিনি পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী জাহাজ অবরোধ আন্দোলনে অংশ নেন, বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা, জাতিসংঘে কাজ, আর দীর্ঘ প্রবাস জীবন—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কিন্তু জীবনের শেষভাগে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন নিজের মাটিতে—বাংলাদেশে।
এই এক নারীর মাধ্যমেই চার ভাইয়ের শিরায় প্রবাহিত হয়েছে বাংলাদেশের রক্ত।
সুলতানা আলমের মেয়ে হেইকে, নিজেও একজন ফুটবলার। তিনি বিয়ে করেন ব্রেন্ডান সুলিভানকে, যিনি অস্ট্রেলিয়ার এ-লিগে পেশাদার ফুটবল খেলেছেন। ফলে ফুটবল যেন এই পরিবারের রক্তেই মিশে গেছে।
বড় ভাই কুইন সুলিভান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট কাভান সুলিভান বিশ্ব ফুটবলের এক বিস্ময়—অল্প বয়সেই পেশাদার ফুটবলে অভিষেক, বড় ক্লাবের নজরে আসা, ভবিষ্যতের সুপারস্টার হওয়ার সম্ভাবনা।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আবেগের নাম—রোনান ও ডেকলান।
২০২৫ সালে প্রথমবার যোগাযোগ হয় তাদের সঙ্গে। “Save Bangladesh Football” নামের একটি সাপোর্টার্স গ্রুপ এই সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—জন্মসনদ যাচাই, পাসপোর্ট, দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা—সবকিছু পেরিয়ে অবশেষে তারা বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পায়।
শুরুটা সহজ ছিল না। বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড় হিসেবে নানা বাধা, অবমূল্যায়ন, এমনকি দলীয় রাজনীতির ছায়াও তাদের স্পর্শ করে। কিন্তু মাঠে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে।
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ—এই টুর্নামেন্টেই যেন তাদের গল্পের প্রথম বড় অধ্যায় লেখা হয়।
রোনানের আত্মবিশ্বাসী খেলা, ফাইনালে তার পানেনকা পেনাল্টি—সবাইকে মুগ্ধ করে।
ডেকলানের স্থিরতা, তার পরিশ্রম—দলের ভেতরে তার গুরুত্ব স্পষ্ট করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত—
তারা এল, দেখল, জয় করল।
একটি মজার ঘটনা এই গল্পকে আরও রঙিন করে। ফিলাডেলফিয়ার একটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে বসে একদিন কুইন সুলিভান বলেছিলেন—“আমার নানীর বাড়িও ঢাকায়।” সেই ছোট্ট কথোপকথন থেকেই শুরু হয় এক বড় যাত্রা—যার শেষমেশ প্রতিধ্বনি শোনা যায় স্টেডিয়ামে, বাংলাদেশের পতাকার নিচে।
সূত্র: পত্র-পত্রিকা, ছবি: জেমিনি

