পাহাড় নদী সাগর বনের পাশে চট্টগ্রাম একটি অনন্য নগরী
বাংলাদেশের বানিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। সাগর নদী পাহাড় বন এই চার প্রাকৃতিক নির্দশণ যুক্ত বাংলাদেশের একমাত্র শহর। শুধু তাই নয় এখানকার প্রাকৃতিক বৈচিত্রের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের জীবন জিবিকার নানা বৈচিত্রময় দিক। আসুন আপাতত জেনে নেয় যাক দেখার মতো কি আছে চট্টগ্রামে। আমি কোনো কোনো ভাবে বছরে ১/২বর চট্টগ্রাম যাই। কিভাবে কিভাবে যেন আমার যাওয়া হয়ে যায়। চট্টগ্রাম নিয়ে এই লেখাটা আমার অনেক পুরনো তবুও আজ শেয়ার করছি- জাহাঙ্গীর আলম শোভন
মহামায়া ইকো পার্ক:
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে যাওয়ার পথে মিরশ্বরাই উপজেলার অবস্থিত মহামায়া ইকোপার্ক হলো প্রথম পর্যটন স্থান। এখানে রয়েছে অনিন্দ সুন্দর লেক। নেপালের পোখরায় যারা গিয়েছেন তাদের মনে পড়ে যাবে পোখরার কথা। রয়েছে নানা রঙের বোট গুলো যেগুলো তীরে রাখা থাকে ভ্রমনপিয়াসীদের অপেক্ষায়।
১০০০ টাকার বোট দামদর করে ৬০০ টাকা দিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন লেকে। মোট ৩ টি লেক এ আপনাকে নিয়ে যাবে, এর মাঝে একটি লেক অনেক দুর। যেখানের কথা আপনাকে নাও বলতে পারে। সেখানে ২ পাশে সরু জায়গায় মাঝখানে পাহাড়ের দেয়াল এর মাঝে দিয়ে যেতে হবে – নৌ- সুড়ঙ্গ পথ বলা চলে। যেতে যেতে অনেক বানর, হরিন ইত্যাদি প্রানি চোখে পড়বে ভাগ্য প্রসন্ন হলে। একটু ভেতরে গেলে পাবেন ঝর্না । এটাও খুব সুন্দর।
সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও মন্দির:
চট্টগ্রামের 50 কিলোমিটার আগেই সীতাকুণ্ড। বাসে বা ট্রেনে বসেই দেখতে পাবেন ইকোপার্কেকের গেট ও সুন্দর সুন্দর পাহাড়। 2001 সালে সরকার এটাকে বাংলাদেশের প্রথম ইকো পার্ক হিসেবে ঘোষনা করে। এখানে রয়েছে তিনটি ঝর্ণণা এরমধ্যে সহস্রধারা ঝর্নাটি এখনো প্রবাহমান। ৪৮৪টি সিড়ি বেয়ে এটিতে নামতে হয়। এখানে নানারকম উদ্ভিদ এর পাশাপাশি রয়েছে কিছু বন্যপ্রানীও। বিদ্রোহী করি কাজী নজরুল ইসলামের স্মুতি বিজড়িত এই স্থান।৯৯৬ একরের এ উঁচু-নিচু পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এবং নানা ধরনের পশুপাখি। এখানে দিনের বেলায় অবসর নেয়ার ব্যবস্থা আছে রাতে থাকার কোনো সুবিধা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে যারা ঘরতে যান তারা পানির বোতল খাবারের উছ্ছিস্ট ফেলে এই সুন্দর স্থানটিকে নোংরা করে রাখছেন।
রামায়ণে বর্ণিত কাহিনীর অন্যতম পটভূমি সীতাকুণ্ড। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ স্থান কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে রয়েছে একটি বৌদ্ধমন্দির। বৌদ্ধমন্দিরে গৌতম বৌদ্ধের পায়ের ছাপ রয়েছে। চন্দ্রনাথ মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ সব মানুষের পছন্দের জায়গা। বনসম্পদকে ঘিরে এখানে নানারকম চোরাই কারবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইকোপার্ক হওয়ার পরও এগুলো বন্ধ হয়নি।
কৈবল্যধাম :
পাহাড়তলী এলাকাটিই সুন্দর। পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে উঠেছে আজকের শহর। চট্টগ্রাম শহরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে পুরনো ও বিশাল তীর্থস্থান হচ্ছে কৈবল্যধাম। এটি পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত। প্রতি বছর হাজারো দর্শনাথী এখানে ভিড় জসায়।
ফয়স লেক :
বন্দরনগরীর অন্যতম আকর্ষণ ফয়’স লেক। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে রেলকর্মীদের পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এলাকাটি। স্থাপিত হয়েছে ১৯২৭ সালে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম দেখারমতো স্থান।
বর্তমানে একটি বেসরকারী কোম্পানীকে লিজ দেয়ার পর এখানে নানারকম রাইড ও বিনোদন আয়োজন সংযুক্ত হয়েছে। এর ভেতরে থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে অবকাশ যাপনের যাবতীয় উপাদান। ফলে এর প্রবেশ ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেসরকারী কোম্পানী এতে নানা স্থাপনা নির্মাণ করলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা কিংবা বেশী করে গাছ লাগানো বা বোটানিক্যাল গাডেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিা করার কোনো চেষ্টাই করেনি বা করছেনা। ফলে পরিবেশবাদীগণ বরাবরই এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে।
রানী রাসমণি বিচ :
চট্টগ্রাম শহরকে ঘিরে গড়ে ওঠা তিনচি বিচের একটি রানী রাসমনি বিচ। বেশীরভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষজনই এখানে অবকাশযাপন করতে আসে। এর খ্যাতি এখনো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েনি।যদিও এটি সমুদ্র পারে নয় মূলত কর্ণফুলী নদীর তীরে এটি। এছাড়া এখানে রয়েছে সুন্দর একটি ঝাউবন যা এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে।
জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর :
এশিয়া মহাদেশের দুটি জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের একটি অবস্থিত চট্টগ্রামে।মহাদেশের বিভিন্ন জাতির জীবনযাত্রা ও তাদের ব্যবহার্য সামিগ্রী নিয়ে এই জাদুঘর। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এটা ভ্রমন করা খুব জরুরী। এটি নগরীর আগ্রাবাদে অনেক ুকছু রয়েছে এখানে। এতে সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, নানা কৃষ্টি-আচার। আরও রয়েছে ভিনদেশী সংস্কৃতির কিছু নমুনা। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ভ্রমন খুব প্রয়োজণীয় এখানে অনেক কিছুই দেখে দেখে শেখা যায়।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত :
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পরেই এই সৈকতের অবস্থান। এটি শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছার আগে চোখে পড়বে আনুমানিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার দুই পাশে ঝাউগাছের সারি। এখানে আছে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমী, তেল শোধনাগার ও সামনে এগুলো আন্তজাতিক বিমানবন্দর। এখানে সারাবছর পর্যটকদের ভীড় থাকে। এখানে রয়েছে ভ্রমনের সব আয়োজন।
বাটালি পাহাড় :
টাইগার পাস এবং লালখান বাজারের মাঝামাঝি অবস্থান বাটালি পাহাড়ের বা জিলাপী পাহাড়। বোদ্ধা ব্যক্তিরা বলে থাকেন, চট্টগ্রামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ বাটালি পাহাড়ে উঠতে হবে। জিলাপীর মতো প্যাচানো রাস্তা দিয়ে এই পাগাড়ে উঠতে হয়। অনেকে গাড়ী নিয়ে এখানে উঠতে পছন্দ করেন। পাহাড়ের উটরে রয়েছে সরকারী দপ্তর। বাটালি পাহাড়ে রয়েছে হরেক রকম গাছপালা। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য পাহাড় কেটে সুবিন্যস্তভাবে তৈরি করা সিঁড়ি। বাটালি পাহাড় থেকে পুরো চট্টগ্রাম দেখা যায়।চট্টগ্রাম শহরকে মনে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক নিখুত ক্যানভাসচিত্র।
শহীদ জিয়া জাদুঘর :
এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকে একটি শিশুপার্ক। তার ডানদিকে শহীদ জিয়া জাদুঘর। সার্কিট হাউসের যে ঘরটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। সেই ঘরের স্মৃতিচিহ্নসহ জিয়াউর রহমান ব্যবহƒত নানা জিনিসপত্র এবং তার বেশকিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে এখানে। রয়েছে চট্টগ্রাম কালুরঘাটে খালকাটা কর্মসূচিতে নেতৃত্বদানরত অবস্থায় শহীদ জিয়ার একটি ভাস্কর্য। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার কারণে এখানে এই জাদুঘর প্রতিস্ঠিত হয়েছে।
ওয়ার সিমেট্টি :
নগরীর প্রবর্তক মোড় পেরিয়ে বাদশা মিয়া রোডে আর্ট কলেজের পাশে এর অবস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের একাংশ এখানে সমাহিত করা হয়েছে। প্রতিদিন বিশ্রাম পিয়াসী মানুষ ভিড় করেন এই কবরশালায়। নির্দিষ্ট সময় এখানে গেট খোলা থাকে এর আগে বা পরে ওয়ার সেমিট্রেতে প্রবেশ করা যায়না। ফুলের বাগান বেষ্টিত মনোরম এ স্থান স্মরণ করিয়ে দেয় সেইসব সৈন্যদের শৌর্যবীএরর্য ও বীরত্বগাথা। ছোট ছোট সমাধিফলক সারিবদ্ধভাবে সাজানো। এটাকে কমনওয়েলথ যুদ্ধসমাধিও বলা হয়। এখানে যেসব সৈনিকের মরদের সমাহিত করা হয়েছে। এফিটাপ ছাড়াও এই আলাদা বইতে তাদের নাম লেখা রয়েছে।
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার : মাতৃভক্তি এবং ধর্মীয় কারণে স্মরণীয় হয়ে আছেন বায়েজিদ বোস্তামী। মাজার পুকুরে রয়েছে দানবাকৃতির অনেকগুলো কাছিম। জনশ্রতি আছে, কাছিমগুলোর বয়স কয়েক শত বছর। এছাড়াও স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজউদ্দৌলা রোডের চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ। প্রায় তিনশ’ বছর আগে নির্মিত এ মসজিদটির সৌন্দর্য এখনও মানুষকে বিমোহিত করে।
পারকি সমুদ্রসৈকত :
চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায় গড়ে ওঠা এ নয়নজুড়ানো সমুদ্রসৈকত নতুন করে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। সৈকতের পাড়ে ঝাউবন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো চিক চিক সাদাবালি এই সৈকতের আরেক আকর্ষণ। সৈকতে সামুদ্রিক কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ নির্মল আনন্দদান করে। দূর থেকে দেখা যায় চ্ট্গ্রাম বন্দরে ভেড়ার অপেক্ষায় নোঙ্গর করা জাহাজ সারি। পারকিতে এখনো অনেক সুযোগ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ফলে পর্যটকরা নানা অসুবিধা ভোগ করেন।
সন্দ্বীপ : আসলে এটা চট্টগ্রামেরই একটি থানা।অনেক বছর ধরেই এখানে মানুষের বসবাস। সীতাকুন্ড ঘাট থেকে সহজে যাওয়া যায় সন্দীপ। সমুদ্রের মধ্যে মানুষের বসতি দেখতে যেতে পারেন সন্ধীপে। সন্দীপ যেমন বহু আলেম ওলামার জন্মস্থান। তেমনি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসের ইতিহাসে সন্দীপকে কালিমালিপ্ত করেছে। যদিও ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতি অনেকটা নোয়াখালীর মতোই।
লেখা : জাহাঙ্গীর আলম শোভন
