social, Awareness, Group Activities,

তারুন্যকে কাজে লাগাতে চাই সঠিত পরিকল্পনা

 বাংলাদেশের তরুণদের বর্তমান প্রধান সমস্যাসমূহ ও সমাধান

বর্তমান তরুণেরা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিসচেতন ও তথ্যভিত্তিক। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতায় তারা এখন বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত। হাজার হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, ইউটিউবিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিংবা ই-কমার্সে যুক্ত হয়ে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করছে। দেশের ই-গভর্নেন্স এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তরুণদের অংশগ্রহণই প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে উঠছে।

১. বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব

  • প্রতিবছর উচ্চশিক্ষিত লাখ লাখ তরুণ গ্র্যাজুয়েট হচ্ছেন, কিন্তু চাকরি পাচ্ছেন না। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশী।
  • যে পরিমাণ বেকার রয়েছে তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশী রয়েছে ছদ্মবেশি বেকার। যারা কোনো একটা কিছু করে শুধু সার্ভাইভ করছে।
  • বিদেশে যাওয়ার সুযোগ সীমিত, কারণ নিজের যোগ্যতাও সীমিত, রয়েছে কান্ট্রি ব্রান্ডিং সমস্যা এবং নানা রকম জটিলতা ও বাড়তি খরচ গোনার সমস্যা।
  • দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পট পরিবর্তনে সংকটের মধ্যে রয়েছে বিশাল তরুন সংখ্যা।
  • বিভিন্ন দেশের ভিসা বন্ধ ও জটিলতায় আটকে আছে লাখো তরুনের ভাগ্য।

 

২. অদক্ষতা বা স্কিল গ্যাপ

  • বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত অনেকেই চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় প্র্যাকটিক্যাল স্কিল জানেন না।
  • প্রায় ৯০% শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। ৭০% শিক্ষার সাথে কাজের সম্পর্ক নেই।
  • শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবমূখী ও সময় উপযোগী নয়। তরুনরা জানে না তারা আসলে কি জানে না।
  • দেশে বা বিদেশে কি ধরনের দক্ষ জনশক্তি দরকার। তরুনেরা সেভাবে গড়ে উঠছেনা।

 

৩. মানসিক স্বাস্থ্য ও হতাশা

  • চাকরি না পাওয়া, সামাজিক চাপ, প্রেম-বিচ্ছেদ, পরিবারে বোঝাপড়ার ঘাটতি থেকে হতাশা বাড়ছে।
  • আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
  • দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা ৯০ভাগ তরুনের তারা দেশের জন্য কিছু করার কথাও ভাবছেনা।
  • ক্রমাগত ব্যর্থতা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুনেরা বিদেশী গিয়ে শ্রমিকের কাজ করছে।

 

৪. ডিজিটাল আসক্তি ও অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টে সময় নষ্ট

  • ফেসবুক, ইউটিউব, গেমিং, টিকটকে অতিরিক্ত সময়
  • ফলস্বরূপ মনোযোগহীনতা, মেধার অপচয়
  • তরুনদের সামনে কোনো রোল মডেল নেই তাদের তাদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য
  • নিজের লক্ষ্য এবং লক্ষ্যের প্রতি আস্থা ও একাগ্রতা না থাকায় তরুনেরা মোবাইলে সময় নষ্ট করছে।

 

৫. উদ্যোক্তা হওয়ার ঝুঁকি নিতে না চাওয়া বা সাপোর্ট না থাকা

  • অধিকাংশ তরুণ চাকরির পেছনে ছুটছে তাদের উদ্যোক্তা মনোভাব গড়ে উঠেনি।।
  • পরিবার ও সমাজের উদ্যোক্তা বিরোধী মনোভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থা চাকরির মানসিকতা সৃষ্টি করে।
  • উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য দেশের নীতি-পলিসি অনুকূলে নয়।
  •  এখানে সৃজনশীল কাজের জন্য প্রণোদনা, বিনিয়োগ ও ঋণ পাওয়া সহজ নয়।
  • সরকারী নীতিগুলো পুরনো, সহজে পরিবর্তন হয়না, ধাপে ধাপে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও শুভংকরের ফাঁকি।

 

৬. মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাং কালচার

  • শহর ও গ্রামে মাদকের বিস্তার যা পাশ্ববর্তী দেশ থেকে অবাধে প্রবেশাধিকার পায়।
  • সন্ত্রাস-ভিত্তিক চক্রে জড়িয়ে পড়া এবং বাহুবলের রাজনীতি চর্চা।
  • জীবনে বড়ো ও মহৎ লক্ষ্য না থাকায় সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পথভ্রষ্ট হওয়া।
  • অনেক পিতারা প্রবাসে থাকেন বলে সন্তানের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন না।

 

৭. পর্যাপ্ত তথ্য ও গাইডেন্সের অভাব

  • ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণের তথ্য অপ্রতুল
  • ‘কে কীভাবে কোথায় যাবে’ – এটা জানে না অনেকেই
  • ছাত্র জীবনের প্রথম দিকে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করার জন্য তারা কোনো দিক নির্দেশনা পায়না
  • পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষায় ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত। যাতে সেটা সামাজিক মর্যাদা বাড়ায়। কিন্তু সে শিক্ষাটা তাদের জীবনে আদৌ কোনো কাজে লাগবে কিনা তা নিয়ে তারা ভাবিত নয়।

 

বাংলাদেশের তারুণ্যকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কৌশলসমূহ

১.  নতুন কর্মসংস্থান ও তার ক্ষেত্র তৈরী করা

  • বিদ্যমান নীতিকে সময়োপযোগী করে Skilled Bangladesh Vision 2035 বাস্তবায়ন
  • জাতীয় যুব কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়ন করা ও সংশোধন করা
  • এসএমই খাতে পুঁজিপ্রবাহ সহজ, সচল গতিশীল করা।
  • প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা
  • দেশের কিছু পেশাকে স্বীকৃতি, নিবন্ধন ও কর-আওতাভূক্ত করা।

 

২.  নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোগে পৃষ্টপোষকতা করা

  • যেখানে তরুণরা আইডিয়া, প্রজেক্ট ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে পারবে
  • জেলা-উপজেলা ভিত্তিক “ইয়ুথ ইনোভেশন সেন্টার” গঠন। প্রয়োজনে ডিজিটাল ইনকিউভবেশণ সেন্টারগুলোকে ইনোভেশন সেন্টারে রুপদান করা।
  • বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা কোর্স বাধ্যতামূলক
  • স্টার্টআপের জন্য মিনিমাম মাইক্রো ফান্ড, কর রেয়াত করা।
  • স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালীকরণ

 

৩.  প্রান্তিক জনবলকে কাজে লাগানো

  • ফ্রিল্যান্সিং, BPO, ও রিমোট জব হাব তৈরী
  • নারীদের জন্য ডিজিটাল ঘরোয়া কর্মসংস্থানের সুযোগ
  • গ্রামভিত্তিক ডিজিটাল কর্মসংস্থান তৈরী করা
  • অংশীদারী ভিত্তিতে কৃষির সাথে প্রযুক্তির সংযোগ করা।

 

  • ৪.   জীবনের লক্ষ্য ও ক্যারিয়ার পাথ নির্বাচনে যোগ্য করে গড়ে তোলা
  • প্রতি জেলায় বার্ষিক ‘যুব উৎসব’ যেখানে চাকরি, প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা, স্কলারশিপের সুযোগ থাকবে
  • ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং মেলা / ইয়ুথ এক্সপো আয়োজন
  • স্কুল জীবনে লক্ষ্য ঠিক করে কাউন্সেলিং ও মেন্টরশীপ চালু করা।
  • এমনভাবে বিষয় সাজানো যেন তারা শিক্ষাজীবনেই  প্রস্তুতি   নিতে পারে।
  • বিভাগ পরিবর্তনের স্বাধীনতা রাখা, সুযোগ রাখা ও পদ্ধতি সহজ করা।
  • বিদেশী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অনুমোদন করা।
  • প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ গমনের পথ সহজ করা।

 

৫.   স্বীকৃতি ও অনুপ্রেরণা

  • সফল তরুণদের উদাহরণ তৈরি করে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করা
  •  “যুব চ্যাম্পিয়ন” স্বীকৃতি ও অনুপ্রেরণা
  • সকল পেশার সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদান করা।
  • ট্রেড লাইসেন্স আইন সংশোধন ও সহজ করা।
  • ট্রেড এর নাম প্রকার ও ফি সংক্রান্ত বিধান আইন থেকে সরিয়ে বিধিতে আনা।
  • স্থানীয় সরকার আইন যুগোপযোগী  করা
  • সিটি কর্পোরেশন আইনে নতুন ৩০০ ট্রেডকে যুক্ত করা। পরবর্তীতে ট্রেড সংযুক্তিকরণ সহজ করা।

 

৬.   পুঁজি ও বিনিয়োগ সুলভ ও সুগম করা

* নতুন উদ্ভাবনী ও অনলাইন ব্যবসার জন্য ঋণ ও বিনিয়োগ নীতি সহজ করা।

* নারী, ছাত্র, কৃষি, আইটি, গ্রামীণ ও রপ্তানীমুখী পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা।

* ঋণ ও বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসার বয়স বিবেচনা করা।

 

৭.   আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা চক্র তৈরী করা

* উদ্যোক্তা ও পেশাজীবিদের জন্য পেনশন ও বিভিন্ন সেভিং স্কিম ঘোষণা করা

* তাদের জন্য বৃত্তি ও বিশেষ ঋণ  এর ব্যবস্থা করা।

 

৮.   নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা

* বিদেশী বিনিয়োগ বাড়িয়ে কাজের সুযোগ প্রসারিত করা

* নতুন পেশাকে স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা

* সমাজে কিছু অলিখিত পেশাকে শৃংখলিত করা

* এসএমই মাষ্টার প্লান, কৌশলপত্র ও একশন প্লান তৈরী করে ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরী করা।

 

৯.   নূনতম জীবন মান ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা

* প্রতিটি চাকরী ও পেশায় ন্যূনতম পারিশ্রমিক ঠিক করে  দেয়া।

* মানুষের জীবন মান উন্নয়নে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া

 

১০.   খাত ভিত্তিক মানবসম্পদ নীতি শক্তিশালী করা

* বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে খাত-ভিত্তিক মানবসম্পদ নীতি তৈরী ও বাস্তবায়ন করা।

* খাতভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নে গৃহিত কর্মসূচীর সাথে অংশীজনদের যুক্ত করা।

 

 ১১.   কিছু পেশার স্বীকৃতি ও মর্যাদাপূর্ণ পূণবাসন করা

* দালাল, চাঁদাবাজ লাইন, ভূমি অফিসের কপিকার এমন পেশাগুলোর স্বীকৃতি বিধিবদ্ধ করা।

* বিলুপ্তপ্রায় পেশার লোকদের অন্যপেশায় পূণবাসন করা

* নতুন ও আসন্ন পেশাসমূহের জন্য তরুনদের প্রস্তুত করা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?