কতোটা প্রয়োজন প্রেস রিলিজ
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বই: প্রেস রিলিজ গাইড লাইনস
প্রেস রিলিজ সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শুভসূচনা, নতুন পণ্য, অনুষ্ঠান কিংবা ক্রেতার কাছে কোনো বিশেষ বার্তা দেয়ার জন্য কাজে লাগে। প্রেস রিলিজ আসলে এক ধরনের প্রচারণা। আসলেতো তাই! সূর্য প্রতিদিন পূর্ব দিকে উঠে আর পশ্চিম দিকে অস্ত যায় এটাওতো সব লোকেই জানে, তবুও প্রতিটি মানুষ এই কথাটা একদিন নতুন করে শেখে। মজার ব্যাপার হলো এই কথাটা বইতেও লেখা থাকে। তাহলে চলুন, আমরা প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রয়োজনীয়তার কথাগুলো বই থেকে বুঝতে চেষ্টা করি।
প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের কথা জানান
আপনি যখন নতুন কোনো ব্যবসা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের শুভ সূচনা করবেন। তখন নিশ্চই আপনি চাইবেন তা দেশবাসী জানুক অথবা এলাকাবাসী। তো সেজন্য আপনি ফেসবুকে পোস্ট, ইভেন্ট, অফিসে মিলাদমাহফিল, মসজিদে শিন্নী, জুমার পরে লিফলেট, মোবাইলে এসএমএস ইত্যাদি নানা কিছুই করতে পারেন। টিভি আর অনলাইনে বিজ্ঞাপনের রাস্তাতো খোলাই আছে। তবুও আপনি যদি সেটা প্রেস রিলিজ দিয়ে জানানোর একটা রাস্তাও আছে। তখন গণমাধ্যমে থেকেও কিছু লোক সেটা জানতে পারবে। সুযোগ থাকলে নিশ্চই সেই সেটা হাতছাড়া করবেন না। তাই আপনার ব্যবসার উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানের কথা আপনি প্রেস রিলিজ দিয়ে জানাতে পারেন।
নতুন পন্যের কথা জানান
ব্যবসা করছেন। চলছেও ভাল। ভাবলেন নতুন একটা পণ্য যুক্ত করবেন। অথবা স্কুলটা নাম করেছে ভাবলেন এবার সেখানে উচ্চমাধ্যমিক যুক্ত করবেন। এনজিও ভাল কাজ করছে ভাবলেন এবার নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করবেন। যদি এই ঘটনাগুলো মানুষের বৃহত্তর কোনো কাজে লাগে অথবা এগুলোতে জনতার আগ্রহ থাকে। তাহলে আপনি একখান প্রেস রিলিজ লিখে খবরটা সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানিয়ে দিতে পারেন সকলকে। এভাবে আপনার নতুন পন্যের খবর আপনি প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে পারেন পত্রিকায় কিংবা টিভিতে। বড়ো ব্রান্ডের নতুন পন্যের খরব কিন্তু পত্রিকা ছাপবে। আপনারটা ছাপবে কিনা? বা কিভাবে হলে ছাপবে তা জানার জন্য বইয়ের অন্য পাতাগুলোতো পড়ে রয়েছে।
কোনো অনুষ্ঠান বা ইভেন্টের কথা জানান
আপনার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নানা আয়োজন থাকতে পারে। শুধুমাত্র তিন দিবস পালন নয়, এই বাইরে থাকতে পারে নানা কর্মসূচী। বাণিজ্যিক কিংবা সামাজিক এসব কর্মসূচীর কথা আপনি জানাতেই পারেন আপনার কাংখিত মানুষদের। সেটা অনুষ্ঠানের আগে জানাতে পারেন তখন, যখন এতে আপনার প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। আর পরে জানানোটা তখন জরুরী, যখন এই অনুষ্ঠান সফল আয়োজনের সংবাদ আপনি জনতার কানে তুলতে চান। দু’টো ক্ষেত্রেই পিআর বা প্রেস রিলিজ হতে পারে অন্যতম মাধ্যম।
একসময় চিঠি, দাওয়াত কার্ড, টেলিফোন আর পত্রিকার এইটুকু প্রেসরিলিজ শেষ ভরসা ছিল। বর্তমানে আরো এন্তার মাধ্যম যুক্ত হয়েছে এসব কথা মানুষকে জানানোর জন্য। কিন্তু তবুও সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্ব যেমনি কমেনি তেমনি কমেনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মর্যাদা।
কারণ হলো ভাব, সহজ কথায় প্রেস্ট্রিজ। আপনি নিজে নিজে নিজের বিয়ের কথা বললেন আর পত্রিকায় আপনার বিয়ের কথা লিখলো দুটো ভিন্ন ব্যাপার তাই না? যদিও আপনার-আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যেহেতু চায়ের কাপে ঝড় উঠবেনা সূতরাং আমাদের বিয়ের প্রেস রিলিজ না করাই ভাল। যদিও, আমার বিয়ের খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ছবি সহ। না নাম বলছিনা। এতে আপনি হয়তো আমাকে বড়কিছু ভাববেন, নয়তো পত্রিকাকে ছোট করে ভাবতে পারেন। কোনোটাই সঠিক ভাবনা হবে না।
আমরা বরং আমাদের প্রতিষ্ঠানের সে অনুষ্ঠানটার কথা প্রেস রিলিজ দিয়ে জানাব। যেটাতে জনতার স্বার্থ রয়েছে অথবা সেখানে বিশাল মাপের কেউ অতিথি হয়েছেন অথবা কোনো একদিক থেকে সেটি অনন্য। তখন সেটি ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। নইলে কাগজওয়ালাদের কেবল বিরক্তই করা হবে। তবে আমরা এইটুকু বুঝলাম। ঘটনার ঘনঘটা হলে আপনার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সংবাদ পত্রিকায় তুলতে একটা পিআর করতেই পারেন।
সামাজিক উদ্যোগের কথা জানান
আপনার ব্যবসায়িক উদ্যোগের কথা প্রেস রিলিজ না জানালেও চলবে অন্য অনেক মাধ্যমে জানাতে পারবেন। আপনার নতুন পণ্যের কথা পত্রিকায় নিউজ না হলে পাঠক হয়তো মাইন্ড করবেনা। কিংবা আপনার অনুষ্ঠানের খবর না ছাপা হলেও পত্রিকার সে কলামটি খালি যাবেনা। তবে আপনার কোনো সামাজিক উদ্যোগ, মানবসেবা মূলক কাজ, কিংবা মানুষের উপকারী কর্মসূচী (সহজ বাংলায় থুক্কু) ইংরেজীতে সিএসআর যাকে বলে। সেক্ষেত্রে খুব প্রচার পাবেন যদি আপনি প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে সেটাকে পত্রিকায় পাতায় ধরাতে পারেন।
আপনার বাসার কাজের মেয়েকে বেতন দেয়ার খবর নিশ্চিই নিউজ হবেনা। আত্মীয়কে সাহায্যের খবরও নয়। হয়তো বহু মানুষকে সাহায্য করলে সেটা হতে পারে। একজন মানুষকে অনেক সাহায্য করলে সেটাও হতে পারে। গণপরিচিত কারো পাশে দাঁড়ালে, ভাইরাল ইস্যুতে কাছে আসলে ভাইরাল হয় কারণ তাতে পাবলিকের আগ্রহ রয়েছে। এরকম ঘটনা আপনার ক্ষেত্রে ঘটলে আপনি পিআর করতেই পারেন। ভালো কাজের খবর ভাইরাল না হতে পারে তবে সংবাদ মাধ্যম আপনাকে উৎসাহ করার জন্য নিউজটি প্রচার করতেই পারে।
কখনো কখনো আপনি পিআর না করলেও সেটা নিউজ হতে পারে। যেমন ধরুন, রানা প্লাজায় ১৭ দিন পর বেঁচে ফিরে আসা রেশমীকে চাকরী দিয়ে কি প্রচারটাইনা পেল ওয়েস্টিন হোটেল। আর, না বলে দোকান থেকে বাচ্চার জন্য দুধ নিয়ে ভাইরাল হওয়া সে ভাইটিকে চাকরী দিয়ে ঠিকই বিনা পিআরে সংবাদ শিরোনাম হতে পেরেছে দেশের বৃহৎ রিটেইল ব্রান্ড স্বপ্ন।
বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানান
এছাড়া আরো আসতে পারে আপনার পিআর তালিকায়। ঠিকানা পরিবর্তন থেকে প্রোডাক্টসের ফিচার পরিবর্তন পর্যন্ত। তবে পাড়ার দোকানে নতুন জাতের মুরগী আসলে নিউজ না হতে পারে কিন্তু ইন্টেলের নতুন জেনারেশন প্রসেসর আসলে বিশ্বময় ঠিকই সংবাদ হবে। প্রেস রিলিজ দিলেতো কথা’ই নেই। বিষয়টা হলো ঘটনাটা আসলে কতটা প্রভাব বিস্তার করছে। তার উপর নির্ভর করছে সেটা ছাপা হবে কিনা আর হলে কিভাবে হবে?
কথা ছিল, গল্পের ছলে আপনাদের বিষয়গুলো বলে যাব। তাই এত কথার ফুলঝুড়ি ঝাড়লাম এতক্ষণ। আজকালকের দিনে হয়তো পত্রিকা আর টিভির চেয়ে ফেসবুক ইউটিউবে এড দিলে বেশী মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ আকারে প্রকাশ হওয়ার মাঝে আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা আছে। যেমন আপনাকে টিভিতে খবরে দেখিয়েছে এটা হয়তো আপনার বন্ধুরা তখনি জানতে পারে যখন আপনি সেটা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন।
তাহলে ব্যাপারটা দাড়ালো আপনি প্রেস্ট্রিজের কিংবা ব্রান্ড ভ্যালুর জন্য হলেও প্রেস রিলিজ করবেন যাতে সেটা পত্রিকা বা টিভিতে আসে। আর পত্রিকা ও টিভির সংবাদ কাটিং আপনাকে আপনার ক্রেতা বা শুভান্যুধ্যায়ীদের জানানোর মাধ্যমে তাদের কিছুটা বিশ্বাসও বাড়িয়ে নিতে পারেন। সংবাদ মাধ্যমের বক্তব্যের একটা বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা থাকে যেটা আপনার ফেসবুকের ভাইরাল পোস্টটিরও নেই। তাই পত্রিকায় ছাপানো তথ্যগুলো আপনার কাছে ভাইরাল পোস্টের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আর ঠিক এই কারনেও এত মার্কেটিং টুলস আসার পরও প্রেস রিলিজের গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি। কি বুঝলেন?

