অর্থ সঞ্চয়ের কৌশল
আমরা অনেকেই মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নানা খরচে অর্থ ব্যয় করে ফেলি, আর মাস শেষে টের পাই—সঞ্চয়ের জন্য কিছুই থাকেনি। অথচ সঞ্চয় শুধু ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নয়, এটি একটি জীবনের অভ্যাস। সঞ্চয় আপনাকে স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে, আর্থিক সংকটে রক্ষা করে, এমনকি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। নিচে কিছু কার্যকর অর্থ সঞ্চয়ের কৌশল তুলে ধরা হলো, যেগুলো একটু ধৈর্য আর নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে যে কেউ প্রয়োগ করতে পারেন। চলুন সঞ্চরে কিছু কৌশল জেনে নিই। এই লেখার একটি কৌশলও আপনার জন্য নতুন মনে মনে না হলেও। ৫ মিনিট ধরে আপনি যখন লেখাটা পড়বেন। তখন সঞ্চয়ের আপনার মনে কিছুটা হলে গেঁথে যাবে।
১. আয় ও ব্যয়ের তালিকা তৈরি করুন
সঞ্চয়ের প্রথম ধাপ হলো আপনার আয় ও ব্যয়ের পূর্ণ চিত্র জানা। মাসে কত টাকা আয় করেন এবং কোন কোন খাতে খরচ হয়—এসব লিখে ফেলুন। খরচের খাতগুলো বিশ্লেষণ করুন। আপনি অবাক হবেন—কত অপ্রয়োজনীয় খরচ হয় মাসে! সে খরচ গুলো করার সময় সতর্ক থাকুন।
২. প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ আলাদা করুন
প্রয়োজনীয় খরচ যেমন—বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি, বাজার খরচ—এইসব চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বারবার রেস্টুরেন্টে খাওয়া, প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটা, সাবস্ক্রিপশন সার্ভিসে টাকা ব্যয়—এসব কমিয়ে আনলে সঞ্চয়ের পথ সহজ হয়। যদি নেহায়েত অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে না পারেন। তাহলে এসবের জন্য বরাদ্ধ রাখুন। এবং সে বরাদ্ধ যেন ছাড়িয়ে না যায় সেটা খেয়াল করুন। কোনো কারণে এই মাসে বেশী খরচ করলে পরের মাসে সেটি সমন্বয় করুন।
৩. ৫০-৩০-২০ নিয়ম অনুসরণ করুন
এই জনপ্রিয় নিয়ম অনুযায়ী:
-
৫০% ব্যয় হবে প্রয়োজনীয় খাতেঅ যেমনবাসা ভাড়া, খাবার, ফল, বিস্কুট, নাস্তা, দুধ, ডিম ও ঔষধ-চিকিৎসা সব মিলিয়ে।, এর মধ্যে ২৫% বাসা ভাড়া। হয়তো আপনি যা আয় করেন তার ২৫% হারে বাসা খুজে নিবেন। অথবা বাসা ভাড়া যা দেন সে অনুপাতে ২৫% আয় বৃদ্ধি করবেন। খাবার ঔষধ অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। তবে খাবার খরচ ২০% মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে ভাল। এখানে ৫% ব্যক্তিগত খরচের জন্য রাখতে হবে। যেমন কোথাও যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা। আর যদি সম্ভব না হয়। এই খরচের খাতটাই বাদ দিতে হবে।
-
৩০% খরচ হতে পারে জীবনযাপনের মান বজায় রাখতে (বিনোদন, পোশাক)। বাংলাদেশের জন্য এই নিয়মকে কিছুটা কাস্টমাইজ করতে হবে। বিশেষ করে যারা বড় শহরগুলোতে থাকেন। আপনাদের লিভিং খরচ কাপড় ছোপড়, জামা, জুদা, কসমেটিক্স ছাড়াও আরো একটি বাড়তি খরচ আছে। সেটা হলো বাসায় আত্মীয় স্বজন বেড়াতে আসে। নিজেরা সবজী খিচুড়ি খেলেও মেহমান আসলে মাছ-গোছ রাঁধতে হয়। তাই অন্তত ৫% বা ১০% এই খাতে বরাদ্ধ রাখতে হবে। যদি আপনি ছোট একটি বাসা নেন। যেখানে থাকার কোনো জায়গা নেই। হয়তো আপনি মেহমান আসা কমাতে পারবেন। কিন্তু কখনো কখনো আপনাকেউ কারো বাসায় মেহমান হয়ে যেতে হবে। আজকাল কারো বাসায় গেলেও কম খরচ হয় না। সূতরাং এই খরচটি হেসেব করতে হবে।
-
২০% অবশ্যই সঞ্চয়ের জন্য নির্ধারণ করুন। এভাবে প্রতিমাসেই সঞ্চয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট অংশ রাখা সম্ভব হবে।
৪. স্বয়ংক্রিয় সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করুন
আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এমন একটি ফিচার চালু করুন, যেখানে প্রতিবার বেতন ঢুকলেই নির্দিষ্ট একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। এতে সঞ্চয় বাধ্যতামূলক হবে এবং খরচের আগে টাকা আলাদা হয়ে যাবে। এখন প্রায় সব ব্যাংকে এমনটা করা যায়। আপনার সঞ্চয়ী হিসাব বা স্যালারি হিসাবের সাথে ডিপিএস এমনভাবে যুক্ত থাকবে। প্রতিমাসে টাকা ডিপিএসে গিয়ে জমা হবে।
৫. জরুরি তহবিল গঠন করুন
অপ্রত্যাশিত খরচ যেমন—হাসপাতালে ভর্তি, চাকরি হারানো ইত্যাদি মোকাবেলায় একটি “জরুরি তহবিল” গঠন করুন। কমপক্ষে ৩ থেকে ৬ মাসের খরচের সমপরিমাণ টাকা জমিয়ে রাখুন। এই টাকা কখনো খরচ করবেন না। কারণ আপনি প্রয়োজনের সময় কারো কাছে সহযোগিতা নাও পেতে পারেন।
৬. লক্ষ্যভিত্তিক সঞ্চয় পরিকল্পনা করুন
কেন সঞ্চয় করবেন তা নির্ধারণ করুন—বাসা কেনা, উচ্চশিক্ষা, ভ্রমণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, ব্যবসা শুরু ইত্যাদি। লক্ষ্য থাকলে সঞ্চয়ের জন্য আপনি আরও উৎসাহী থাকবেন।
৭. অল্প অল্প করে সঞ্চয় করুন, কিন্তু নিয়মিত করুন
সঞ্চয় বড় অঙ্কের না হলেও ক্ষতি নেই। প্রতিদিন মাত্র ৫০ টাকা জমালেও মাসে তা হয় ১৫০০ টাকা। বছরে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। ছোট অঙ্কও দীর্ঘমেয়াদে বড় হয়।
৮. বাজেট বানান ও তা মেনে চলুন
আপনার আয়ের ভিত্তিতে মাসিক একটি বাজেট তৈরি করুন। যেখানে সঞ্চয়ের অগ্রাধিকার থাকবে। খরচের সময় বারবার বাজেট দেখে নিন—আপনি অতিক্রম করছেন কিনা।
৯. ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সতর্কতা
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আপনি আসল খরচের গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারেন না। তাই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা হয় বেশি। সম্ভব হলে নগদ অর্থ ব্যবহার করুন অথবা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করুন।
১০. অতিরিক্ত আয় বা পার্শ্ব আয় গড়ে তুলুন
ফ্রিল্যান্সিং, টিউশন, অনলাইন ব্যবসা, ব্লগিং বা ইউটিউব—যেকোনো পার্শ্ব আয় গড়ে তুলুন। অতিরিক্ত আয়ের টাকা পুরোটা সঞ্চয় করার চেষ্টা করুন।
১১. বাড়তি ও বিকল্প আয়ের উৎস রাখুন
কখনো নিজের একটা স্কিল এর উপর থাকবেন না। এবং কখনো একটিমাত্র আয়ের উৎসের উপর ভরসা করবেন না। অবশ্যই পার্শ্ব আয় বা সাইড ইনকাম রাখুন। চাকরীর পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করুন বা অনলাইনে কোনো ব্যবসা করুন। মূল ব্যবসার পাশাপাশি কনসালটেন্সি করুন। এভাবে বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করুন।
১২. ভ্রমণ তহবিল আলাদা করুন
কখনো মূল আয় বা নিজের মুল জমানো টাকা দিয়ে ভ্রমণ করবেন না। বাড়তি কিছু করুন। সেখানে বাড়তি আয় থাকলে তা দিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন। অথবা যেখানে খরচের জন্য মাসে যতটাকা বরাদ্ধ রেখেছেন। সেখান থেকে কিছু কিছু সেভ করে আলাদা করে জমিয়ে রাখুন। ৬ মাস বা ১ বছরের টাকা দিয়ে ভ্রমণ করুন।
সঞ্চয় শুধু বড়লোকদের কাজ নয়। যে যত অল্পই আয় করেন না কেন, একটু পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও সচেতনতা থাকলে সবাই সঞ্চয় করতে পারেন। আজকে শুরু করুন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি হয়ে উঠবে আপনার ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ভিত্তি।

