ঢাকায় বাড়ি বা প্লট কিনতে সতর্ক থাকবেন যেসব বিষয়ে

ঢাকায় বাড়ি বা প্লট কিনতে সতর্ক থাকবেন যেসব বিষয়ে

ঢাকায় বাড়ি বা প্লট কিনতে সতর্ক থাকবেন যেসব বিষয়ে

ঢাকা শহর এক জাদুর শহর। এখানে নানা সমস্যা তবুও সারাদেশ থেকে বানের জলের মতো মানুষ আসতে থাকে সারা বছর। আবার যারা অনেক বছর ধরে থাকে তারাও পারতপক্ষে ছাড়তে চায় না। ঢাকা তারাই ছাড়ে যারা বিদেশে উন্নত জীবনের সন্ধান পায়। তবে সাম্প্রতিক কালে গ্রামে যাওয়ার প্রবণতাও শুরু হয়েছে। কারণ ঢাকায় আবাসন এতটা ব্যয়বহুল হয়েছে যে, ৬ সংখ্যার বেতন পেয়েও সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ঢাকার কোনো একটা কোনায় একটা প্লাট কেনা সম্ভব নয়। তবুও যারা গ্রামের সম্পদ বিক্রি করে বা অন্য কোনো ভাবে আয় বাড়িয়ে শেষতক কোনো স্বপ্ন দেখেন। সে স্বপ্ন বেচে খাওয়ার জন্য হাজারো বাটপার বসে আছে।

হাইজিং খাতে প্রচুর প্রতারণা হয়। এগুলো খুব কম প্রকাশ ও অভিযোগ হয়। কারণ প্রথমত, মানুষ চিন্তা করে যা ঠকার ঠকেছি এখন টাকাটা ফেরত পেলে বা কিছু টাকা উদ্ধার করতে পারলে বা বেচে দিয়ে নিস্তার পেলে হয়।

দ্বিতীয়ত: অনেকে সারাজীবনের সঞ্চয় কেউ কেউ আবার অজ্ঞাত আয় দিয়ে এসব কেনেন। তখন তারা চাননা যে বিষয়টি আত্মীয় স্বজন বা সরকারী কতৃপক্ষ জানুক। তখন তারা বিষয়টি গোপন রাখতে চান।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশে আইনের শাসন না থাকার কারণে। আইন আদালত করে মানুষ পাওনা অর্থ পায়না বরং আরো সময় নষ্ট, হয়রানি এবং টাকা নষ্ট হয়। তাই আগে উচিৎ হলো সতর্ক থেকে কাজ করা।

আবাসন একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ, বিশেষত যখন দাম ও মানের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হয়। ভুল তথ্য, অতিরিক্ত দাম বা অবৈধ জমির ঝুঁকি এড়াতে কিছু সতর্কতা ও কৌশল জানা জরুরি। এই গাইডে ঢাকায় সঠিক দামে প্লট ও ফ্ল্যাট কিনতে বা ভাড়া নিতে যা করতে হবে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. লক্ষ্য ও বাজেট নির্ধারণ

  • প্রয়োজন স্পষ্ট করুন: ফ্ল্যাট নাকি প্লট? বাণিজ্যিক নাকি আবাসিক উদ্দেশ্যে?

  • বাজেট ঠিক করুন: ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দামের তারতম্য বিশ্লেষণ করুন (যেমন: উত্তরা, মিরপুর, বসুন্ধরা, ডিএনসিসি এলাকা)।

  • অতিরিক্ত খরচ: রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স, এজেন্ট ফি ইত্যাদি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করুন।

২. এলাকা নির্বাচন

ঢাকার কিছু জনপ্রিয় আবাসিক এলাকা ও তাদের গড় দাম (২০২৪ অনুযায়ী):

এলাকা প্লট (প্রতি কাঠা) ফ্ল্যাট (প্রতি sq ft)
উত্তরা ১-৩ কোটি ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা
মিরপুর ৫০ লাখ-২ কোটি ১০,০০০-১৮,০০০ টাকা
বসুন্ধরা ২-৫ কোটি ২০,০০০-৩৫,০০০ টাকা
পুরান ঢাকা ২-৪ কোটি ১২,০০০-২০,০০০ টাকা

এলাকা নির্বাচনের টিপস:

  • যোগাযোগ সুবিধা: মেট্রো/বাস রুটের নিকটবর্তী স্থান প্রাধান্য দিন।

  • সুরক্ষা: নিম্ন অপরাধ率 এলাকা বাছুন।

  • ভবিষ্যৎ উন্নয়ন: এলাকায় নতুন প্রকল্প (যেমন: মেট্রো রেল, ফ্লাইওভার) আছে কি না খুঁজে দেখুন।

৩. বিক্রেতা/বিল্ডার যাচাই

  • বিল্ডারের রেপুটেশন: রিয়েল এস্টেট Developers Association of Bangladesh (REHAB)-এর সদস্য কি না দেখুন।

  • অন্যান্য প্রকল্প: বিক্রেতার পূর্ববর্তী প্রকল্পের মান ও ডেলিভারি সময় যাচাই করুন।

  • রেফারেন্স: পূর্ববর্তী ক্রেতাদের থেকে মতামত নিন।

৪. লিগ্যাল যাচাই

  • দলিল পরীক্ষা: জমির মালিকানা, খতিয়ান, মিউটেশন, নকশা (ম্যাপ) সঠিক কি না ল্যান্ড সার্ভে অফিসে চেক করুন।

  • অনুমতি: RAJUK, সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে কি না দেখুন।

  • বকেয়া ট্যাক্স: সম্পত্তির উপর কোনো বকেয়া খাজনা বা ট্যাক্স আছে কি না নিশ্চিত হোন।

৫. দরদাম ও অর্থপ্রদান

  • মার্কেট রিসার্চ: একই এলাকার অন্যান্য সম্পত্তির দামের সাথে তুলনা করুন।

  • কিস্তির সুযোগ: বিল্ডার বা ব্যাংকের সাথে কিস্তি পরিকল্পনা নেগোসিয়েট করুন।

  • লেনদেনের স্বচ্ছতা: সকল লেনদেন ব্যাংক চেক/ডিমান্ড ড্রাফ্টের মাধ্যমে করুন।

৬. এজেন্ট/ব্রোকার নির্বাচন

  • লাইসেন্স: বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (BREB)-এর অনুমোদিত এজেন্ট বাছুন।

  • কমিশন: আগে থেকে কমিশনের হার ঠিক করুন (সাধারণত ১-২%)।

৭. ভুল এড়াতে যা করবেন না

  • জরুরি বিক্রির প্রলোভন: “আজই কিনুন, বিশেষ ছাড়!”—এমন অফার সন্দেহের চোখে দেখুন।

  • অনলাইন স্ক্যাম: অপরিচিত ওয়েবসাইট বা সোশ্যাল মিডিয়া অফার এড়িয়ে সরাসরি বিক্রেতার সাথে যোগাযোগ করুন।

  • মৌখিক চুক্তি: সব শর্ত লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করুন।

৮. বিকল্প উপায়

  • ব্যাংকের REO (Real Estate Owned): ব্যাংক থেকে বাজেটে জব্দ সম্পত্তি কিনতে পারেন।

  • সরকারি প্রকল্প: ঢাকা সাউথ সিটি বা আশকোনার মতো সরকারি আবাসন স্কিমে আবেদন করুন।

শেষ কথা

 ঢাকার ৭০-৮০% মানুষ অন্যের বাড়ি/ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকে (সূত্র: বিশ্বব্যাংক, ২০২২)। প্রায় ৫-৭ লক্ষ মানুষ ফুটপাত, খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বাস করে (সূত্র: ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ২০২১) ঢাকায় বছরে ১৫,০০০-২০,০০০ পরিবার নতুন করে ফ্ল্যাট/বাড়ির মালিক হয় (সূত্র: REHAB, ২০২৩)। এবং বছরে ১০,০০০-১২,০০০ পরিবার উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণের দায় বা জবরদখলের কারণে নিজেদের আবাসন হারায় (সূত্র: Ain o Salish Kendra, ২০২২)।

ঢাকায় সঠিক দামে সঠিক আবাসন পেতে ধৈর্য্য, গবেষণা ও যাচাই-বাছাই জরুরি। লিগ্যাল ডকুমেন্টেশন, বিক্রেতার বিশ্বস্ততা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

সতর্কতা: কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রিয়েল এস্টেট আইনজীবী বা পরামর্শকের সহায়তা নিন।

ছবি: আলআমিন মীর ইন্টারনেট

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply