হেঁটে হাজার কিলোমিটার

হেঁটে হাজার কিলোমিটার

হেঁটে হাজার কিলোমিটার
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
( জাহাঙ্গীর আলম শোভনের পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের ৯ বছর পূর্ণ হলো ২৮ মার্চ। ৪৬ দিনে ১২৭৬ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ভ্রমণের গল্পটি আবার তুলে ধরা হলো)

এই দেশটা আমাদের। আমরাই এই দেশকে গড়ব। সুখী সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ পেতে আমাদেরকেই আত্মনিয়োগ করতে হবে দেশের কাজে। সমস্যা আর সমালোচনার ভিড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আদায় হবে না। এই অনুসিদ্ধান্ত থেকে দেশের মানুষকে দেশগড়ানোর জন্য জাগিয়ে দিতে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম গত ১২ ফ্রেব্রুয়ারী ২০১৬। টানা ৪৬ দিন ধরে ১১৭৬ কিলোমিটার হেঁটে প্রতিদিন বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থী, কারখানার শ্রমিক, জমির কৃষক, পথের পথিক, গ্রামবাসী হাটুরে লোকজন সকলকে এই কথাই বলার চেষ্টা করেছি।
মানুষকে বলেছি, আমরা যার যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কিছু করব। এ ছাড়া তিনি শিশু নির্যাতন বন্ধ, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, বাল্যবিবাহ রোধ ও মাদকবিরোধী জনমত গঠন করার চেষ্টা করেছি। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের বলেছি, সমাজের যে স্তরেই থাকিনা কেন আমাদের দেশ ও জাতির প্রতি আমাদের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে জাতি আমাদের কাছে তা প্রত্যাশা করে। আমারদের উচিত প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু না কিছু করা। অনেক কিছু করতে না পারলেও আমরা অন্তত এতটুকু করতে পারি যে আমরা এমন কোনো কাজ করবো না যাতে আমাদের দেশের ক্ষতি হয়।

কেমন করে এলো এই ভাবনা
স্কুল জীবনে সবাই যখন কাল্পনিক গল্পের বই পড়তো আমি পড়তাম সত্যিকার অভিযানের গা ছমছম গল্পগুলো। বই পড়া শেষে স্বপ্নের ঘোরে হারিয়ে যেতাম সাইবেরিয়ার বরফঢাকা কোনো নদীর কাছে, দক্ষিণমেরুর দিগন্তজোড়া বরফ মোঠে, কোনো নির্জন দ্বীপে কিংবা পিরামিডের গোপন গহবরে। এমনিতে আমি বাংলাদেশের ৪২ টিরও বেশী জেলা এবং ভারত ও নেপালের কিছু এলাকা ভ্রমণ করেছি
বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালকে পর্যটন বছর বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাই এই বছরই পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পাড়ি দেব বলে ঘর থেকে বের হয়। অবশেষে শাহপরীর দ্বীপের গোলারচরে ২৮ তারিখ বিকেল ৫টায়। এ সময় লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি। স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের।
এই সফরে দেশের ১৮টি জেলা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছি। এই পথে হাজার কিলোমিটার রাস্তা হলেও পথে পথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেখাও সামাজিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহনের কারণে আরো দেড়শো কিলোমিটারেরও বেশী পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। মোট ১১৭৬ কিলোমিটার। আমাকে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন। পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে ট্যুর ডট কম ডটবিডি নামে একটি কোম্পানী। আর ট্রাকিং সেবা দিয়েছে দিনরাত্রিডটকম। প্রথমআলোসহ শ’খানেক পত্রিকা এ বিষয়ে সচিত্র সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সফরের বিবরনী নিয়ে ‘দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ’’ শিরোনামে লেখা বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায়। দেশ ও দেশের পর্যটন নিয়ে এবং দেশগড়ার ধারণা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা, আমার ধারণা, আমার পরামর্শ ও আমার অনুভূতিকে আমি একত্র করে পাঠকের সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম। নতুন ধাঁচের বইটি পাঠকের ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। বইটি প্রকাশ করেছে সাহিত্যদেশ। দেশের প্রকৃতি পরিবেশ ও পর্যটনের সমস্যা ও সম্ভাবনা যা দেখেছি তা তুলে ধরছেন এই বইতে।
বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ আমাকে যেভাবে সাদরে গ্রহণ করেছে এবং সহযোগিতা করেছে তা ভোলার নয়।
সফরের একবছর হয়ে গেছে। এখনো অনেকে ফোন করে বলেন তারা আমাকে দেখে হাঁটতে অনুপ্রাণীত হয়েছেন। অনেকে বলেন তারা সবসময় দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী আমাকে বলেছে তারা বড় হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। এটাই আমার কাছে প্রাপ্তি এটাই আমার স্বান্তনা। বেশকিছু শিশুকে স্কুলে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণীত করেছে অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করেছি। চট্টগ্রামে আমি স্বেচ্ছায় রক্তদান করে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। প্রায় প্রতিদিন পথে পথে দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করেছি আমার সাধ্যমত। আশাকরি দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ধরে রাখতে পারবো এবং সারা বছর আমি যেসব কাজ করি সেগুলো অব্যাহত রাখতে পারবো আর কখনো কখনো এরকম কিছু করে সবাইকে আমার বার্তাগুলো দেয়ার চেষ্টাও করবো।
প্রথম থেকেই আমি আমার পদযাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার উপর জোর আমার এই শ্রমসাধ্য পদযাত্রা থেকে যদি দেশ ও সমাজ উপকৃত হয় তবেই তা স্বার্থক। একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় জেগে উঠুন সকলের প্রাণে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply