জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রধান ২০ টি ধর্ম বিশ্বাস

জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রধান ২০ টি ধর্ম বিশ্বাস

বিশ্বের প্রধান ২০টি ধর্ম: ইতিহাস, প্রচলন, অনুসারী সংখ্যা ও মূল বিশ্বাস

আমরা হয়তো ৫ থেকে ৭টা ধর্মকে জানি বা চিনি। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো টিকে আছে। প্রাচীন কিছু ধর্ম আবার বিংশ শতাব্দীতে বিকশিত হওয়া ধর্মমতও রয়েছে। কেমন সে ধর্ম, কতজন অনুসরণ করে? কেন টিকে আছে? তাদের মূল বিশ্বাস কি? সেসব ধর্মের এসব বিষয় নিয়ে এই লেখা।

বিশ্বের  ধর্মসমূহ মানুষের জীবনধারা, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিটি ধর্মের একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস, প্রচলনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, অনুসারী সংখ্যা এবং একটি মৌলিক বিশ্বাস ব্যবস্থা রয়েছে। এই রচনায় জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের প্রধান ২০টি ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

১। খিষ্টধর্ম
খ্রিস্টান ধর্ম ১ম শতাব্দীতে প্রচলন হয়। মূলত এই ধর্ম প্রচার করেন যিশু খ্রিস্ট বা ইসা (আ:)। তার জন্ম থেকে ইসায়ী সাল গণনা শুরু হয়। এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ২.৫ বিলিয়ন। মূল বিশ্বাস হলো – এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, যিশু খ্রিস্ট ঈশ্বরের পুত্র, গ্রন্থ: পবিত্র বাইবেল।

২। ইসলাম
ইসলামের সূচনা ৫ম শতাব্দীতে। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) একে পৃথিবীর মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। বর্তমানে
২.৫ বিলিয়ন মানুষ এই মত অনুসরণ করে। বিশ্বাসের মূলে রয়েছে, একত্ববাদ (তাওহীদ), কোরআন, হাদিস

৩। হিন্দু ধর্ম
এর অন্য নাম সনাতন ধর্ম। সনাতন মানে প্রাচীন। কবে কখন এই মতো প্রচলন শুরু হয় জানা যায়না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিশ্বাসের মিশ্রণ এই ধর্ম। তবে প্রাচীন ঋষিগণ বিভিন্ন সময় এই ধর্মের উৎকর্ষ সাধন করেছেন। এই ধর্মের মূল ভূখন্ড ভারতেই অঞ্চল ভেদে দেবতা, প্রধান দেবতা, বিশ্বাস ও আচারের পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বে এর অনুসারির সংখ্যা: ১.৫ বিলিয়ন
তারা সনাতন ভাবধারা, পুনর্জন্ম, কর্মফল এসবে বিশ্বাস করে। অনেকগুলো গ্রন্থের মধ্যে ১টি হলো বেদ।

৪। বৌদ্ধ ধর্ম
খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এর বিকাশ হয়। গৌতম বুদ্ধ একজন অহিংস সাধক সন্যাসী এর প্রচলন করেন। এই ধর্মে ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকার কারণে একে নাস্তিক্যবাদী ধর্মও বলা হয়। এরা বিশ্বাস করে চার আর্যসত্য, অষ্টাঙ্গিক মার্গ, নির্বাণ। বিশ্বজুড়ে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ এর অনুসরণ করে। এক সময় এর প্রচুর অনুসারী থাকলেও চীন, জাপানের মতো দেশের মানুষের ক্রমশ ধর্মহীন হওয়াতে এর অনুসারীর সংখ্যা কমতে থাকে।

৫। শিখ ধর্ম
১৫শ শতাব্দীতে ভারতে জন্ম নেয়া এই ধর্মীয় মতবাদ মূলত মানবরচিত এবং হিন্দু মুসলিম মতো একটা মিশ্রণ। গুরু নানক এই ধর্মমত চালু করেন। বিশ্বজুড়ে ৩০ মিলিয়ন লোক এই ধর্মে বিশ্বাস করে। তাদের মূলনীতি এক ঈশ্বর, সেবা, কর্মফল।

৬। ইহুদি ধর্ম
আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব মোজেস বা মূসা (আ:) ধর্মে মানুষকে দীক্ষা দেন। বলা হয় আব্রাহাম, মোজেস বা ইব্রাহিম (আ) ও মূসা (আ) এর ধর্ম এটি। বিশ্বে ১৫ মিলিয়ন মানুষ এই ধর্মে বিশ্বাস করে। তারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, তোরাহ, পবিত্র চুক্তি। বর্তমান বিশ্বের ৪টি আসমানি কিতাবধারী ধর্মের ১টি। অন্য ৩টি হলো ইসলাম, খ্রিষ্ট ও

৭। জৈন ধর্ম
আনুমানিক ৬ষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব অব্দে এশিয়ায় এই ধর্মের বিকাশ হয়। মহাবীর নামে একজন সমাজ চিন্তক ধর্ম প্রচার করেন। এদের অনুসারী ৪.৫ মিলিয়ন। তাদের মূল বিশ্বাস হলো- অহিংসা, সত্য, সংযম।

৮। বাহাই ধর্ম
১৯শ শতাব্দীতে বা ইংরেজ আমলে ভারতে এই ধর্ম জন্ম দেন বাহাউল্লাহ এক সংস্কারক। এই ধর্ম মানবরচিত ও বিভিন্ন ধমের্মের মিশ্রণ হিসেবে দেখা হয়। ৭ মিলিয়ন লোক এর অনুসারী রয়েছে। তারা সকল ধর্মের ঐক্য ও মানবতার ঐক্যের কথা বলেন।

৯। তাওবাদ
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে চীনদেশে এর বিকাশ ঘটে। দার্শনিক লাও জু এর প্রচার করেন। বর্তমানে ১২ মিলিয়ন মানুষ এতে বিশ্বাস করে। চীনে একসময় এটি ব্যাপক জনপ্রিয় ধর্ম ছিল। এই ধর্মের দর্শন হলো- প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য, দাও বা পথ।

১০। কনফুসীয় ধর্ম
খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১-৪৭৯ শতাব্দীতে মহান দার্শনিক কনফুসিয়াস এর দর্শনে এই ধর্ম বিকাশ লাভ করে। এখনো ৬ মিলিয়ন মানুষ এটি অনুসরণ করে। শিষ্টাচার, নৈতিকতা, পরিবার এগুলো এই ধর্মের মূল নীতি।

১১। শিন্তো
এটি জাপানের প্রাচীন ধর্ম। কে প্রচলণ করেছেন তা জানা যায়না। বর্তমানে ৪ মিলিয়ন মানুষ এর অনুসরণ করে। প্রকৃতি পূজা, পূর্বপুরুষ পূজা এই ধর্মের মূল বিষয়।

১২। জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্ম
আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব এই ধর্ম পারসিক অঞ্চলে বিকশিত হয়। জরথুস্ত্র মানুষকে এই ধর্মে দীক্ষা দেন। মোট ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ এখনো এই ধর্মে বিশ্বাস করে। সত্য ও মিথ্যার লড়াই, আভেস্তা ইত্যাদি তাদের মূল মন্ত্র।

১৩। আদিবাসী ধর্ম
প্রাগৈতিহাসিক যুগে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে বিভিন্ন দেশে ছোট ছোট আদিবাসী ধর্ম চালু হয়। দেশে দেশে এখনো
৩০০ মিলিয়ন মতো মানুষ এসব ধর্মে বিশ্বাস করে। মূলত প্রকৃতি পূজা, আত্মা বিশ্বাস ও অতীতের মহান মানুষদের পূজা এমনি প্রাণী পূজাও এসব ধর্মে রয়েছে।

১৪। ওয়িকা
বিগত শতক বা ২০শ শতাব্দীতে গেরাল্ড গার্ডনার নামে এক ব্যক্তি এই ধর্ম চালু করেন। কেউ কেউ একে শয়তানের ধর্মও বলে থাকেন। ৮ লাখ অনুসারির প্রকৃতি পূজা ও যাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করেন।

১৫। রাস্তাফারিয়ান ধর্ম
২০শ শতাব্দীতে এটিও মাত্র ১শ বছর আগে চালু হওয়া ধর্ম। লিওনার্ড হাওয়েল নামে ১ ব্যাক্তির মাধ্যমে এই ধর্ম প্রচার করা হয়।
৬ লাখ অনুসারীরা ইথিওপিয়ার রাজা হাইলি সেলাসিকে ঈশ্বর মনে করেন।

১৬। হেলেনিজম
প্রাচীন গ্রিক যুগের ধর্ম। বিভিন্ন গ্রিক দার্শনিক একে উন্নত ও বিকশিত করেছেন। এগুলো বিলুপ্তির পথে হলেও ৫০ হাজারের মতো মানুষ এখনো প্রাচীন গ্রিক দেবতাদের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস করে এবং পূজা করে।

১৭। টেনরিকিও
১৯শ শতাব্দীতে প্রবর্তিত এই ধর্ম উপস্থাপন করেন নাকায়ামা মিকি। এই ধর্মের ২ মিলিয়ন মানুষ মানবতার কল্যাণ, আত্মশুদ্ধিতে বিশ্বাস করে।

১৮। সায়েন্টোলজি
২০শ শতাব্দীর এই মত এল রন হাবার্ড চালু করেন। এর ১ মিলিয়ন অনুসারী আধ্যাত্মিক মুক্তি, সায়েন্টোলজি গ্রন্থ এর উপর বিশ্বাস করে।

১৯ একাঙ্কার
২০শ শতাব্দীতে পল টোয়িচেল এই ধর্মটা রেখে যান । ৫০ হাজার অনুসারী আধ্যাত্মিক মুক্তি, পুনর্জন্ম বিশ্বাস করেন।

মূল বিশ্বাসের ভিত্তি

প্রতিটি ধর্মের বিশ্বাস কিছু নির্দিষ্ট নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

গ্রন্থভিত্তিক ধর্ম: ইসলাম (কোরআন), খ্রিস্টান ধর্ম (বাইবেল), ইহুদি ধর্ম (তোরাহ), হিন্দু ধর্ম (বেদ-উপনিষদ), বৌদ্ধ ধর্ম (ত্রিপিটক)।

দার্শনিক ধর্ম: তাওবাদ, কনফুসীয় ধর্ম, জৈন ধর্ম।

প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক ধর্ম: শিন্তো, আদিবাসী ধর্ম, ওয়িকা।

উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া ছক (২০২৩ সালের জনসংখ্যানুপাতে)

ধর্ম অনুগামী শতাংশ
খ্রিস্টান ২.৪৫ বিলিয়ন ৩১.৫ 
ইসলাম ২.০২৭বিলিয়ন ২৫.৯
ধর্মনিরপেক্ষ []/ধর্মহীন []/অ্যাগনোস্টিক/নাস্তিক ১.২৪৫ বিলিয়ন ১০.৬
বৌদ্ধধর্ম ০.৩০ বিলিয়ন ৪.১
হিন্দুধর্ম ১.২৪০ বিলিয়ন ১৫
চীনা ঐতিহ্যবাহী ধর্ম  ৩০০ মিলিয়ন
 জাতিগত ধর্মসমূহ ৩০৫ মিলিয়ন
আফ্রিকান প্রথাগত ধর্ম ১০২ মিলিয়ন  ১.২
শিখ ধর্ম ৩০ মিলিয়ন ০.৩০
আত্মাবাদ ১৬ মিলিয়ন ০.১৯
ইহুদিবাদ ১৫ মিলিয়ন  ০.১৮
বাহ ৫ মিলিয়ন  ০.০৭
জৈন ধর্ম ৪.২ মিলিয়ন ০.০৫
শিন্টো ৪.১২ মিলিয়ন ০.০৫
কও দাই ৪ মিলিয়ন ০.০৫
জুরোস্ট্রিয়ানিজম ২.৬ মিলিয়ন ০.০৩
টেনরিকো ২ মিলিয়ন ০.০২
অ্যানিমিজম ১.৯ মিলিয়ন ০.০২
নব্য-পৌত্তলিকতা ১ মিলিয়ন ০.০১
ইউনিটরিটিভ ইউনিভার্সালিজম ০.৮ মিলিয়ন ০.০১
রাস্তাফারি ০.৬ মিলিয়ন ০.০০৭
মোট ৮.৭০বিলিয়ন ১০০

বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং নৈতিকতাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। যদিও তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, তবে সব ধর্মই মানবতার উন্নয়ন, ন্যায়পরায়ণতা ও শান্তির উপর গুরুত্ব দেয়। ধর্মের বৈচিত্র্য মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ, যা বিশ্ববাসীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

সূত্র ও ছবি: ইন্টারনেট। সম্পাদনা এআই