5 August

জুলাই জাগরণ কি সার্বজনীন

জুলাই জাগরণ ও অভ্যুত্থান কি সার্বজনীন?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেখানে প্রায় ৯৭ জন লোক স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। সেটা নিয়ে মৃদু বিতর্ক তৈরী হয়। কিছু মানুষ একে গন্ডগোল, কিছু মানুষ একে দেশভাগ এভাবে নানারকম অভিধা দিয়ে থাকে। তারা মনে করে এটি স্বাধীনতা ও বা মুক্তিযুদ্ধ ছিলনা। কারণ এখানে সম্মুখযুদ্ধ তেমন হয়নি আর আসলে দুই ভাই আলাদা হয়েছে। তাই এটা দেশভাগ বলা ভালো, আবার এই মতও আছে যে, পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ভারতের খপ্পরে এবং ভারতের তাবেদারে পড়েছে সূতরাং এটি স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল না।

কিন্তু একটি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল উপাদান, ঘটনা ও বৈশিষ্ঠ্য বিদ্যমান ছিল। একটি যুদ্ধের বিনিময়ে নতুন দেশ, মানচিত্র, পতাকা, সরকার, বাহিনী, স্বীকৃতি, সংবিধান সবকিছুই হয়েছে। সূতরাং এ বিষয়ে আর আলোচনার দাবী রাখে না।

আজকের বিষয় হলো, জুলাই এর জাগরণ ও অভ্যুত্থান সার্বজনীন কিনা? চলুন আলোচনা করা যাক-

প্রথম কি কি বৈশিষ্ঠ্য থাকলে একটি দেশের সংগ্রাম ও জনযুদ্ধ সার্বজনীন হয়? সেটা জেনে নেয়া যাক-

একটি দেশের জাগরণ, সংগ্রাম বা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন বা সর্বজনীন বলা হয় তখনই, যখন তা কেবল একটি শ্রেণি, গোষ্ঠী বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং অধিকাংশ মানুষের হৃদয়ের দাবি হয়ে ওঠে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য সব সার্বজনীন জাগরণ, আন্দোলন ও অভ্যুত্থানে উপস্থিত থাকে। সেগুলো হলো:

 

. সর্বজনীন স্বার্থ দাবির ভিত্তি

আন্দোলন বা জাগরণের মূল দাবি হতে হবে জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকে। সকলেররই একই চাওয়া থাকে এবং সকলের বা বেশীরভাগ মানুষের সমর্থণ থাকে।

. ন্যায়সঙ্গত নৈতিক বৈধতা

আন্দোলনের উদ্দেশ্য হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, যা সাধারণ মানুষ নৈতিকভাবে সমর্থন থাকতে হয়। হয়তো সব মানুষ মাঠে নামেনা। কিন্তু শাসক শ্রেণী ছাড়া সবাই তার পক্ষে থাকে। জনগণ মনে করবে যে তাদের সংগ্রাম সঠিক, ন্যায্য, এবং শোষণ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

. বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ

মানুষকে অংশগ্রহণের জন্য দলীয় বা বিশেষ যোগ্যতার দরকার নেই, সবাই অবদান রাখতে পারে। সকল শ্রেষী পেশা বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, পেশা ও এলাকার মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে এবং তারা অংশগ্রহণ করে যাতে এটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর আন্দোলন হয়না।

. জনগণের আবেগ চেতনার মিলন

আন্দোলন শুধু যুক্তি বা নীতির কারণে নয়, বরং মানুষের আবেগ, সম্মান, বেঁচে থাকা, ভবিষ্যৎ আশা—এসবের সাথে মিল থাকতে হবে।

. দমনপীড়নের সাধারণ অভিজ্ঞতা

শাসক বা প্রতিপক্ষের দমননীতি যদি কেবল একদলকে নয়, বরং সাধারণ জনগণকে আঘাত করে, তখন সবাই যুক্ত হয়।

এখন আমরা দেখি ২৪ এর জাগরণ ও অভ্যুত্থানের কি কি বৈশিষ্ঠ্য ছিল

১. এটি চাকরী প্রত্যাশী ছাত্রদের একটি দাবী নিয়ে শুরু হয়েছিল। তারা চাকুরিতে কোট সংষ্কার করার দাবী জানিয়েছিল। তাদের েএই দাবীর প্রতি সকল মানুষের সমর্থন ছিল। মানুষ সামাজিক মাধ্যম এমনকি জীবনের ঝুকি নিয়ে সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে সমর্থন দিয়েছে। সর্বশেষ যখন এটি সরকার পতনের ১ দফায় পরিণত হয়। তখন হাজারো লাশের স্তুপ সরিয়ে জনস্রোত একটাই তীব্র হয়েছিল যে, সারাদেশের পুলিশ পালিয়ে গিয়ে গিয়েছিল।

২. দেশের সকল পেশা ও শ্রেণীর মানুষ রাস্তায় নেমেছে। শাসক শ্রেণী ছাড়া সকল দল এক হয়েছে। ১৪৫২ মতান্তরে ১৫৮১ জন মানুষ মারা গিয়েছে। যাদের মধ্যে ৭০% ছিল সাধারণ মানুষ যারা কোনো দল করে না। এবং ১৬৭ জন ছিল শিশু যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

৩. মানুষের দাবী ছিল, সরকারের পতন এবং নতুন ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গঠন। যা গণমানুষের বহুদিনের দাবী। এটি মানুষের মনে থাকলেও মানুষ আগে এই দাবীতে রাস্তায় নামেনি। কিন্তু কোটা আন্দোলন যখন সরকার পতনের ১ দফায় পরিণত হয়েছে। তখন গণমানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে এটি একটি সার্বজনীন দাবী।

৪. বাংলাদেশের ইতিহাসে সব সময় একদলের বিরুদ্ধে আরেকদল আন্দোলন করে। কিন্তু এগুলো হরতাল জ্বালাও পোড়াও আর দেশের ক্ষতি হয় এবং কিছু মানুষ প্রাণ হারায়। কিন্তু যখনি কোনো আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়েছে। সেটি বার বার সফল হয়েছে। ২৪ আর আন্দোলনে শ্রমিক, রিকশাজীবি, গৃহবধু অংশগ্রহণ করেছে। যেটা আগে দেখা যায়নি। আরো দুটি নতুন মাত্রা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অংশগ্রহণ পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল এবং ছাত্রী ও নারীদের রাজপথে অংশগ্রহলে আন্দোলনকে টান টান রাখতে ভূমিকা রেখেছিল।

৫. হাসিনার পদতের পর সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যেভাবে উল্লাস করেছে। জনতা যেভাবে পরাজিতদের ধাওয়া করে সব জায়গা থেকে বিতাড়িত করেছে। এটাও এর সার্বজনীনতার প্রমাণ।

তবে এই আন্দোলনকে অস্বীকার করা এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হবে। প্রথম পরাজিতরা করবে সেটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট। কিন্তু বিজিতদের মধ্যেও নারা মেরুকরুন হবে। যেমন- নিজেদেরকে কৃতিত্ব নিতে একদল আরেকদলের অবদান অস্বীকার করবে।

তবুও চলবে মেরুকরণ

আর সবচেয়ে মারাত্মক যেটা হবে, সেটা হলো- যারা এখানে অবদান রাখতে পারেনি বা বুঝে উঠতে পারেনি। কিছুদিন তারা এটাকে আন্দোলন না বলে ভিন্ন কিছু বলার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে যদি মনে হয় এটাকে স্বীকৃতি দিলে তাদের প্রতিপক্ষ লাভবান হয়ে যায়। তখন এমনটা হতে থাকবে।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ছবি: সংগ্রহ

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply