পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ তত্ত্ব অস্ত্র ও আমরা
মানুষ যুদ্ধের মধ্যেই থাকে। কেবল গায়ে গতরে মার খেলে বুঝতে পারে । আর জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হলে বুঝতে পারে। স্বাধীনতা হরণ হয়েছে।

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ তত্ত্ব অস্ত্র ও আমরা

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ তত্ত্ব অস্ত্র ও আমরা

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আপনি আমি এবং প্রায় আমরা সবাই মানে পৃথিবীর প্রায় সকল ভোক্তা এবং বলতে গেলে তৃতীয় বিশ্বের সকল নাগরিকে বিশেষ করে যারা ইন্দ্রিয় পূজায় থাকি এবং ডোপামিন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নয় আমরা সকলে পঞ্চম জেনারেশনের যে যুদ্ধ চলছে সে যুদ্ধের সৈনিক বলা যায় পরাজিত সৈনিক। এই যুদ্ধে আমরা হারছি, হেরে চলেছি এবং প্রতিদিন গো হারা হারছি।

বিশ্ব রাজনীতি, প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধরণও বদলে যায়।
বিশেষ করে ঠান্ডা যুদ্ধের পরপরই দেখা যায়, সামরিক শক্তির বদলে তথ্য, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলী প্রচারণা বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। সামরিক খাতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান এই যুদ্ধকে আরও গভীর ও দুর্বোধ্য করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটেই ৫ম প্রজন্মের যুদ্ধের ধারণা সামনে আসে।

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ ও তার তত্ত্ব

ট্রয় এস. থমাস (Troy S. Thomas), জেমস কাইজার (James Kiser) এবং নাথান ফ্রেয়ার (Nathan Freier) নামে  তিন মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তা ২০০৩ সালে একটি গবেষণা নিবন্ধে “Fifth Generation Warfare” শব্দটি ব্যবহার করেন, যার মানে হলো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধাস্ত্র। গবেষণাপত্রের নাম ছিল: “Fourth-Generation Warfare and the Fifth-Generation Fallacy” তারা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজেরাই অবাক হয়ে যান।

পরে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ বিষয়টি জানতে পারে তথাপি এই বিষয়ে খুব বেশী কথা বলা হয় না। যদিও যুদ্ধকে জেনারেশন ভিত্তিক ভাগ করেন- William S. Lind , সেটা ১৯৮৯ সালে- তিনিই প্রথম “Fourth Generation Warfare (4GW)” শব্দটি প্রস্তাব করেন। তাঁর লেখা “The Changing Face of War: Into the Fourth Generation” ছিলো যুদ্ধের বিবর্তন ব্যাখ্যার একটি মাইলফলক। পরে তিন সামরিক গবেষকের নিবন্ধটি জনসম্মুখে আসে ২০০৬ সালে। Warfare আরেক মানে হলো যুদ্ধ করার ধরন বা কৌশলগত রূপ। এটি কেবল অস্ত্র বা সৈন্যের লড়াই নয়, বরং কীভাবে, কোথায়, কার বিরুদ্ধে এবং কী উদ্দেশ্যে যুদ্ধ পরিচালিত হয়—এই সমগ্র বিষয়কে বোঝায়।

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধাস্ত্র বোঝার আগে প্রথম থেকে চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক-

আগের ৪টি প্রজন্মের যুদ্ধের ধারা সংক্ষেপে:

প্রজন্ম ধরন বৈশিষ্ট্য
১ম প্রজন্ম প্রচলিত যুদ্ধ মানুষ ও অস্ত্রের সম্মুখ সমর
২য় প্রজন্ম প্রযুক্তির সংযোজন কামান, রাইফেল, লাইন ফর্মেশন
৩য় প্রজন্ম মোবাইল যুদ্ধ ট্যাংক, বিমান, সাঁজোয়া যান
৪র্থ প্রজন্ম অসম যুদ্ধ গেরিলা, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রবিরোধী দল

সে গবেষণাপত্রে পরে যা ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে সেখানে তারা বলেন-

“5GW is a war of information and perception, conducted through nontraditional actors, using decentralized and network-based strategies.”  (৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ হচ্ছে তথ্য ও ভাবনার যুদ্ধ, যেখানে প্রচলিত সৈন্য বা অস্ত্র নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্ন কর্মপদ্ধতি ও নেটওয়ার্কভিত্তিক কৌশল ব্যবহৃত হয়।) তাহলে ৫ম প্রজন্মের এই যুদ্ধ কি বা কেমন?

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ কী?

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ হলো এমন এক অদৃশ্য ও অপ্রথাগত যুদ্ধ, যেখানে শত্রু সামনে থাকে না, সৈন্যদল থাকে না, ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান থাকে না, কিন্তু সমাজে বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। এর লক্ষ্য হলো কোনো রাষ্ট্র, জাতি বা সমাজের ভিতর থেকে দুর্বলতা তৈরি করে ধ্বংস সাধন করা।

আরো সহজ কথায় বললে- ৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ (5th Generation War বা 5GW) হলো আধুনিক যুদ্ধের এমন একটি ধারা, যেখানে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের বদলে মূলত তথ্য, প্রযুক্তি, মনস্তত্ত্ব, মিডিয়া, এবং সমাজ-সংস্কৃতি ব্যবহার করে একটি জাতিকে দুর্বল করা হয় বা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়।

এটা হলো  ‘‘তথ্য-মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’’ যাতে ‘‘ফেক নিউজ, সাইবার আক্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ হলো অস্ত্র’’।

এবার খুব সুক্ষ্মভাবে চিন্তা করুন যে আপনি আমি  এই যুদ্ধের নিরব ও প্রকৃত ভিকটিম কিনা?

পটভূমি:

১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে নতুন সহস্রাব্দে ঢোকার পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটে। এর ফলে জাতি, রাষ্ট্র ও সমাজকে সরাসরি আক্রমণ না করেও ভেতর থেকে দুর্বল করার কৌশল গুরুত্ব পায়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মিডিয়া ম্যানিপুলেশন, আরব বসন্ত, ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচন ইত্যাদি এই পটভূমিকে আরও বাস্তব করে তোলে বলে বিশ্লেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকজন লেখক ও চিন্তাবিদ যেমন, David Axe, Robert Leonhard, Qiao Liang (চীন) এবং Major Hassan Abbas (পাকিস্তান) প্রভৃতি লেখক ও সামরিক বিশ্লেষকরা এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এছাড়া ধারণা করা হয় উন্নত রাষ্ট্রের সেনা সিলেবাস ও সামরিক জার্নালে বিষয়টি ইতোমধ্যে অন্তভূক্ত হয়েছে। 

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধের উপাদানসমূহ:

১. তথ্য ও প্রচারণা যুদ্ধ (Information Warfare)

  • সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ, ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো

  • ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে সমাজে অবিশ্বাস তৈরি

২. সাইবার যুদ্ধ (Cyber Warfare)

  • সরকারি সিস্টেম, ব্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হ্যাকিং

  • ডেটা চুরি, র‍্যানসমওয়্যার হামলা

৩. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare)

  • ভয়, হতাশা, সন্দেহ ছড়িয়ে নাগরিকদের দুর্বল করে ফেলা

  • “কেউই নিরাপদ নয়” এমন মনোভাব সৃষ্টি

  1. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন (Cultural Subversion)

    • বিদেশি সংস্কৃতি, কনটেন্ট, ফ্যাশনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়ের অবক্ষয়

    • তরুণ সমাজকে মূল্যবোধহীন করে তোলা

  2. অর্থনৈতিক বিভ্রান্তি (Economic Destabilization)

    • মুদ্রাস্ফীতি, কালোবাজার, বাজারে কৃত্রিম সংকট

    • বিদেশি অর্থায়নে গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন।

      কেন তারা ২০০৩ সালে বিষয়টি বুঝতে পারেন?

      যুক্তরাষ্ট্র তখন 9/11-এর পরবর্তী জটিল সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ মোকাবেলা করছিল। তারা দেখছিল যে শত্রুরা আর রাষ্ট্র নয়, বরং বিচ্ছিন্ন (জঙ্গি) গোষ্ঠী ও আইডিওলজি বা কোনো আদর্শ। তারা খুঁজতে থাকে এমন এক নতুন যুদ্ধধারার সংজ্ঞা, যা অদৃশ্য, মনস্তাত্ত্বিক, তথ্য-নির্ভর এবং সামাজিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারে।

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধে টার্গেট কীভাবে বাছাই হয়?

  • তরুণ প্রজন্ম: যারা সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর, সহজেই প্রভাবিত হয়

  • শিক্ষিত ও শহুরে জনগোষ্ঠী: যাদের মতামত সমাজে ছড়ায়

  • মতপ্রকাশকারী গোষ্ঠী: সাংবাদিক, ব্লগার, ইউটিউবার, শিক্ষক ইত্যাদি।

তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ২০০৩ সালে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক ট্রয় এস. থমাস ও তার সহকর্মীরাই প্রথম “5th Generation Warfare” শব্দটি তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা পরবর্তী এক দশকে বাস্তব ঘটনাবলির মাধ্যমে আরো শক্তিশালী ধারণায় পরিণত হয়।

অনেকে মনে করেন এর পর বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালীরা অন্যের আদর্শকে পূঁজি করে এরকম বিভ্রান্তিমূলক দল তৈরী করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিডিয়া নতুন নতুন নায়ক বা হিরো তৈরী করে। আবার কখনো কখনো কোনো বিশেষ ব্যক্তি বিখ্যাত ও ইতিবাচক ইমেজ নিয়ে পরিচিত হতে থাকলে মানুষের ভেতরে তার চিন্তা ও কথার প্রভাব পড়ার ভয়ে অনেক ব্যক্তিতে ইচ্ছাকৃত বিতর্কিত করা হয়েছে এমনও বহু ঘটনা রয়েছে।

৫ম জেনারেশন যুদ্ধ ধারণার সারাংশ

দিক ব্যাখ্যা
যুদ্ধের মাধ্যম তথ্য, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম
শত্রু পরিচয়হীন, রাষ্ট্রবহির্ভূত, কখনো জনগণের মধ্যেই
অস্ত্র ফেক নিউজ, সাইবার হামলা, সামাজিক বিভক্তি
লক্ষ্য রাষ্ট্রের ভিতর থেকে ধ্বংস

৫ম প্রজন্মের যুদ্ধ একটি চুপিসারে ঘটতে থাকা সংঘর্ষ, যা দেশের ভিতর থেকে দেশকে দুর্বল করে। এটি ট্যাংক দিয়ে নয়, ট্যাব, টিকটক, টুইটারে হয়ে থাকে। তাই এর প্রতিরোধে সচেতনতা, প্রযুক্তি দক্ষতা ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই প্রতিরক্ষার উপায় ও ব্যবস্থা নিয়ে পরে একদিন লিখবো আশা করি।