পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের আট বছর

পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের আট বছর

পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের নয় বছর

জাহাঙ্গীর আলম শোভন
দেখতে দেখতে ৮টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। ২০১৬ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারী থেকে ২৮ মার্চ এই সময়ের মধ্যে পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ গিয়েছিলাম। চলতি বছর যখন এই সময়গুলো আসলো প্রতিদিন মনে পড়ে যেমন আজ মনে পড়ছে ২৫ মার্চ কোথায় ছিলাম কেমন ছিলাম। ফেসবুকও মনে করিয়ে দেয় স্মৃতিগুলো সামনে নিয়ে এসে। আর এখনো যখন উত্তরবঙ্গে ঘুরতে চাই বা চট্টগ্রাম কক্সবাজার যাই জানালায় ফাঁক দিয়ে যখন রাস্তার দিকে তাকাই।
তখন আমি যেন আমাকেই দেখতে পাই। ত্রিশোর্ধ এক যুবক একটি স্ট্রলার নিয়ে ঘর্মাক্ত শরীর বয়ে হেঁটে চলেছে তো চলেছেই। রোদে পুড়ে তার ত্বক কালো হয়ে গেছে ওজন কমে গেছে তবু যেন কোনো ক্লান্তি নেই। চলছেতো চলেছেই। রাস্তার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। কোন পথ দিয়ে চলার সময় অনুভূতি কেমন ছিলো? সেখানকার লোকদের সাথে কিভাবে সময় কাটিয়েছিলাম। সব কিছু মনে নেই তবে ছবিগুলো দেখলে যেমন পনে পড়ে যায়। সেইসব রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও মনে পড়ে।

ছাত্রজীবনে কাল্পনিক রহস্য কিংবা গোয়েন্দা গল্প পড়তাম বটে কিন্তু আমাকে টানতো বাস্তব সব রোমাঞ্চকর গল্পগুলো। যেমন উত্তর–দক্ষিণ মেরু অভিযান, আমাজান অরন্যে অভিযাত্রা, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, নীলনদের উৎসমুখ আবিষ্কার, হিমালয় আর সাহারা অভিযানের রক্তহীমকরা সত্যিকার গল্পগুলো। এই সফর ছিলো ১১৭৬ কিলোমিটারের। পথটা হাজার কিলোমিটার হলেও আমার একটু বেশী হাঁটতে হয়েছিলো কারণ আমি চলার পথে পর্যটন স্থানগুলো দেখেছি।

আর ২৫-৩০ দিনের মধ্যে এইটুকু পথ হাঁটা গেলেও আমার প্রায় দেড়মাস লেগেছে কারণ পুরো ভ্রমণটা ছিলো একটা সামাজিক কর্মসচূী। তাই আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্কুল কলেজে গিয়েছি। ছাত্র, শিক্ষক শ্রমিক, পথচারী, গ্রামবাসী ও হাটবাজারের মানুষ মিলে ৫০ হাজারের বেশী মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেছি। মত বিনিময় করেছি। কারণ আমার যে স্লোগান ছিলো দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ সেটা তাদেরকে বলেছি। তাদের মাঝে দেশগড়ার কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছি।
আমি চলার পথে ১৮টি জেলার মানুষকে বলতে চেয়েছি ‘‘এই দেশ আমাদের, এই দেশকে আমরাই গড়বো’’ আর দেশকে গড়ার জন্য আমাদের সকলেরই কিছু না কিছু করার রয়েছে। এছাড়া এ সময়ে বিভিন্ন এলাকায় শিশু নির্যাতন বন্ধ, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষ রোপণ, বাল্যবিয়ে রোধ ও মাদকবিরোধী জনমত গঠনের চেষ্টা করেছি।
ভ্রমণ শেষে হয়েছে কিন্তু স্বপ্ন দেখা শেষ হয়নি। শেষ হয়নি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার মিশন। ভ্রমণের বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আমার লেখা ‘দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদে ‘ শিরোনামে বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায়। ভালো লাগছে এজন্যযে সফরের মতো বইটিও সকলে প্রশংসা পেয়েছে।
আমার কথা হলো—এই দেশটা আমাদের, আমরাই এই দেশকে গড়ব। আমরা যার যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কিছু করব। এ ছাড়া তিনি শিশু নির্যাতন বন্ধ, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, বাল্যবিবাহ রোধ ও মাদকবিরোধী জনমত গঠনে কাজ করেছেন। শোভন বলেন, এটা একটা ভ্রমণ কর্মসূচী হলেও এর সামাজিক দিক রয়েছে। আমি মনে করি, আমরা আমাদের দেশ ও এর সৌন্দর্যকে দেখবো এর সম্পর্কে জানবো এবং দেশ গড়ার কাজে অংশ নেবো। সমাজের যে স্তরেই থাকিনা কেন আমাদের দেশ ও জাতির প্রতি আমাদের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে জাতি আমাদের কাছে তা প্রত্যাশা করে। আমারদের উচিত প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু না কিছু করা। অনেক কিছু করতে না পারলেও আমরা অন্তত এতটুকু করতে পারি যে আমরা এমন কোনো কাজ করবো না যাতে আমাদের দেশের ক্ষতি হয়।
তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের আমার বক্তব্য, আমরা বড়ো হয়ে দেশের হয়ে কাজ করবো, দেশের জন্য কাজ করবো, পরিবেশ সংরক্ষণ করবো, গাছ লাগাবো, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করবো শিশু অধিকার আদায়ের চেষ্টা করবো, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার যে অধিকার রয়েছে তার জন্য চেষ্টা করবো, বাল্যবিবাহ সমাজের এক অভিশাপ এর প্রতিরোধ করবো ,মাদক থেকে দূরে থাকবো মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখেবা। আমাদের দেশের যে নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে তার জন্য আমরা কাজ করবো। আমাদের দেশের জন্য আমাদেরকে কাজ করতেই হবে।।।
প্রথম থেকেই আমি আমার পদযাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার উপর জোর দিয়েছি। হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমি প্রায় বারোশ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটেছি। আমার এই শ্রমসাধ্য পদযাত্রা থেকে যদি দেশ ও সমাজ উপকৃত হয় তবেই তা স্বার্থক।
কখনো কখনো খুব হতাশ হয়ে পড়ি এবং মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। যখন দেখি জঙ্গি নামক নরপশুরা হামলে পড়ছে আমার দেশের উপর। যখন দেখি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অপরাধের চূড়ান্ত বিস্তৃতি কিংবা দূর্ণীতির কালো থাবা। এগুলোযে খবরের কাগজেই শুধু দেখি তা নয়। কখনো কখনো নিজেকেও এসবের সম্মুখিন হতে হয়। সেটা পুলিশ স্টেশান, ভূমি অফিস, বিআরটিএ কিংবা সরকারী কোনো দপ্তরে গেলে খুব কাছ থেকে দূর্ণীতির শিকার হতে হয়। যারা এসব জায়গায় গিয়ে থাকবেন তারা আমার সাথে একমত হয়ে থাকবেন। তখন নিজেকে খুব একা এবং অসহায় মনে হয়। কিন্তু পরক্ষণে আবার আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠি।
সমস্যাগুলো আছে বলেই আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে দেশগঠনে অংশ নেয়ার। কারণ এসব সমস্যা যতটা না রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তারচেয়ে বেশী সামাজিক। কারণ সামাজিক মেলবন্ধন ও সামাজিক নৈতিকতাই ছিলো আমাদের দেশের জীবন কাঠামোর অংশ। আজ সামাজিক শৃংখলা ও নিরাপত্তা দূর্বল হয়ে যাওয়াই হচ্ছে ক্রমাগত সমস্যার মূল। আর এই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য বসে না থাকে। একক বা সাংগঠনিকভাবে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে বদলে দেয়ার শপথ নিই। বদলে দেয়ার মিশন শুরু করি। মনে রাখতে হবে আমরা যারা শান্তি প্রিয় আমাদের সংখ্যাই বেশী। দূস্কৃতিকারীতো হাতে গোনা কয়েকজন। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই আর লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকি জয় আমাদের হবেই।
লেখক : পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণকারী

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply