ছদ্মবেশী ই-কমার্স যেভাবে প্রলয় ঘটিয়েছিল

ছদ্মবেশী ই-কমার্স যেভাবে প্রলয় ঘটিয়েছিল

ছদ্মবেশী ই-কমার্স যেভাবে প্রলয় ঘটিয়েছিল

 

ছদ্মবেশী ই-কমার্স শব্দটা দেখে অনেকের খটকা লাগতে পারে যে, এ ধরনের ই-কমার্সের নামতো শুনিনি। কিংবা ছদ্মবেশী ই-কমার্স কাদেরকে বলা হয় তাতো জানিনে। একটু ব্যাখ্যা করলে সবাই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারবেন। কারণ আমরা সবাই বিষয়টি অবগত আছি।

নিকট অতীতে বিশেষ করে বিগত বছর তিনের মধ্যে ই-কমার্স সেক্টরে প্রলয় সংগঠিত হয়েছে। তার প্রভাবে ১১টি প্রতিষ্ঠানের কার্ড লেনদেন বন্ধ করেছে ৪টি ব্যাংক। ৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে মানি লন্ডারিং এর অভিযোগ রয়েছে এর মধ্যে ১টি প্রতিষ্ঠান আছে পেমেন্ট গেটওয়ে। ই-ক্যাব ১৭টি প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে। ২৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারের কোনো কোনো দপ্তরে অভিযোগ বা মামলা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩৩ টি প্রতিষ্ঠানের উপর নজরদারি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ভাবে মোট ৬০ প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। যারা এমএলএম, পুঞ্জি স্কিম, মিথ্যা বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতারনায় অভিযুক্ত হয়েছে।

যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বেহাত হয়েছে এবং হাজার হাজার গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিভাবে এ ধরনের ঘটনা সম্ভব হয়েছিল। তা জানতে আমরা একটু পেছনে ফিরে যাব।

 

লম্বা সময় নিয়ে ডিপ ডিস্কাউন্ট ঘোষনা:

লম্বা সমেয়র জন্য অর্ডার নিয়ে একটা সুযোগ তৈরী করেছে টাকা হাতানোর। হতে পারে, টাকা হাতানো তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। ছিল গ্রাহকের টাকা দিয়ে ব্যবসা করা। তবে যারা টাকা পাচার করেছে তাদের ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক উদ্দেশ্যে ছিল এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এরা ৪০ দিনের সময় নিয়ে অর্ডার নিয়েছে। পণ্য দিয়েছে ২০% লোককে তাও সেটা ৯০ থেকে ১২০ দিন পরে। এটা পঞ্জি স্কিমের মতো। আজকে যারা অর্ডার দিবে তারা পাবে ৪ মাস পর। এভাবে সবসময় কিছু গ্রাহকের অর্থ তার কাছে থাকবে। একদিনে তার প্রচুর দায় দেনা সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে একটা পর্যায়ে সে বিপুল অংকের টাকা নিয়ে সরে যেতে পারবে।

সমস্যা হলো যেহেতু ক্রেতারা কোথাও অভিযোগ করতো না। ফলে কেউ জানতেই পারেনি কত টাকার ঝুঁকি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করেছিল।

 

ডিপ ডিসকাউন্ট ঘোষণা করে পণ্য না দেয়া:

এই প্রতিষ্ঠানগুলো ডিপ ডিস্কাউন্ট দিয়ে পণ্য বিক্রি করা শুরু করলো। মানুষ অর্ডার করা শুরু করলো। দেখা গেলো হয়তো কোনো এলাকা থেকে ১০০ জন অর্ডার করেছে সেখান থেকে ৫ জনকে তারা পণ্য দিয়েছে। বাকী ৯৫ জন পাওয়ার আশায় ছিল। কিন্তু ৫ জনের পাওয়া দেখে আরো ৫শ জন অর্ডার করলো। গ্রাহক দেখলো ৫০% লাভ। আর ছদ্মবেশী ই-কমার্ষ প্রতিষ্ঠান ওদিকে গ্রাহকের টাকা নিজের পকেটে ভরার তালে ছিল।

পৃথিবীর সব দেশেই এ ধরনের ছাড়ে অফার দিলে কিছু মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাই আমি গ্রাহকদের লোভী মনে করি না। কিন্তু তাদেরকে অসচেতন বলা যায়, কারণ সারা দুনিয়োতে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে বদনাম বা ব্যাড রিভিউ হলে তার পণ্য বিক্রি হয়না। কিন্তু আমাদের দেশে ক্রেতারা অন্য ক্রেতাদের প্রতারণার ঘটনা জেনেও নতুন করে অর্ডার করেছে। এটা বেশ অবাক করা ব্যাপার।

 

মিথ্যা বিনিয়োগের ফাঁদ:

এরা মিথ্যা বিনিয়োগের ফাঁদ পেতেছিল। ফলে কিছু মানুষ এখানে লোভে পড়ে টাকা লগ্নি করেছিল। এরা আসলে প্রকৃত ক্রেতা বা গ্রাহক নয়। গ্রাহক হবেন তিনি যিনি তার প্রয়োজন পুরনের জন্য কিংবা নিজে ভোগ করার জন্য কোনো পণ্য সেবা ক্রয় করেন বা ক্রয় করার চেষ্টা করেন। যিনি লাভের জন্য কিংবা অত্যধিক লাভের জন্য ঝুঁকি নিয়ে স্বাভাবিকের বেশী ও অপ্রয়োজনীয় বা ভোগ করার ইচ্ছে না থাকা সত্বেও পণ্য ক্রয় করেন তিনি আসলে ভোক্তা নয় অন্য কিছু। যদিও কিছু ক্রেতা না বুঝেও টাকা লগ্নি করেছেন।  এদেরকে থামানোর জন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমা নেয়া নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপর কিছু প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহককে থামানো যায়নি।

 

টাকা ফেরত না দিয়ে চেক দেয়া সংক্রান্ত চালাকি:

চেক এর ক্ষেত্রে কতিপয় প্রতিষ্ঠান অনেকগুলো কটুকৌশল একসাথে প্রয়োগ করেছে। প্রথমত তারা ক্রেতাকে চেক দিয়েছে। এটা বিটুবিতে হতে পারে এবং বিটুসিতে ২/১টা ব্যতিক্রম হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার ক্রেতাকে টাকা না দিয়ে চেক দেয়া একদিকে প্রতারণা পূর্ব লক্ষণ অন্যদিকে নিজের জন্য তারা ঝুঁকি তৈরী করেছিলেন। কারণ সাধারণ ভোক্তা মামলায় তার জেল না হলেও চেকের মামলায় জেল হতে পারে।

এই চেক দেয়াটা তখনি সরাসরি বেআইনি হয়ে গেছে। যখন এক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেতা মাল কিনেছে কিন্তু তাকে চেক দিয়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানের। আমাদের ক্রেতারা যদি সচেতন হতেন তাহলে তখনি এসব প্রতিষ্ঠানের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে পারতেন। বিষয়টি আরো খারাপ হয়ে গিয়েছে যখন চেক হাতে দিয়ে তারা লিখিত নিয়েছে যে, তারা ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দিয়েছে। এটা এক ধরনের জোচ্চুরি এই ঘটনাগুলোর পর ক্রেতাদের আর তাদেরকে বিশ্বাস করার কোনো যুক্তিই ছিলনা। আর চেক ডিজঅনার এর পর বা চেক পাওয়ার পরও কাউকে ছাড় দেয়া ঠিক নয়।

 

অন্যান্য

এছাড়া এমএলএম পদ্ধতিতে ই-কমার্স করে প্রতারণা করেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সরবরাহকারীর টাকা হাতিয়ে সরে গিয়েছে অনেকে। ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে এমন ঘটনাতো আছে। এগুলো এক লাইনে বলা যায় বিধায় আর ব্যাখ্যায় গেলাম না।

এর বাইরে এসব প্রতিষ্ঠান নানা অনিয়ম করেছে এবং ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি করেছে। এরা নিজেরা পূর্নাঙ্গ সিস্টেম উন্নয়ন না করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। এক্সেল ফাইলে এরা একাউন্টস মেনটেন করেছে। এতেই বোঝা যায় গ্রাহককে সেবা দেয়া এদের উদ্দেশ্য ছিলনা। এরা হাইফাই অফিস নিয়েছে সেটাও লোকদের ধোকা দেয়ার জন্য। এরা অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি করেছে। অনেকে ডেভলপার দিয়ে অন্যদের সিস্টেম কিনেছে সোর্সকোর্ডও কিনেছে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে। এই অসাধু কিছু কর্মী ও ডেভলপার তাদের তথ্যও একইভাবে অন্যদের কাছে বিক্রি করেছে। প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক কাজ করতে দেখে অনেক কর্মীও এখান থেকে অর্থলুট করেছে।  যে কর্মীর ৫০ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার যোগ্যতা আছে তাকে ৮ লাখ টাকা বেতন দিয়ে এই খাতের কিছু অদৃশ্য ক্ষতিও এরা করে গিয়েছে। যা ঠিক হতে প্রচুর সময় লাগতে পারে।

আমাদের দেশের কাছাকাছি অর্থনৈতিক অবস্থাসম্পন্ন অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ই-কমার্স অনেকদূর এগিয়েছে একথা সত্য। কিন্তু একথাও সত্য আমাদের দেশে ই-কমার্স উন্নয়নের জন্য সরকার যে পরিমাণ ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। আমাদের ই-কমার্স ততটা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। এই তথাকথিত ছদ্মবেশী ই-কমার্সের কারণে। অনেক দেশ করোনাকালীন যেখানে ৭০০% প্রবৃদ্ধি পেয়েছে আমরা পেয়েছি ৩০০%। আমাদের মোট খুচরা বাজারের ১% এখনো ই-কমার্সের মাধ্যমে হয়না।  করোনাকালিন সেবায় বিদেশী বিনিয়োগ আসার যে আশংকা তৈরী হয়েছিল তাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

-লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ছবি: উইকিহাউ

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply