খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া ইতিহাসের বাঁকে এক দিকপাল

খালেদা জিয়া: ইতিহাসের বাঁকে এক দিকপাল

এখনকার সামাজিক চলনে হয়তো উনার নাম হতো খালেদা ইস্কান্দার বা খালেদা মজুমদার। যদিও বাবার নাম যুক্ত করা আরবীয়—পরবর্তীতে ইসলামী রীতি, আর স্বামীর নাম যুক্ত করা মূলত পশ্চিমা রীতি। আমাদের সমাজে দুটোই সমান্তরালভাবে চলে।
তার পৈত্রিক নিবাস ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। বলা যায়, ঐতিহাসিক মজুমদার বাড়িরই কন্যা তিনি। জন্ম অবিভক্ত দিনাজপুরের জলপাইগুড়িতে, বেড়ে ওঠাও সেখানেই। দেশভাগের পর তার পরিবার চলে আসে বাংলাদেশের দিনাজপুরে।

দিনাজপুরের যে বাড়িতে উনার বাগদান ও বিয়ে অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল—দিনাজপুরের বন্ধুদের সুবাদে। এক মুহূর্তের জন্য সে সময়ের দৃশ্যটা কল্পনায় এঁকেছিলাম। বোধকরি, ইতিহাস-ছোঁয়া কোনো জায়গায় গেলে আমরা সবাই এমনটাই করি।

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে দেশ ও বিশ্বকে চিনেছি, তাদের চোখে এরশাদ যুগের অবসানের পর যে সরকারটি প্রথম গভীরভাবে ধরা দেয়, সেটি ছিল তার সরকার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আপোষহীন অবস্থান নেওয়ার কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। আর সেই একই কারণ পাঁচ বছর পর তাকে সরকারপ্রধানের আসনে বসায়।
বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—এই পরিচয় নিঃসন্দেহে নারীদের কাছে তাকে আলাদা করে গ্রহণযোগ্য করেছে। তবে আমার বিশ্বাস, এটা কেবল ‘প্রথম’ হওয়ার জন্য নয়; বরং তার কর্ম, মনোভাব ও গুণের জন্যই।

নিজের কোনো কন্যাসন্তান না থাকায় তিনি মেয়ের অভাব বোধ করতেন, আর মেয়েদের প্রতি তার আলাদা এক স্নেহ ছিল। নারীশিক্ষায় তার সিদ্ধান্ত ও অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বড় ছেলের কন্যা জাইমার জন্মের পর তিনি যেন একসঙ্গে একটি কন্যা ও এক বান্ধবী পেয়ে যান। ছোট জাইমাকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রের ভিডিওতে জাইমাকে দেখা যায়—এ রকম আরও বহু দৃশ্য আছে। ভীষণ আদর করতেন। হিংস্র প্রতিপক্ষ তাদের দুজনকেই আলাদা করে দিয়েছে। এই দ্বৈত উপস্থিতি নিয়ে একসময় আমি একটি ছড়াও লিখেছিলাম—

“নকশা করে মঞ্চ বানায়, করে অনেক খাটুনি
প্রধানমন্ত্রী ধীরে আসেন, সঙ্গে আসে নাতনী।”

আমি ফেনীর মানুষ। ফেনীকে আমি বলি—“ল্যান্ড অব লিডারস”। জনসংখ্যা ও আয়তনের তুলনায় এখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য নেতৃত্বশীল মানুষের জন্ম হয়েছে। আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হয়—ফেনীতে বেগম জিয়ার পৈত্রিক নিবাস বলেই কি এখানকার মানুষ তার দল করে বা তাকে ভোট দেয়?
আমি এই যুক্তি বরাবরই অস্বীকার করি। বিষয়টা মোটেও তা নয়। বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্ব, মানসিক দৃঢ়তা, অবদান এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা নেত্রীর চিন্তা ও আচরণের পার্থক্য—এসবকেই ফেনীর মানুষ সম্মান করে। ফেনীর মানুষ নেতৃত্ব বোঝে। কেবল এলাকার সন্তান বলেই গুণহীন কাউকে মাথায় তুলে নেওয়ার মতো বিবেচনার অবক্ষয় ফেনীর মানুষের হয়নি, হবেও না।

বেগম জিয়ার দেশপ্রেম ও সততা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি এখানে তার দুটি বিশেষ গুণের কথা বলতে চাই।
প্রথমটি—তার মধ্যে কোনো ভণ্ডামি ছিল না। মেকআপ আর গোলাপি শিফন শাড়ি নিয়ে যত সমালোচনাই হোক, লোক দেখানোর জন্য তিনি কখনো নিজেকে বদলাননি। তিনি ভোটের আগে হিজাব পরে অভিনয় করেননি, নিজ হাতে রুটি বেলে ভাইরাল হননি, বন্যার্তদের জন্য হাঁটুসমান পানিতে নেমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি।
অনেকে বলেন, এরশাদের আমলে টিয়ারশেল পড়ায় তার মুখ পুড়ে যাওয়ার কারণেই ভারী মেকআপ। কিন্তু আমার কাছে এটা তার নিজের প্রতি সম্মানের প্রকাশ বলেই মনে হয়। একজন মানুষের নিজের প্রতি সম্মান থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯৬ সালে যখন সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলে, আমিও তত্ত্বাবধায়ক প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিলাম। কিন্তু সবাই যেভাবে চেয়েছিল, সেই পদ্ধতির পক্ষে ছিলাম না। বরং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যেভাবে বিষয়টি সামাল দিয়েছেন, আমি শুরু থেকেই তার পক্ষে ছিলাম—ঘরোয়া আড্ডায় সেটি বলতামও।
কারণ তখন বিরোধীদলের সদস্যরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল পাস করার জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দরকার, তা সংসদে ছিল না। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো পথে বিল পাস করলে সেটি সাংবিধানিকভাবে টিকত না; পরবর্তী সরকার সহজেই বাতিল করতে পারত। তাই একটি পূর্ণ সংসদ অপরিহার্য ছিল। তিনি নির্বাচন দিয়ে পূর্ণ সংসদ গঠন করলেন, তারপর সেই সংসদেই বিলটি পাস করালেন। তখন এটিই ছিল সাংবিধানিকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

এ কথা সত্য, সে নির্বাচন বিতর্কিত ছিল, অনেকটাই একদলীয় রূপ নিয়েছিল—যদিও ১৪টি দল অংশ নিয়েছিল—এবং ভোটার উপস্থিতিও কম ছিল। তবে এটাও সত্য, বেশি ভোট দেখানোর জন্য নিজেরা ভোট দিয়ে বাক্স ভরাট করার মতো কাজ তিনি করেননি।

এবার আসি তার দ্বিতীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথায়। যারা রাজনীতি বোঝেন, তারা জানেন—ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, তা আগেভাগে বুঝতে পারা একজন নেতার বড় গুণ। খালেদা জিয়ার বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে এর বহু প্রমাণ আছে। তবে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০০১ সালের নির্বাচনে তার জোট গঠনের কৌশল এবং তার সুফল। দলের ভেতরে-বাইরে অনেকেই তাকে এই পথে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি সাংস্কৃতিক প্রগতিশীলদের একটি অংশের সমর্থনও হারিয়েছিলেন। তবু জয়ের মালা তার গলাতেই উঠেছিল। আজও জোট রাজনীতির যে ধারা, সাম্প্রতিক সময়ের জোটগুলোর দিকে তাকালেই তার প্রাসঙ্গিকতা বোঝা যায়।

তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একজন বিদুষী ও সমাজসেবী নারী। মা-মেয়ের দুজনেরই একজন ভক্ত ছিলেন সদ্যসাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া—অনেকে বিষয়টি জানেন। এ নিয়ে সংসদে কটাক্ষও হয়েছিল একসময়।

আজ খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তা কোনো দলীয় জনপ্রিয়তার ক্ষণস্থায়ী বহিঃপ্রকাশ নয়, কিংবা করুণার দানও নয়। এটি বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের ফসল।
কারণ, তার কোনো পিএস যদি বই লিখে দিত—তিনি কীভাবে মানুষ খুনকে আর হরতালকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়েছেন—তাহলে তার রাজনৈতিক জীবন সেখানেই শেষ হয়ে যেত।
আদালত যদি তাকে “রং-হেডেড পার্সন” ঘোষণা করত, তবে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সেখানেই রুদ্ধ হয়ে যেত।
আর তিনি যদি নিজেই নিজেকে জাতীয়ভাবে “বেইমান” বানাতেন, তাহলে আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন না।

তিনি যা অর্জন করেছেন, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে বেচে পাওয়া কিছু নয়। নিজের শ্রম, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়েই তিনি এসব অর্জন করেছেন। যদিও তার স্বামী ছিলেন যুদ্ধের একজন কমান্ডার ও ঘোষক, আর তিনি ও তার সন্তানরা একসময় প্রায় বন্দিজীবন কাটিয়েছেন—তবু সবকিছুকে ছাপিয়ে আজ তার নিজের কাজই তার পক্ষে সবচেয়ে শক্ত সাক্ষ্য।

খালেদা জিয়া এমন এক নেতৃত্ব, তিনি বিধবা নারী হয়েও নারী নেতৃত্ববিরোধীদের নেত্রী হয়েছেন। তিনি শিপন শাড়ি আর মেকাপ করে দেশের সাধারণ নারীদের প্রিয় হয়েছেন। তিনি সংযত, পরিমিত হয়েও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

আজ বাংলাদেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে সম্মান ও স্মরণ করছে। এই উপলব্ধির পেছনে আরেকজনের ভূমিকাও আছে—তার আচরণ, নোংরামি ও হিংস্রতা না থাকলে খালেদা মজুমদারের মহত্ত্ব বুঝতে মানুষের হয়তো আরও সময় লাগত।

— জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply