স্বপ্ন, সংশয় আর সম্ভাবনার বাংলাদেশি তরুণ
বাংলাদেশ জনপদে এখন সবচেয়ে বড় ঢেউ উঠেছে তরুণদের। ১৭ কোটির এ দেশে প্রায় সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষই তরুণ— অর্থাৎ ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০% সরাসরি এই বয়স শ্রেণিতে, আর পরোক্ষভাবে যুবক আর কিশোর মিলিয়ে অর্ধেকের বেশি মানুষই জীবনের শুরু কিংবা মধ্যগগনে। এটি এক বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, অর্থাৎ তাদের উৎপাদনশীলতায় লাগাতে পারলে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে দ্রুত এগোতে পারে।
এ যেন এক সুবিশাল তারুন্যের জোয়ার— তরুণরা ছুটছে, হাসছে, স্বপ্ন আঁকছে। রোদে-ঘামে ভিজে তারা ছুটছে শিক্ষাঙ্গনের পথে, পেশার গণ্ডিতে, কখনো উদ্যোক্তার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রাত জাগছে। কেউ কাগজ-কলমে, কেউ মুঠোফোনের পর্দায় খুঁজছে দুনিয়ার খবর।
কিন্তু এই তারুণ্য থাকবেনা। যেহেতু স্বাধীনতার পর ৪০ বছরে দেশে জনসংখ্যার বিষ্ফোণ ঘটেছে সেজন্য এখন তারুন্যের সমাবেশ। এটা প্রত্যাশিত ছিল। তারপর পর যেহেতু জন্মহার কমে গেছে সূতরাং তারুন্যের এই জোয়ারেও ভাটা পড়বে। সেটা ভিন্ন প্রশ্ন আজকের তরুনদের শক্তি ও দূর্বলতা নিয়ে আজকের লেখা।
শিক্ষার পাঠ
আজকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত, অনেক বেশি সচেতন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঞ্চে, কলেজের বারান্দায়, অথবা গ্রামের স্কুলঘরের মাটির মেঝেতে তারা একই স্বপ্নে ভিজে। তবে এখানেই ফাটলও আছে। শহর আর গ্রামের মধ্যে বিশাল ব্যবধান— শিক্ষার মান, সুযোগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা— সবক্ষেত্রে।
তরুণদের অনেকেই এখন ইংরেজি শিখছে, কম্পিউটার চালানো শিখছে, ডিজিটাল মার্কেটিং থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং পর্যন্ত হাজারো দক্ষতা আয়ত্বে আনতে চায়। কিন্তু সেই সাথে আছে বিশাল এক অংশ যারা এখনো ঠিকমতো বাংলা পড়তেও হিমশিম খায়।
আবার যারা প্রযুক্তি শিখছে তারা খুব প্রাথমিক প্রযুক্তি নিয়ে লাফাচ্ছে। পৃথিবী সেখানে নেই। যেমন অন্যদেশের তরুনরা প্রোগ্রাম বানায় সেটা আমরা অপারেট করি, বিশ্বের তরুনরা গেম বানায় আমাদের তরুনরা খেলে, অন্য তরুনরা এআই টুল বানায় আর আমাদের ছেলেরা কেবল ব্যবহার শিখে।
অভ্যাস আর অভিসার
বাংলাদেশের তরুণেরা যেমন সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায় বুঁদ, তেমনি তারা রাজনৈতিক আড্ডা, ক্রিকেট অথবা গান-ছবিতেও মশগুল। মেসেঞ্জার, টিকটক, ইউটিউব— এ যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এসবের আড়ালে ছড়িয়ে আছে সাহিত্যপাঠের ক্ষুধাও; কেউ কেউ সেকেলে গল্প-উপন্যাসের পাতায় ডুব দেয়, কেউ আবার কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে।
কিন্তু দক্ষতা সেটা কারিগরি হোক আর সফ্ট হোক সেখানে তাদেরকে দেখা যায়না। আমাদের তরুনরা বিদেশে যায় শ্রমিক হতে আর কুলিগিরি করে খেতে। ৫৫ বছরেও আমরা এটা বদলাতে পারিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেও শিল্পের প্রয়োজনমাফিক দক্ষতা অনেকের নেই।
তাদের জীবনের সমস্যাগুলোও যেন রঙিন কিন্তু কাঁটার মতো। বাংলাদেশের মোট বেকার জনশক্তির সিংহভাগই এই তরুণরা। শিক্ষার পর চাকরি নেই, কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতা কেবল হতাশাই বাড়াচ্ছে।
মাদক নামে এক নীরব শত্রু। শহর থেকে গ্রাম, সবখানেই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ছড়িয়ে আছে ভয়াবহভাবে। এতে করে মানসিক স্বাস্থ্য— স্বপ্নভঙ্গ, চাকরি না পাওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা— এসব কাঁধে চাপিয়ে অনেকেই অবসাদে ডুবে যাচ্ছে।
কর্মক্ষেত্রে তরুণ
তবুও দেশের গার্মেন্টস থেকে শুরু করে ব্যাংক, এনজিও, তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, এমনকি কৃষি— সর্বত্র তরুণরাই মুখ্য চালিকাশক্তি। ই-কমার্স, স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ইউটিউব, ফেসবুক মার্কেটিং— নতুন প্রজন্মের হাতে এগুলো অনেকটা খেলনার মতো সহজ। বিদেশেও বাংলাদেশি তরুণরা শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রফেশনাল— প্রবাসের মাটিতে ঘাম ঝরাচ্ছে, রেমিটেন্সে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। কিন্তু তাদের যা সক্ষমতা আছে দক্ষতায় না থাকায় তার ৯০% বিফলে যাচ্ছে বলে আমার ধারণা।
তরুনদের শক্তির দিক:
১. তারা আগ্রহী ও বিদ্যুৎসাহী
বাংলাদেশের তরুনরা স্বপ্ন দেখে। তারা নতুন করতে চায়। বাংলাদেশে যখনি যা কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তা কেবল তরুনদের কারণে আছে। তারা স্বপ্ন বিলাসী। কিন্তু তাদের পথ দেখানোর কেউ নেই। না তাদের সামনে কোনো ভাল নেতৃত্ব, না গাইড লাইন, না কোনো রোল মডেল। তবে অবাধ তথ্যের এই পৃথিবীতে যারা সত্যিকার অনুসন্ধানী তারা ঠিকই পথ খুজে নেবে।
২. সহজে প্রযুক্তি গ্রহণ
বাংলাদেশের তরুণেরা প্রযুক্তি-দক্ষ না হলেও তারা প্রযুক্তি গ্রহণ করে সহজে। তারা মোবাইল, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল পেমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং— সবই খুব দ্রুত শিখছে ও কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু উচ্চতর দক্ষতায় পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের সংখ্যানুপাতে সাফল্য নেই।
৩. পরিশ্রমী ও অভিযোজনক্ষম
কর্মঠতা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের তরুণদের উল্লেখযোগ্য গুণ। প্রবাসে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিটেন্স আনে। কিন্তু দেশে কর্ম পরিবেশ তাদেরকে বিভ্রান্ত করে। কারণ নানারকম পলিটিক্স সব জায়গায়। এতে কিছু তরুন নিজেরা ব্যাড পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে, কিছু তরুন তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাকী এই অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে পড়ে।
৪. সৃজনশীলতা ও স্বপ্নদ্রষ্টা মন
তারা গান, কবিতা, নাটক, শর্ট ফিল্ম, ইউটিউব কনটেন্ট— কত কী করছে! উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ই-কমার্স, এগ্রো-প্রডাক্টস, ফুড ডেলিভারি, টেক স্টার্টআপ— এসব তরুণরাই এগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু অস্থিরতা, লেগে না থাকার মানসিকতা, জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে না পারা ইত্যাদি কারণে তাদের সফলতা হার খুব কম।
বাংলাদেশের তারুণ্যের দুর্বলতা (Weakness)
১. দক্ষতার ঘাটতি
প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেও হাতে-কলমে বা প্র্যাকটিক্যাল দক্ষতা (স্কিল) অনেকের নেই। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, অ্যাডভান্সড ডিজাইন, প্রফেশনাল কমিউনিকেশন, লিডারশিপ, এমনকি সাধারণ প্রেজেন্টেশন স্কিল— সবখানেই ঘাটতি। যে পরিমাণ ট্রেনিং একাডেমি আর ছাত্র। কিন্তু নিয়োগ কর্তারা দক্ষ লোক পান না।
২. বেকারত্বের অভিশাপ
বিশাল এই যুবশক্তির বড় অংশ চাকরির জন্য অপেক্ষমাণ। প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু শিল্প ও চাকরির বাজার সেই তুলনায় তৈরি নয়। একদিকে বাংলাদেশের তরুনরা বিদেশে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করে আর ৪ ডিজিটের বেতন পায় অন্যদিকে বিদেশে দক্ষ তরুনরা বাংলাদেশে এসে ৭ ডিজিটের স্যালারি নিয়ে যায়। ফলে হতাশা, হতাশা থেকে মাদক, অপরাধ, বা অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য ও স্থিরচিন্তার অভাব
তরুণদের মধ্যে অস্থিরতা, ফাস্ট লাইফের তাড়া, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম জীবন দেখে হীনমন্যতা— এগুলো প্রবল। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তারা কথা বলতেও ভয় পায়। তারা জানে না- কোথায় তাদের গন্তব্য, কি তাদের সমস্যা আর কি সমাধান। তারা শুধু বুঝতে পারে বয়স অনুযায়ী যেখানে থাকার কথা সেখানে তারা নেই।
৪. নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়
দ্রুত সফলতা, দ্রুত টাকা কামানোর প্রবণতা থেকে জালিয়াতি, প্রতারণা, অনলাইন স্ক্যাম, মাদকের দিকে ঝুঁকে যাওয়া কম নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে অনেকেই দলাদলিতে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের প্রকৃত বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চারদিকে দূর্নীতি তাদেরকে খারাপ বার্তা দিচ্ছে।
বিশেষ বাংলাদেশে প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামোতে ১০০ টাকা আয় করা যতটা কঠিন ১শ কোটি টাকা চুরি তার চেয়ে অনেক সহজ। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণী আর পথভ্রষ্ট হয়েছে।
ভবিষ্যৎ— রোদেলা না মেঘলা?
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণদের হাতেই। যদি তাদের শিক্ষা দেওয়া যায় যুগোপযোগী, যদি তাদের হাতে দক্ষতার সরঞ্জাম দেওয়া যায়, যদি নৈতিকতার পাঠ দেওয়া যায়— তবে এরা কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্ব জয় করতে পারে।
তাদের চোখের তারায় লুকোনো যে স্বপ্ন, তা ঠিকমতো লালন করতে পারলে একদিন এ দেশ সত্যিই হবে ‘সোনার বাংলা’। আর যদি তাদের অবহেলা করা হয়, তাহলে এই বিশাল যুবসমাজ হতে পারে ভয়ানক চাপ, এমনকি অস্থিরতারও কারণ।
এই সমস্যার উত্তরণ নিয়ে লিখছি- শীঘ্র আসছে।
লেখা- জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: লেখক

