কেমন করে এলো ঈদ: ইসলামী উৎসবের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কেমন করে এলো ঈদ: ইসলামী উৎসবের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কেমন করে এলো ঈদ: ইসলামী উৎসবের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ঈদ—শুধু একটি আনন্দের দিন নয়, বরং ইসলামী সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আমরা অনেকেই জানি না, ইসলাম ধর্মে ঈদের প্রবর্তন কখন ও কী প্রেক্ষাপটে হয়েছিল। এই লেখায় আমরা জানবো কিভাবে ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী ঈদের সূচনা হয়, রোজা ফরজ হয় এবং কীভাবে জাহেলি যুগের উৎসবের পরিবর্তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার প্রচলন ঘটে।

হিজরতের মাধ্যমে সূচিত হয় নতুন সময়ের ধারা

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এই ঘটনাকে ভিত্তি করেই পরে ইসলামি সময় গণনার সূচনা হয়, যা ‘হিজরী সাল’ নামে পরিচিত। যদিও হিজরতের সঙ্গে সঙ্গে হিজরী সাল গণনা শুরু হয়নি। বরং আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরী সাল গণনা শুরু হয় হিজরতের প্রায় ১৭ বছর পর, খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে। হিজরী সাল গণনার পূর্বে আরবের লোকেরা ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনার সাথে বছর গুনতো। যেমন হস্তিযুদ্ধের বছর, কাবা নির্মাণের বছর ইত্যাদি।

শাবান মাসে রোজা ফরজ হয়
হিজরী প্রথম বছরের অষ্টম মাস শাবান মাসে রোজা ফরজ হওয়ার আয়াত নাজিল হয়। এরপর নবম মাস, অর্থাৎ রমজান মাসে এক মাস সিয়াম সাধনাকে ফরজ করা হয়। এ সময় মুসলমানদের জীবনে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়—আত্মসংযম, তাকওয়া ও ইবাদতের মাস হিসেবে রমজান প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু তখনো ঈদের ঘোষণা আসেনি।

মদিনার প্রচলিত উৎসব—নওরোজ ও মেহেরজান
নবীজি (সা.)-এর মদিনায় আগমনের পূর্বে সেখানে দুটি বিশেষ দিন উৎসব হিসেবে পালন করা হতো—নওরোজ (নববর্ষ উপলক্ষে) এবং মেহেরজান (বসন্ত উপলক্ষে)। এই উৎসবগুলো ছিল জাহেলিয়া যুগের সংস্কৃতির অংশ। মদিনাবাসী এসব দিনে খেলাধুলা, আনন্দ, গান-বাজনা করে সময় কাটাত। মক্কা যেমন তীর্থস্থান হওয়ার কারণে ওকায মেলা হতো যেখানে অন্যন্য দেশ ও রাজ্য থেকে লোক আসতো। মদীনায় উৎসবগুলো ছিলো স্থানীয় এবং আরবের তখনকার পৌত্তলিক আনুষ্ঠানিকতা তাতে ছিল।
পরে রাসুল (স) মদীনাবাসীকে একই আনন্দ, ইবাদাত ও শিরক থেকে মুক্তি দেয়ার উৎসব হিসেবে ঈদের সূচনা করেন।

হাদীসের ভাষ্যে ঈদের সূচনা
ঈদের ইতিহাস লিখতে সাহাবী আনাস ইবন মালিক (রা.) এই সহিহ হাদীসটি একমাত্র প্রনিধান বর্ণণা । তিনি বর্ণনা করেন:
“জাহেলিয়া যুগের অধিবাসীরা প্রতিবছর দুটি দিনে উৎসব করত। মহানবী (সা.) মদিনায় এসে বললেন, ‘তোমাদের জন্য দুটি দিন ছিল, তোমরা ফুর্তি করতে। আল্লাহ এখন তোমাদের ওই দুটি দিনের বদলে আরও বেশি উত্তম দুটো দিন সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।” – (সূত্র: নাসায়ি: ২০২১, মিশকাত: ১৪৩৯)

এ হাদীস থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে পার্থিব আনন্দের বিকল্প হিসেবে আধ্যাত্মিক উৎসব প্রবর্তন করা হয়, যার মাধ্যমে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে ইবাদত, সংযম এবং ত্যাগের শিক্ষা। সে ঈদ আজ আন্তজাতিক উৎসব বিশ্ব মুসলিমের মিলন মেলা।

ঈদের আনুষ্ঠানিক প্রবর্তন
হিজরী দ্বিতীয় সনে, অর্থাৎ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনকে ঈদুল ফিতরের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেন।
ঈদ উদযাপন করা হয় চাঁদের গণনা অনুযায়ী—রমজান মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনে শেষ হয়। এই অনুসরণেই ঈদের দিন নির্ধারিত হয়।

এরপরই ঈদুল ফিতরের পাশাপাশি ঈদুল আজহাও ইসলামে প্রবর্তিত হয়, যা কুরবানির মর্মবাণী ও ত্যাগের শিক্ষা বহন করে।

শুধু উৎসব নয়, ইসলামী সংস্কৃতির পরিচায়ক
ঈদ শুধুমাত্র কোনো আনন্দ উৎসব নয়, বরং এটি ইসলামী জীবনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যেখানে আছে ইবাদতের প্রতিদান, আছে পরিবার-সমাজের বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ, এবং আছে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানোর অনন্য আহ্বান।

নবীজি (সা.) পুরোনো কুসংস্কার ও আনন্দের নামে অপসংস্কৃতির পরিবর্তে দিয়েছেন ঈমানদীপ্ত, মানবিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ দুটি উৎসব—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এই উৎসবগুলো শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়, বরং তা আমাদেরকে সমাজ, ধর্ম ও মানবতার প্রতি দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply