প্রাচীন সভ্যতায় বিড়ালের গুরুত্ব
প্রাচীন কালে বিড়ালের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা এতই প্রবল ছিল যে, মিশরে এক বিড়ালের জীবন মানুষের জীবন থেকেও বেশি মূল্যবান ধরা হতো। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পারস্য সেনাপতি ক্যাম্বিসেসের (Cambyses) অধীনে সেনারা মিশরের পেলোসিয়াম শহর অবরোধ করলে শহরটি আত্মরক্ষার জন্য কোনরকম ব্যবস্থা নেয়। পারসিয়ানরা জানতো যে, মিশরীয়রা বিড়ালের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। তাই তারা হুমকি দিল যে, যদি শহরের মানুষ আত্মসমর্পণ না করে, তবে তারা নগরের সব বিড়াল হত্যা করবে। এতে মিশরীয়রা বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল, তবে বিড়ালের প্রাণ রক্ষা করতে তারা তাদের নিজস্ব জীবনও দিত। এটি একটি অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
শুধু মিশরেই নয়, প্রাচীন জাপানেও বিড়ালকে অত্যন্ত মূল্যবান প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হতো। ১৬০২ সালের আগে জাপানে বিড়ালকে সোনার খাঁচায় রাখা হতো এবং খুব সম্মানের চোখে দেখা হতো। তবে ১৬০২ সালে জাপান সম্রাট ঘোষণা করলেন যে, বিড়ালকে আর বন্দী রাখা যাবে না। খোলা মাঠে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে যাতে তারা শস্যক্ষেত্রে ইঁদুর শিকার করে মানুষের উপকার করতে পারে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকে জাপানের বিড়ালরা সোনার খাঁচা থেকে মুক্তি পেল।
প্যারাগুয়েতে বিড়াল প্রথমবার ১৭৫০ সালে প্রবেশ করে। তখনও স্থানীয়রা ছোট এই বাঘসদৃশ প্রাণী দেখেনি। ইউরোপীয় নাবিকরা বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার পর তা বিক্রি করা হতো এক পাউণ্ড খাঁটি সোনার বিনিময়ে। স্থানীয়রা এত আনন্দিত হয়েছিল যে, প্রত্যেকে একটি করে মিনি বিড়াল পেতে চেয়েছিল। তবে সব দেশে বিড়ালের দাম এত উঁচু ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ৯৩৬ সালে সাউথ ওয়েলসের রাজা হাইওয়েল ডা (Hywel Daa) নির্দেশ দেন, কেউ যদি বিড়াল হত্যা বা চুরি করে, তবে তাকে সমপরিমাণ শস্য দিয়ে জরিমানা দিতে হবে। তিনি আরও ঘোষণা দেন, বিড়ালকে ঘরে আদর করে রাখার দরকার নেই; তাদের প্রধান কাজ হলো ইঁদুর ধ্বংস করা।
মিনি ঘরে পোষা বিড়ালের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তারা আরামে থাকার সময় ‘গর্গর্’ আওয়াজ করতে পারে। বড় বাঘ বা সিংহরা যেমন গম্ভীর গলায় গর্জন করে, কিন্তু মিনি বিড়ালের মতো কোমল ও মধুর গর্গর্ আওয়াজ করতে পারে না। এ কারণেই ঘরের ছোট বিড়ালদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
প্রাচীন ইতিহাসের এই দৃষ্টান্তগুলো থেকে বোঝা যায়, বিড়ালের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান। মিশরের শহর রক্ষা হোক বা জাপানের খাঁচা থেকে মুক্তি পাওয়া, বিড়ালকে পোষা ও শ্রদ্ধার চর্চা আজও কোটি কোটি মানুষের ঘরে ঘরে বহাল রয়েছে। এভাবে প্রাচীনকালের এই মূল্যবোধ আজও আধুনিক সমাজে প্রভাব ফেলেছে, যেখানে বিড়াল কেবল পোষা প্রাণী নয়, বরং মানুষের জীবনের অংশ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

