রাজার স্পর্শে গলগণ্ড সারার কুসংস্কার
রাজার স্পর্শে গলগণ্ড সারার কুসংস্কার

রাজার স্পর্শে গলগণ্ড রোগ ভাল হয়

রাজার স্পর্শে গলগণ্ড সারে

গলগণ্ড বা স্ক্রোফুলা একটি পরিচিত রোগ, যা সাধারণত আয়োডিনের ঘাটতির কারণে হয়ে থাকে। এই রোগে গলার অংশ ফুলে যায়, ফলে দেখতে অস্বাভাবিক ও অস্বস্তিকর লাগে। প্রাচীন কালে এ রোগকে “ঘ্যাগ” নামে ডাকা হতো। তবে শারীরিক রোগের সঙ্গে কুসংস্কারের মিশেল ঘটিয়ে ইউরোপে একসময় বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে, দেশের রাজা যদি রোগীর গলা ছুঁয়ে দেন, তাহলে এই রোগ সম্পূর্ণভাবে সেরে যাবে।

এই কুসংস্কারকে ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক প্রথা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম হেনরি নিয়মিতভাবে এই কাজ করতেন। সপ্তাহে নির্দিষ্ট একদিন তিনি দরবারে বসে অসংখ্য গলগণ্ড রোগীর গলা ছুঁয়ে আশীর্বাদ দিতেন। রোগীরা বিশ্বাস করতেন, রাজার হাতের ছোঁয়া তাদের শরীর থেকে রোগ তাড়িয়ে দেবে। শুধু তাই নয়, অনেক রোগী আশীর্বাদ পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাজাকে অর্থ দান করতেন। সেই অর্থ জমা হতো রাজকোষে, যা একধরনের রাজস্ব আয়েও পরিণত হয়েছিল। ফলে এই কুসংস্কার শুধুই ধর্মীয় বা মানসিক বিশ্বাসের জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক স্বার্থও।

এমনকি শুধু সপ্তম হেনরিই নন, ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চালর্স এই কুসংস্কারকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। ইতিহাসবিদদের হিসাবে, তিনি জীবদ্দশায় প্রায় এক লাখ রোগীকে এভাবে আশীর্বাদ করেছিলেন। এটি ছিল গলগণ্ড রোগীদের মধ্যে এক প্রকারের “আশীর্বাদকাল”। প্রতিবার রোগীরা দীর্ঘ ভিড় করে রাজাকে দেখার সুযোগ পেতেন এবং তার হাতে স্পর্শ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকতেন।

রাজার পাশাপাশি রানীরাও এই প্রথা চালিয়ে গেছেন। ইংল্যান্ডের রানী অ্যানও অসুস্থ মানুষদের গলায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করতেন। তবে এসব স্পর্শ রোগীদের গলগণ্ড আসলেই সারিয়েছে কিনা, তার কোনো প্রমাণ নেই। বরং চিকিৎসা ইতিহাসবিদদের মতে, এসব রোগীর ক্ষেত্রে মানসিক সান্ত্বনাই মূল কাজ করেছিল। অর্থাৎ, তারা বিশ্বাস থেকে স্বস্তি পেতেন, কিন্তু শারীরিকভাবে এর কোনো কার্যকর ফলাফল ছিল না।

গলগণ্ড রোগ সারাতে আয়োডিনের ঘাটতি পূরণ করা ছাড়া আসলেই অন্য কোনো উপায় নেই। সেই সময়ে রোগীরা হয়তো এসব জানতেন না। তাই রাজা বা রানীর আশীর্বাদের প্রতি তাদের অন্ধ বিশ্বাস গড়ে ওঠে। মধ্যযুগীয় সমাজে রাজাদের একধরনের অলৌকিক শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। ফলে তাদের স্পর্শই যেন ছিল ঈশ্বরের কৃপা পাওয়ার সমান।

এই কুসংস্কার আজকের দিনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও তখনকার যুগে এটি ছিল বাস্তবের অংশ। রাজার স্পর্শে গলগণ্ড সারবে—এমন ধারণা সেই সময়ের ইউরোপীয় সমাজে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও প্রভাবকেই আরও দৃঢ় করেছিল। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ স্পষ্ট বোঝা যায়, এসব ছিল নিছক বিশ্বাস, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না।

সূত্র: জ্ঞানের কথা
সৌজন্যে: টিম শোভনীয়
ছবি: ইন্টারনেট

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply