মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নতুন কিছু শেখা সম্ভব: তানসেল আলির প্রমাণিত পদ্ধতি
নতুন কিছু শেখার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নয়। তানসেল আলি, তিনবারের মেমোরি চ্যাম্পিয়ন, সেলিব্রিটি মেমোরি কোচ এবং বেস্টসেলার লেখক, তার বই How to Learn Almost Anything in 48 Hours-এ দেখিয়েছেন, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় যেকোনো বিষয়ের দক্ষতা অর্জন সম্ভব। তার বইয়ে বর্ণিত ৭ ধাপের নির্দেশিকা অনুসরণ করে এই অভাবনীয় কাজটি অর্জন করা যায়।
৭ ধাপে শেখার কৌশল
১. প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করুন (৩ ঘণ্টা)
প্রথমেই আপনার শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ জোগাড় করুন। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি নতুন একটি ভাষা শিখতে চান, তাহলে বই, অডিও, ভিডিও, অ্যাপ, ওয়েবসাইট, এবং স্থানীয় ভাষাভাষীদের সহায়তা সংগ্রহ করুন। এটি আপনাকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
বর্তমান সময়ের পেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি যা কিছু দেখবেন, পড়বেন বা শুনবেন তা হাতের কাছে গুচিয়ে রাখুন। হোক ভিডিও কিংবা চ্যানেল, পিডিএফ বা টেক্সট।
২. স্মৃতিশক্তি উন্নয়নের কৌশল তৈরি করুন (২ ঘণ্টা)
উপকরণ সংগ্রহের পরে, তানসেল প্রস্তাবিত কৌশলগুলো অনুসরণ করুন। উদাহরণস্বরূপ, তালিকা মুখস্থ করার জন্য Method of Loci ব্যবহার করুন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে বাস্তব স্থান বা কল্পনার মাধ্যমে সাজানো হয়। এছাড়া Mind Mapping এবং SMASHIN SCOPE পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্যের ভিজ্যুয়ালাইজেশন করুন।
অর্থ্যাৎ প্রতিটি বিষয়ের কিছু পরিভাষা থেকে সেগুলো মনে থাকা দরকার। এবং এ সম্পর্কিত তথ্যগুলো জানা দরকার। তাই কিছু জিনিস মনস্থ করতে হবে। সেটা ভুলে গেলে চলবেনা। তবে সেগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে মুখস্থ না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
৩. উপকরণ সংগঠিত ও অগ্রাধিকার দিন (১ ঘণ্টা)
আপনার শেখার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপকরণগুলিকে সাজান। উদাহরণস্বরূপ, একটি তালিকা তৈরি করে তা ধাপে ধাপে আয়ত্ত করার পরিকল্পনা করুন।
আপনি একাধিক তালিকা করতে পারেন। এটা হতে পারে নিজের জন্য নিজের একটা সিলেবাস বা পাঠক্রম বা পাঠটিকা তৈরী। এটি না করলে সঠিক জিনিস নাও শিখতে পারেন আবার পদ্ধতিগত ভুলের কারণে পরে ভুলেও যেতে পারেন।
যেমন-
ক) আপনি কি কি শিখতে চান? তার একটা প্রশ্ন তালিকা করুন। সব প্রশ্ন আগে মনে নাও আসতে পারে এজন্য কিছু স্টাডি করতে পারেন। আবার শিখতে শিখতেও প্রশ্নতালিকা পূর্ণ করতে পারেন।
খ) কোনটার পর কোনটা শিখবেন এটা টপিক বা পয়েন্ট আকারে নোট করে রাখুন।
গ) কোন জিনিসের সংজ্ঞা কি ? কোন উপকরনটি কি কাজে লাগে এগুলো যেকোনো ভাবে মনে রাখার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে ছবি দেখুন বা ভিডিও দেখুন প্রযোজ্যক্ষেত্রে মাঠ পর্যায় থেকে দেখে নিন। অন্ততপক্ষে নোট রাখুন।
ঘ) যেখানে সম্ভব বা প্রয়োজন হবে সেখানে হাতে কলমে শিখুন।
৪. দায়বদ্ধতা তৈরি করুন (১ ঘণ্টা)
আপনার শেখার লক্ষ্য পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করুন, যারা আপনাকে কাজ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে। দায়বদ্ধতা আপনাকে শেখার প্রক্রিয়ায় দৃঢ় থাকতে সহায়তা করবে। কাউকে জানান যে আপনি ৪৮ ঘন্টায় এই বিষয়টি শিখতে চলেছেন। প্রয়োজনে তাকে খোজ খবর নিতে ও আপনাকে প্রশ্ন করতে বলুন। আপনি ২ জন মিলে দুটো বা একই বিষয় ৪৮ ঘন্টার মধ্যে শেখার জন্য একটি প্রতিযোগিতাও করতে পারেন। সম্ভব হলে ৫/৭ জনের দল গঠন করেও একই কাজ করতে পারেন।
অন্তত নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা করতে পারেন। ৪৮ ঘন্টার রুটিন লিখে দৃশ্যমান জায়গায় ঝুলিয়ে রাখতে পারেন।
৫. শেখার প্রক্রিয়া শুরু করুন (৩০ ঘণ্টা)
এখন কাজ শুরু করার সময়। ছোট সময় ধরে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ান। দীর্ঘ সময় ধরে শেখার চেষ্টা করলে মানসিক চাপ বাড়তে পারে, যা এড়িয়ে চলুন।
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ৮ ঘন্টা করে ৬ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ৬ ঘন্টা করে ৮ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ৫ ঘন্টা করে ১০ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ৩ ঘন্টা করে ১৬ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ২ ঘন্টা করে ২৪ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন ১ ঘন্টা করে ৪৮ দিন
৪৮ ঘন্টা হতে পারে প্রতিদিন .৫ ঘন্টা করে ৯৬ দিন
সবচেয়ে ভাল কৌশল হলো। আপনি ১টার পর একটা শিখতে থাকুন। প্রতিদিন কিছুটা সময় দিন। দিন মাস ও বছর শেষে আপনি নিজেকে নতুন রুপে খুঁজে পাবেন।
তবে দুটো বিষয় খেয়াল রাখুন। সময় বাড়িয়ে দ্রুত শিখতে পারেন অথবা প্রতিদিন একটু একটু করে শিখতে পারেন। দুটোর একটা হতে পারে তবে কোনো ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা নষ্ট করবেন না। এমনও হতে পারে কোনোদিন ১ ঘন্টা কোনোদিন ১০ ঘন্টা। তবে কোনো ১টি দিনও যেন মিস না হয়।
৬. পুনরালোচনা (১ ঘণ্টা)
আপনার শেখা তথ্যগুলোকে বারবার পুনরালোচনা করুন। নিয়মিত ব্যবধানে পুনরালোচনা (যেমন: ১ ঘণ্টা, ১ দিন, ১ সপ্তাহ পর) তথ্যগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তরিত করে।
প্রয়োজনে যা শিখেছেন তা কারো সাথে শেয়ার করুন। আয়নার সামনে সেটা নিয়ে একটা বক্তব্য দিন। নিজে একটা আর্টিকেল লিখুন। নিজে নিজে পরীক্ষা দিন। এবং যা শিখেছেন তা করে দেখুন ঠিক ঠাক হচ্ছে কিনা?
৭. অনুশীলন ও প্রয়োগ (১০ ঘণ্টা)
মুখস্থ করা তথ্য বাস্তবে ব্যবহার করুন। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি ফরাসি ভাষা শিখে থাকেন, তাহলে স্থানীয় ফরাসি ভাষাভাষীদের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করুন। কীভাবে আপনার শেখা কাজ করছে তা যাচাই করুন এবং ফলাফলের ভিত্তিতে আপনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনুন।
এই ১০ ঘন্টা প্রাকটিস করুন। অবশ্যই পূর্বের ন্যায় ধারাবাহিকতা ও মনোযোগ বজায় রাখুন।
মনে রাখবেন আপনার মনোযোগ আপনার আগ্রহকে বাড়াবে।
শুধু রুটিন পূরণ করার জন্য শিখবেন না। অবশ্যই শেখার জন্য একটি লক্ষ্য ঠিক করুন। যেমন ইংরেজী শেখার লক্ষ্য হতে পারে ক্যারিয়ার, জার্মাণ শেখার লক্ষ্য হতে পারে তৃতীয় ভাষার দক্ষতা অর্জন। চাইনিজ শেখার অর্থ হতে পারে ব্যবসা করা। ফরেক্স শেখার অর্থ হতে পারে টাকা কামাই। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার লক্ষ্য হতে পারে নিজেদের পেশাদার জ্ঞান বৃদ্ধি। লক্ষ্য ঠিক করে শিখতে আসবেন আর প্রতিটি ধাপ শেষে আপনি ধরে নেবেন। আপনি লক্ষ্যের দিকে একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন।
তানসেল আলির উল্লেখিত কৌশলগুলো
১. কল্পনার শক্তি
কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে বিমূর্ত তথ্যগুলোকে জীবন্ত ও রঙিন ছবিতে রূপান্তর করুন। এটি আপনার মস্তিষ্কে তথ্য সংরক্ষণকে সহজ করে। প্রতিটি শব্দ ও বস্তুকে ছবি দিয়ে মনে রাখুন।
২. SMASHIN SCOPE পদ্ধতি
এটি স্মৃতি এবং সৃজনশীলতা বাড়ানোর জন্য তানসেলের উদ্ভাবিত পদ্ধতি। এখানে কয়েকটি কৌশল হলো:
Synesthesia: বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বাস্তবতা তৈরি। প্রতিটি জিনিসের ব্যবহার, রং, গন্ধ, স্পর্শ ও প্রাকৃতিক উৎস দিয়ে তাকে মনে রাখুন।
Movement: স্থির ছবিতে গতির সংযোজন। যেকোনো স্থির ছবিকে জীবন্ত করেও মনে রাখতে পারেন। যেমন- চলমান বাস।
Association: তথ্যের মধ্যে অর্থবহ সংযোগ তৈরি। যে তথ্যগুলো সামনে আসবে সেগুলো মনে রাখার জন্য সেগুলোর প্রভাব, কারণ ও ভালমন্দসসহ জানতে হবে। তাহলে মনে রাখা সহজ হবে।
Exaggeration: তথ্যকে অতিরঞ্জিত এবং আকর্ষণীয় করে তোলা। তথ্যকে কোনো মজার বিষয়ের সাথে মনে রাখতে পারলে তুলনা করতে পারলে বিষয়টা বোঝা সহজ হয়ে যাবে। যেমন বাংলাদেশের জনসংখ্যা কতো বেশী এটা বোঝার জন্য বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুসারে যদি আমেরিকাতে পৃথিবীর সব মানুষকে পূনবাসন করা হয় তাহলে সেখানকার ৫% জায়গা খালি থেকে যাবে ।
৩. Method of Loci
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে বাস্তব বা কল্পনার জায়গাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করুন। মনের মধ্যে সেই পথ বরাবর হেঁটে তথ্যগুলো পুনরুদ্ধার করুন। যেমন- আপনি একটি রেলগাড়ির ৫টি বগি কল্পনা করলেন। মনে করলেন রেলটি এসে থামলো প্রথম বগি থেকে নামলো Noun, পরের বগি থেকে Pronoun এভাবে চলমান চিত্র কল্পণা করে বিভিন্ন বিষয় মনে রাখা যায়।
৪. Mind Mapping
তথ্য সংগঠনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ধারণাকে ঘিরে উপ-ধারণাগুলো সংযুক্ত করুন। এতে শেখার কাঠামো তৈরি হয় এবং মনে রাখা সহজ হয়। যেমন আপনার হাতের ৫টি আঙুলকে ৫টি বিষয় মনে রাখার জন্য ব্যবহার করুন।
৫. দ্রুত পড়ার কৌশল
বাক্যাংশগুলো অর্থবহ অংশ হিসেবে পড়ুন। আঙুল বা কলমের সাহায্যে গাইড করে পড়ার গতি বাড়ান। না বুঝে কিছু পড়বেন না। বুঝুন এবং সেটি কল্পনা করে মনে গেঁথে নিন।
৬. নিয়মিত অনুশীলন
দ্রুত শেখার কৌশলগুলো প্রতিদিন চর্চা করুন। নিয়মিত চর্চা আপনাকে দক্ষতা উন্নত করতে সহায়তা করবে। যখনি যা শিখবেন। কোনো একটি বিষয়ের সাথে মিলিয়ে মনে রাখুন। শুধু পড়ে যাওয়া বা শিখে ভুলে যাওয়ার কোনো মানে নেই। যা পড়বেন তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। যা শিখবেন তা আপনার প্রয়োজন ও আগ্রহের ভিত্তিতে ঠিক করুন। শুধু শুধু একটার পর একটা শিখে যাওয়ার কোনো মানে নেই।
তানসেল আলির এই নির্দেশিকা এবং কৌশলগুলো অনুসরণ করলে আপনি যে কোনো নতুন দক্ষতা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শেখার আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন।
ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবলম্বনে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন

