ক্রস ই-কমার্সে লেনদেন বা পেমেন্ট জনিত সমস্যা

ক্রস ই-কমার্সে লেনদেন বা পেমেন্ট জনিত সমস্যা

ক্রস ই-কমার্সে লেনদেন বা পেমেন্ট জনিত সমস্যা

বাংলাদেশে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেলেও এটি এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করলেও পেমেন্ট গ্রহণ, শিপিং, এবং কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে অনেক উদ্যোক্তা সহজে আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা করতে পারেন না। এছাড়া, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক এবং ফাস্ট ডেলিভারির অভাবও অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।

রপ্তানী হিসেবে গণ্য না করা

অন্যান্য ক্ষেত্রে রফ্তানী এবং রেমিট্যান্স এ সরকার প্রনোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ দিলেও ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জিত হলেও এখানে রফতানীর ১০% নগদ প্রনোদনা এবং রেমিট্যান্স এর ২% নগদ প্রনোদনা কোনোটাই দেয়া হয় না।

আমদানিতে ট্যারিফ রেট
বিদেশ থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ট্যরিফ রেট অনেক বেশী। এতে করে পণ্যের দাম বেশী পড়ে যায়। এর ফলে দেখা যায় বিভিন্ন রকমের ফেক ইনভয়েস দিয়ে অনেকে অন্যভাবে পণ্য আমদানী করে যাতে সরকার ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হয়।

সাপ্লায়ার পেমেন্ট
ক্রস বর্ডার একেক জন মার্চেন্টকে শত শত থেকে হাজার সাপ্লায়ারকে পেমেন্ট দিতে হয়। এটা আসলে এলসি করে করা খুব জটিল, সময় ও শ্রম সাধ্য। বাংলাদেশ থেকে বাইরে পণ্য পাঠাতে হলে ওয়ার্ক অর্ডার দেখাতে হয়। কিন্তু যারা এ্যামাজনে পণ্য সেল করার জন্য এ্যামাজনের ওয়ারহাউজে পণ্য পাঠায় তারা ওয়ার্ক অর্ডার দেখাতে পারে না। ফলে তারা পণ্য পাঠাতে সমস্যায় পড়ে।

বুদ্ধিভিত্তিক পণ্য
ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা বুদ্ধিভিত্তিক পণ্য-সেবা বিক্রির ক্ষেত্রে নীতিমালা না থাকায় বিভিন্ন সময়ে বাড়তি কর-আরোপিত হয়। কখনো পেমেন্ট পেতে সমস্যা হয়। কখনো আবার পেমেন্ট আটকে যায়। কখনো সঠিক পণ্য সেবা আন্তজাতিক বাজারে বিক্রয় করা যায়না। কখনো আবার ভিন্ন পথে এসব বিক্রি হয়। কেউ কেউ বিদেশে কোম্পানী খুলে ব্যবসা পরিচালনা করে।

আন্তজাতিক ব্যয়সীমা

ই-ক্যাব সদস্যদের জন্য বৈদেশিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ১০ হাজার ডলার লিমিট নির্ধারণ করা হয়েছে। যা মোটেও প্রতুল নয়। বিশেষ করে ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য বিষয়টি ভিন্ন হওয়া উচিৎ। কারণ ক্রস বর্ডারের ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের মূল পণ্যটাই বিদেশ থেকে কিনতে হয় বা আমদানী করতে হয়। এখানে বৈদেশিক মূদ্রার ক্ষেত্রে কোনো লিমিট বা সীমা থাকলে সে সীমার মধ্যে পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।

দ্বৈত কর বা ডাবল ভ্যাটিং
বর্তমানে ফেসবুকে এড দেয়ার ক্ষেত্রে ডাবল ভ্যাটিং হচ্ছে। ১৫% এবং ১৫% করে দুইবার ভ্যাট দেওয়ার কারণে ১০০ টাকার বিজ্ঞাপনে ৩০ টাকা ভ্যাট দিয়ে এই খরচ ১৩০ টাকা হয়ে যায়। যেখানে ই-কমার্সে লাভের পরিমাণ ৫% থেকে ১০% বা তারও কম। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা বৈধভাবে বিজ্ঞাপন দেয়ার পরিবর্তে বিকল্প উপায় অনুসন্ধান করে থাকে।

পণ্যফেরত ও মূল্যফেরত
যেহেতু ক্রস বর্ডারের পণ্য প্রেরণের ক্ষেত্রে পণ্য ফেরত দেওয়া যায়না। সেহেতু ক্রেতারা পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়না।
বাংলাদেশ থেকে Payoneer এর একাউন্ট করার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। এমনকি Payoneer এর একাউন্টে সব ক্ষেত্রে লেনদেন করা সহজ হয়না। যেমনটা Paypal এর ক্ষেত্রে অসুবিধা লক্ষ্য করা যায় না ।

পরামর্শ/ সমাধান

ভিন্ন নীতিমাল
ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য বৈদেশিক মূদ্রার সীমা ও নীতি পরিবর্তন করতে হবে। আলাদা ও ভিন্নতর নীতি নির্ধারণ করতে হবে। দ্রুত পরিপত্র জারি করে এই ব্যবস্থা রহিত করতে হবে।
এবং যারা ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের সাথে জড়িত বিশেষ করে বৈদেশিক মূদ্রা আনে। তাদের জন্য ভ্যাট  রহিত করা যুক্তিযুক্ত হবে। কাস্টম হাইজে আলাদা ওয়ারহাউজ রাখতে হবে। এবং পণ্য ফেরত আনার নিয়ম চালু করতে হবে।

বৈশ্বিক পেমেন্ট পদ্ধতি
ক্রস বর্ডার ব্যবসায়ের জন্য এবং আন্তর্জাতিক বিক্রেতাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য Paypal পেমেন্ট গেটওয়ে আবশ্যক। কারন Paypal নিজেই Escrow সিস্টেম দেখাশোনা করে। এই সুবিধা দিতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাও আকৃষ্ট হবে। পেপ্যাল ও পেঅনএয়ার সরাসরি বাংলাদেশে ব্যবসা করার অনুমতি দিতে হবে। রফতানীমুখী ই-কমার্সকে এক্সপোর্ট এর আওতায় এনে ১০% প্রনোদনা এবং ড্রপ শিপিং ই-কমার্সকে রেমিট্যান্স এর আওতায় এনে ২% প্রনোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

অগ্রিম মূল্য প্রদান

যেহেতু বাংলাদেশী ক্রেতারা বিদেশী ওয়েবসাইট থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অগ্রিম মূল্য দিয়ে পণ্য কিনে। তাই ক্রস বর্ডারের ক্ষেত্রে অগ্রিম মূল্য প্রদানের সুযোগ থাকা উচিৎ। তা না হলে বিদেশ থেকে পণ্য আনার পর গ্রাহক সে পণ্য গ্রহণ না করলে উদ্যোক্তার যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে প্রতারণা রোধে ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমদানী রপ্তানী লাইসেন্স এর অনুরুপ ভিন্নতর বিশেষ লাইসেন্স পাবার সুযোগ রাখা দরকার। এক্ষেত্রে সুষ্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজনে আলাদা বিজনেস ক্যাটাগরি বা লাইসেন্সিং চালু করা যেতে পারে।

পেমেন্ট সমস্যার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সীমিত ব্যবহার, হাই ট্রানজেকশন ফি, এবং ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে হলে PayPal-এর মতো সহজ পেমেন্ট সিস্টেমের অনুপস্থিতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও বিকল্প হিসেবে কিছু ব্যাংক এবং ফ্রিল্যান্সার প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে, তবে তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকার এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক ই-কমার্স বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply