শরীফ ওসমান হাদী ও তার প্রাসঙ্গিকতা
শহীদ শরীফ ওসমান গনি বিন হাদী—যিনি কবি সীমান্ত শরীফ নামেও পরিচিত—কত বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: হাদী কতটা প্রাসঙ্গিক?
অল্প সময়ের জীবনেই হাদী তার বহুমাত্রিক চিন্তা, কথা ও কর্মের মাধ্যমে নিজেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন।
প্রথমত: ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
যা অনেকেই “জুলাই যুদ্ধ” নামে অভিহিত করেন, সেই অভ্যুত্থানে হাদীর অংশগ্রহণ শুধু উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অভ্যুত্থান চলাকালীন ও পরবর্তী সময়েও কোনো ধরনের বিরতি না নিয়ে তিনি বিপ্লবকে সচল রেখেছেন। এই ধারাবাহিকতা ও দৃঢ়তায় তিনি অনেক পরিচিত নেতৃত্বকেও ছাপিয়ে গেছেন।
দ্বিতীয়ত: আধিপত্যবিরোধী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায়
বাংলাদেশের আধিপত্যবিরোধী রাজনীতির ইতিহাসে মাওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জিয়া, মেজর জলিল, বেগম খালেদা জিয়া, আল্লামা সাঈদী থেকে ইলিয়াস আলী—এই ধারার সঙ্গে হাদীর নামও যুক্ত হয়ে থাকবে।
হাদী নিজেই বারবার বলেছেন, তিনি এই মানুষগুলোর চিন্তা ও সংগ্রামের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন।
তৃতীয়ত: প্রতিবাদী কবি
হাদী ছিলেন একজন প্রতিবাদী কবি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য হিসেবে তার কবিতায় শাসনতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতি তীব্র উপহাস ও প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। এই দিক থেকে তাকে রফিক আজাদসহ অন্যান্য প্রতিবাদী কবিদের কাতারে এবং নজরুলের উত্তরসূরিদের সারিতে রাখাই যুক্তিসংগত।
চতুর্থত: শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে শহীদ
শহীদ আসাদ, দেলোয়ার, ডা. মিলন, আব্দুল মালেক, নূর হোসেন—এবং সাম্প্রতিক আবু সাইদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ফাইয়াজ, রুদ্রদের যে ধারাবাহিকতা—হাদী সেই কাতারেই থাকবেন।
বরং এক ধাপ অগ্রসর অবস্থানে, কারণ তিনি শুধু শহীদ হননি—তিনি নিজের আদর্শ, চিন্তা ও পথকে জীবদ্দশাতেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে গেছেন।
পঞ্চমত: তরুণদের রোল মডেল
স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক টার্ন বদল এবং জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ একজন সর্বজনগ্রাহ্য রোল মডেলের অভাব অনুভব করেছে।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য এমন একজন নেতৃত্বের অভাব ছিল, যাকে অনুসরণ করে তারা নিজেদের পথ তৈরি করতে পারে। হাদী তার স্পষ্ট অবস্থান, দৃঢ় কণ্ঠ ও বলিষ্ঠ উচ্চারণের মাধ্যমে অল্প সময়েই বিপ্লবী তরুণদের কাছে একজন আইকনে পরিণত হয়েছেন।
ষষ্ঠত: দেশপ্রেমী শহীদ—বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে
এই জায়গায় হাদী নিজেকে নিয়ে গেছেন বৈশ্বিক কাতারে। তার নাম ও ছবি দেখা যাচ্ছে খালিস্তানপন্থী শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিন ও ইরানের শহীদ যোদ্ধাদের সঙ্গে। অর্থাৎ হাদী শুধু একটি দেশের নয়—একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ-চেতনার অংশ হয়ে উঠেছেন।
কেন হাদী এগিয়ে?
আমরা অনেক কিছু বুঝি, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না। অনেক কিছু বুঝেও বলি না, কিংবা বললেও অস্পষ্ট ভাষায় বলি।
হাদী দেশ, স্বাধীনতা, রাজনীতি ও আধিপত্যবাদের পাঠ শুধু রপ্ত করেননি—সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন। এই জায়গায় তিনি তার সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী অনেক প্রজন্মকেও ছাড়িয়ে গেছেন।
তার ধারণা ছিল পরিষ্কার, বক্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং উচ্চারণ ছিল দৃঢ়।
ভবিষ্যতেও হাদীর শত্রু থাকবে—কায়েমী স্বার্থবাদীরা তার বিরোধিতা করবেই। কিন্তু তার স্পষ্ট অবস্থান ও অগ্রসর মানসিকতা তাকে প্রান্তিক বাস্তবতায়ও জীবিত রাখবে। দেশপ্রেমিক তরুণরাই তাকে আপন করে নেবে।
অনেকে ভাবছে, হাদীর হত্যাকারী ও নির্দেশদাতারা হয়তো মনে করছে—তারা ভুল করেছে কি না। বাস্তবতা হলো, একজন হাদীর শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না।
বরং তারা চেষ্টা করবে হাদীর আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে।
আগে তাদের কৌশল ছিল—এক-দু’জন তরুণকে হত্যা করে “হিরো” বানানোর চেয়ে শত শত মানুষ হত্যা করলে কাউকেই মানুষ মনে রাখবে না। কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। আবু সাইদ ঠিকই বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। পাশাপাশি সাইকো টিম দিয়ে বয়ান তৈরির চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।
হাদী হত্যার বিচার ও প্রতিরোধের আন্দোলন আরও বেগবান হবেই। হত্যাকারী ভিডিও দিয়ে নিজেকে বাইক আরোহী হিসেবে অস্বীকার করেছে, অথচ গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মহল যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
নিজেকে অন্য দেশে থাকার দাবিও তার মিথ্যার আরেকটি প্রমাণ—কারণ একজন পলাতক খুনি কখনো নিজের অবস্থান প্রকাশ করে না।
একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত ফেরারি ও তার “সাইকো ইনজেকশন” গ্রহণকারীরা যতদিন সক্রিয় থাকবে, ততদিন অস্থিরতা চলবে। এই অশান্তির বীজ ১৯৮১ সালেই ঘোষণা দিয়ে রোপণ করা হয়েছিল।
যেমন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর পাকিস্তানকে সমর্থনের একটি নৈতিক দায় থেকে যায়, তেমনি প্রতিটি গণবিরোধী পদক্ষেপের পর সাইকোবাদকে সমর্থন করার দায়ও সংশ্লিষ্টদের বিবেকেই থেকে যাবে।
হোক তা বাকশাল কায়েমের সময় থেকে, ১৭৩ দিনের নৈরাজ্য, লগি-বৈঠার হিংস্রতা, পিলখানা বা শাপলা চত্বর, গুম ও ১৫ বছরের জুলুম—এমনকি সর্বশেষ ৩৬ দিনের গণহত্যার পরও—যারা হিতাহিত জ্ঞান প্রমাণ করতে ব্যর্থ হবে, পরবর্তী ইতিহাসের দায় তাদের সবাইকেই বহন করতে হবে।

