স্বামী লক্ষ্মী শঙকরাচার্য

সন্ত্রাসবাদের গুজব ও বাস্তবতা, প্রসঙ্গ ইসলাম

সন্ত্রাসবাদের গুজব ও বাস্তবতা, প্রসঙ্গ ইসলাম

মূল: স্বামী লক্ষ্মী শংকরাচার্রয

ব্যাপারটা এভাবে শুরু হয়েছে, ভারতসহ পৃথিবীর কোথাও যদি কোন বিস্ফোরণ হয় অথবা কোন ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় এবং ঐ ঘটনায় কোন মুসলিম যদি যুক্ত থাকে, তাহলে সেটাকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ বলা হয়।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংবাদ মাধ্যমসহ কিছু শক্তি নিজ নিজ স্বার্থে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে এটাকে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ পরিভাষায় পরিণত করে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়। দূরভিসন্ধিমূলকভাবে এ অপপ্রচারের ষড়যন্ত্র ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আজ যেখানেই কোন বিস্ফোরণ হোক না কেন, সাথে সাথে সেটাকে ইসলামী জঙ্গিবাদী ঘটনা বলে প্রচার করা হয়।
এই ধারাবাহিকতায় সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বিভিন্ন গণমাধ্যম দ্বারা এবং পশ্চিমা দুনিয়াসহ বেশ কিছু দেশে, বেশ কিছু ভাষায় ভাষায় শত শত বই পুস্তক লেখে প্রচার করা হয়েছে, বিশ্বে সন্ত্রাসের মূল হেতু হলো ইসলাম।
কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর যেসব আয়াত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মুসলিমদের নির্দেশ দিয়েছিল, তারা যেন অন্য ধর্মাবলম্বী কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তাদেরকে হত্যা করে কিংবা তাদের (পরকালের) ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক (?) মুসলিম বানায়, তাদের উপাসনালয়গুলোও বন্ধ করে দিতে বলে (মূল আলোচনা পরে পাওয়া যাবে)। এ ধরনের আয়াতগুলো দ্বারা তারা এ অপপ্রচারকে সত্যি বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আর বলা হয়েছে, ইসলামে জিহাদ রয়েছে, আর জিহাদকারীদের আল্লাহ জান্নাত দান করবেন। ইসলামের এমন নির্দেশই সন্ত্রাসের আসল কারণ বলে দাবী করা হয়। এরকম পরিস্থিতিতে, সু-পরিকল্পিতভাবে ইসলামের অপব্যাখ্যা করে মুসলিমদের দোষারোপ করার জন্য ইসলামকে নিরীহ মানুষের হত্যাকারী বলা হচ্ছে। এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যার মানে দাঁড়ায় ইসলাম সন্ত্রাসবাদী। বলা হচ্ছে, আজকের পৃথিবীতে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি হচ্ছে ইসলামের ‘জিহাদ’ ধারণা থেকে।
আসলে ব্যাপারটা কি? যদি ইসলাম মানে সন্ত্রাস হতো, তাহলে সারা ভারতে ২৫ কোটি সন্ত্রাসী তৈরি হতো। আর ২৫ কোটি সন্ত্রাসী যেখানে থাকবে সেখানে তো শান্তি, সম্প্রীতি, সদ্ভাব, সাম্প্রদায়িক সমঝোতা থাকার কথা নয়। তাহলে কি আমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে?
এটা জানার জন্য আমরা এই পুস্তকে ধারাবাহিক আলোচনা করব। এটা সেভাবেই করব, যেভাবে আমি সত্যের সন্ধান পেয়েছিলাম। আমার এ পবিত্র প্রচেষ্টা যদিও বিশুদ্ধ মন দিয়ে করব, তবুও অজান্তে যদি কোনো ভুল-ত্রæটি হয়, আশাকরি পাঠক আমার জন্য ক্ষমার দরজা খোলা রাখবেন। এখানে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বোঝার জন্য আমরা তিন ধাপে অগ্রসর হব।
ইসলাম প্রসঙ্গে যে কোনো কিছু পেশ করার জন্য এখানে আমরা তিনটি মানদন্ড বা পরিমিতি মেনে চলব :
১. কুরআন মজীদে আল্লাহর আদেশ নিষেধ।
২. আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনী।
৩. হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর বাণী অর্থাৎ হাদিস।

এবং আমরা এই মর্মে অনুসন্ধান করব :
* আসলেই কি ইসলামে নিরাপরাধ ব্যক্তিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে এবং তাদের হত্যা করতে অথবা সহিংসতা ছড়াতে আদেশ দেয়া ইসলাম?
* ইসলাম কি সত্যিই অন্যদের ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে ফেলার আদেশ দেয়?
* ইসলাম কি সত্যিই অন্য ধর্মের লোকদের জোরপূর্বক মুসলিম বানাতে বলে?
* সত্যিকার অর্থে হামলা করা, নির্দোষদের হত্যা করা এবং ত্রাস সৃষ্টি করার নাম কি জিহাদ?
* ইসলাম কি সত্যিই একটি সন্ত্রাসবাদের ধর্ম?
সবার আগে এটা বলে নেয়া জরুরী, হযরত মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর শেষ নবী। আল্লাহ আসমান থেকে কুরআন মজীদ মুহাম্মদ (স.)-এর উপরই প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর রাসূল হওয়ার পর থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত ২৩ বছর তিনি (স.) যাকিছু করেছেন, তা কুরআন অনুসারে করেছেন।
অন্য কথায়, হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের এই ২৩ বছর হলো কুরআন তথা ইসলামের বাস্তব ব্যবহারিক রূপ। কুরআন বোঝার বা ইসলামকে জানার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজ পদ্ধতি হলো মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনী পাঠ করা। আমার নিজেরও এটা উপলব্ধি। রাসূল (স.)-এর জীবনী এবং কুরআন মজীদ পাঠ করে পাঠক স্বয়ং নির্ণয় করতে পারেন‘‘ইসলাম সন্ত্রাস না আদর্শ?’
সেজন্য আমার মতো ইতিবাচক অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে উপরের তিনটি বিষয় পাঠ করে নিতে পারেন, প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে। বিশেষ করে অমুসলিমদের ইসলাম জানার জন্য এটা ভালো উপায়।

লেখক পরিচিতি:

স্বামী লক্ষ্মী শংকরাচার্য ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুর জেলার এক ব্রাক্ষ্মন পরিবারে ১৯৫৩ সনে জন্ম নেন । তাঁর পিতা স্বামী সীতারাম ত্রিপাঠী এবং মাতা শ্রীমতি কৌশিল্যা দেবী দুজনই নামজাদা অধ্যাপক ছিলেন ।  প্রথম জীবনে তিনি একজন ঠিকাদার ছিলেন। পরে তিনি আধ্যাত্মিক গবেষণা ও ধর্মপ্রাণ জীবন বেছে নেন। এই শান্তিপ্রিয় মানুষটিকে কিছু হিন্দু পন্ডিত ইসলাম বিরোধীতার জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তারা তাকে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামেন। তিনি প্রথমে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও পরে আরো ব্যাপক অনুসন্ধানে তিনি আসল সত্য উপলব্দি করতে পারেন। বর্তমানে তিনি ‘‘ইসলাম আতংক নয় আদর্শ’’ বইতে স্পষ্ট ভাষায় তথ্যপ্রমাণ হ উল্লেখ করেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিময়, আদর্শপূর্ণ ও মানবিক ধর্ম হলো ইসলাম। তিনি ভারতের হিন্দুরা যেভাবে তাদের ধর্ম পালন করেন সেটারও বিরোধীতা করে আসছেন। তিনি নিজেকে প্রকৃত হিন্দু মনে করেন। এবং ভারতের বেশীরভাগ মানুষ তাদের মূল ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ইসলামের সাথে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু মানুষ কেবল ইসলামের বিরোধীতা করার জন্য এসব প্রচার করছে। তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি সৃস্টির জন্য দুটো সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিমের ভাতৃত্ব ও ইসলামের কল্যাণমুথী আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরেন। ইউটিউবে তার বক্তৃতার ভিডিও দেখতে পাওয়া যায়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply