Walking Shovon
পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে কক্সবাজারের চকোরিয়া এলাকায়

পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ

পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ

ভ্রমণসাহিত্যের জগতে কিছু নাম আছে যারা কখনো মানচিত্রকে শুধু ছবি হিসেবে দেখেনি। তারা নিজের পায়ের তলায় দেশটাকে মেপেছে, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত, যেন বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমির সঙ্গে একাত্ম হতে। তাদের পায়ের চিহ্নিত পথগুলো শুধু ভৌগোলিক দূরত্বের নীরব রেকর্ড নয়; বরং তা এক একটি জীবন্ত গল্প, এক একটি অদম্য ইচ্ছাশক্তির নীরব সাক্ষী।

তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ—এক প্রান্তের হিমালয়ের পাদদেশ থেকে অন্য প্রান্তের লোনা জলের সমুদ্র সৈকত। এই ১০০০৪ কিলোমিটারের (প্রায়) দীর্ঘ পথটি কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রের দৈর্ঘ্য নয়, এটি এদেশের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের কাছে এক অজেয় স্বপ্ন। পায়ে হেঁটে এই পথ পাড়ি দেওয়া মানে কেবল শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং নিজের ধৈর্য, মনোবল এবং বাংলার মাটি ও মানুষকে একদম কাছ থেকে চেনার এক মহাকাব্যিক প্রয়াস।

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

এই পথচলার অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো, একই যাত্রাকে কেউ হাঁটার মাধ্যমে আবার কেউ দৌড়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন। জাহাঙ্গীর আলম শোভন ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করেন এবং ৪৬ দিনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ পৌঁছান। ভ্রমণকালে তার স্লোগান ছিল। দেখবো বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ। তিনি মূলত ১১৭৬ কিলোমিটার ভ্রমণ করেন। তার আরেকটি স্লোগান ছিল ‘‘শিশুশ্রম বন্ধ করুন, শিশুদের বন্ধু হউন। তিনি বেশ কয়েকটি সামাজিক কাজে অংশ নেন। মূলত এটা ছিল তার সামাজিক ভ্রমণ। ফলে তার পথও বেশী হয় এবং সময়ও বেশী লাগে। পরে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি মনে করি মানুষই আমার সাবজেক্ট। প্রকৃতির নানা বৈচিত্র মানুষেই দেখা যায়। দেখতে চাইলে মানুষও দেখার জিনিস। তিনি এও বলেন, বাংলাদেশে ভ্রমণস্থানগুলোকে মানুষ যেভাবে নোংরা করছে তাতে তাদের আসলে আরো সচেতন হওয়া দরকার।

০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু  ৪৬ দিনে প্রায় ১১৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছান ২৮ মার্চ তারিখে। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি কোনো ব্যাগ নেননি। তিনি একটি ছোট হাতচালিত বেবিসিটার গাড়ি নিয়ে ভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণ নিয়ে লেখা দুটো বই, দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ ও পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।

শামসুজ্জামান আরাফাত

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার এই দূরত্বকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিলেন শামসুজ্জামান আরাফাত। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ থেকে দৌড় শুরু করে, নানা প্রতিকূলতার মুখেও তিনি থামেননি। বিশেষ করে, তাকে যখন যমুনা সেতু পার হতে দেওয়া হয়নি, তখন তিনি সাঁতরে যমুনা নদী পাড়ি দিয়েছিলেন। মাত্র ১৯ দিনে প্রায় ১০০৪ কিলোমিটার দৌড়ে তিনি পৌঁছান তেঁতুলিয়ায়, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। পায়ে হেঁটে অনেকে ভ্রমণ করলেও দৌড়ে পাড়ি দিয়েছেন শুধু একজনই।

আরাফাত (Ironman Arafat) এই পথটিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যান। তিনি কেবল হাঁটেননি, বরং পুরো পথটি দৌড়ে (Running) পাড়ি দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে টেকনাফ থেকে শুরু করে তেঁতুলিয়া পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল মাত্র ২০ দিন ১৫ ঘণ্টা।  প্রতিকূল আবহাওয়া এবং শারীরিক ধকল জয় করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটারের বেশি দৌড়ে তিনি এই অনন্য রেকর্ড গড়েন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুস্থ জীবনযাত্রার বার্তা পৌঁছে দিতে তার এই ‘গ্রেট বাংলাদেশ রান’ আজও দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা।

ডা. বাবর আলী: এভারেস্টজয়ীর সমতল জয়

এভারেস্টজয়ী চিকিৎসক বাবর আলী পাহাড়ের চূড়ার পাশাপাশি সমতলের দীর্ঘ পথকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত হেঁটে পাড়ি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অর্জনে হাঁটার বিকল্প নেই। তার পেশাদার জীবন এবং নেশার মধ্যে যে ভারসাম্য, তা এই ভ্রমণের প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠেছিল।

বাবার স্বপ্ন, ছেলের সঙ্গী

কখনো কখনো এই যাত্রা হয়ে ওঠে প্রজন্মের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সাদেক আলী সরদার (৬৭) ও তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান (৩৭) তাদের ৫০তম অভিযান হিসেবে ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদের মিশনটি ‘আলোকিত বাংলার স্বপ্নযাত্রা, আমরা করবো জয়’ স্লোগানকে বাস্তবায়িত করেছিল। এটি ছিল কেবল ভ্রমণ নয়, বরং একজন পিতার স্বপ্নকে ছেলের সহযাত্রায় বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত। বাবার স্বাস্থ্যগত অভ্যাস ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা থেকেই যাত্রার শুরু।

তহুরা সুলতানা রেখা: প্রথম নারীর জয়যাত্রা (২০২৪-২৫)

তাদের প্রত্যেকের যাত্রা কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না; ছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগ, নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন এক অনন্য অভিযান। শুরুতে যেমন তাহুরা সুলতানা নিজের ভালোবাসা ও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার অভ্যাস থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু পথিমধ্যে তিনি নিজেই এক অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জিরো পয়েন্ট থেকে রওনা হন। ৫১ দিন পায়ে হেঁটে ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি পৌঁছান পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্টে। তিনি হাঁটার গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছিলেন, এবং তার এই একা পদযাত্রা দেখিয়েছে, ব্যক্তি উদ্যোগে কীভাবে একটি জাতীয় বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

নারীদের জন্য এই দীর্ঘ পথ এককভাবে পাড়ি দেওয়া নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু সেই আগল ভেঙে দিয়েছেন তহুরা সুলতানা রেখা।  সামাজিক বাধা এবং দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ছাপিয়ে তিনি যখন বাংলাবান্ধায় জাতীয় পতাকা উড়িয়েছেন, তখন তা এদেশের প্রতিটি নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুসাফির মিজান ও দ্রুততম পদযাত্রার রেকর্ড (২০২২)

২০২২ সালে মুসাফির মিজান তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পথটি মাত্র ১৯ দিনে পাড়ি দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। কোনো সাপোর্ট টিম ছাড়াই তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। তার এই ভ্রমণটি ছিল মূলত তারুণ্যের শক্তি ও গতির এক বহিঃপ্রকাশ।  মুসাফির মিজান এর ফেসবুক পোস্ট ও ইউটিউব ভিডিও থেকে জানা যায়, এই যাত্রার ১৬তম দিনে তিনি একদিনে সর্বোচ্চ ৬০+ কিলোমিটার হাঁটার সক্ষমতা দেখিয়েছিলেন।

সাইফুল ইসলাম শান্ত

সাইফুল ইসলাম শান্ত ২০১৯ সালে সামাজিক প্রতিবাদ ও গুজবের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পদযাত্রা করেছিলেন। প্রায় ৩০–৩১ দিনে তিনি এই রুট অতিক্রম করেন। তার যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক সচেতনতা—বিশেষ করে গুজব ও গণপিটুনি প্রতিরোধ। তিনি পথের মধ্যে মানুষের সাথে কথা বলে সচেতনতা ছড়ানোর চেষ্টা করেন। পরে শান্ত পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন। এখনো তার ভ্রমণ চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

সাহেদ আহমেদ

মাত্র ১৭ দিনে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পৌঁছে যান—যা সময়ের দিক থেকে অত্যন্ত দ্রুত। তার যাত্রার মূল ফোকাস ছিল পরিবেশ সচেতনতা। তবে এই দ্রুতগতির কারণে তার যাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে কম “সামাজিক ইন্টারঅ্যাকশন”-নির্ভর।

তৌহিদ জোশী

২০২৫ সালে প্রায় ৩৩ দিনে তিনি এককভাবে এই পথ অতিক্রম করেন। তিনি আধুনিক প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে তার যাত্রা ডকুমেন্ট করেন। তার যাত্রা পরিবেশ ও জীবনযাত্রা সচেতনতার বার্তা বহন করে।

একক অভিযানের নানান প্রেরণা

তাদের অভিযানের পেছনের প্রেরণাও ছিল বৈচিত্র্যময়। একদিকে যেমন  অন্যদিকে রাকিব হাসান নদী দখল ও নদী বিলিনের প্রতিবাদে ২০২৩ সালে এই পথে পাড়ি জমান। মো. আকাশ আলী প্লাস্টিক দূষণ রোধে সচেতনতার বার্তা নিয়ে ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর তেঁতুলিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে মাত্র ২৫ দিনে ১০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ পৌঁছান। আকাশ আলী ও তাউজুল ইসলাম এঁরা দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তেঁতুলিয়া-টেকনাফ পদযাত্রা সম্পন্ন করেছেন। আকাশ আলী মূলত উত্তরবঙ্গের তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাইজুল ইসলাম তার ভ্রমণের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

এ জেড রহমান ২০১৫ সালে ‘এক্সপ্লোর বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে এই যাত্রা শুরু করে দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

এই যাত্রা কখনো থেমে থাকে না। সম্প্রতি টি এম খালিদ মাহমুদ প্রিজম ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ফেসবুকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৩০ দিনে এই পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ পৌঁছেছেন বলে জানা যায়।  সিয়ামুদ্দিন ও সাইমুদ্দিন নামের দুই সহোদর হাফেজ মাদকবিরোধী সচেতনতার বার্তা নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পায়ে হেঁটে যাত্রা করেছিলেন। সম্ভবত ২০১১ সালে জায়েদ খালেদ ও তার ৩ বন্ধু মিলে ‘‘নদী বাঁচাও’’ স্লোগানে ১৭ দিনে ভ্রমণ করে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। এছাড়া কায়াক চালিয়ে বাংলাদেশের একপ্রাপ্ত থেকে অপরপ্রান্ত ভ্রমণের গল্পও রয়েছে।

এই তালিকাটি পথিকৃৎ ব্যক্তিত্বদের গল্পের সারসংক্ষেপ মাত্র। তাদের সবার পায়ের চিহ্ন বাংলাদেশের মানচিত্রকে এক অনন্য গৌরবে ভাসিয়ে দিয়েছে। এই আয়োজনটি নিছক একটি তালিকা নয়; এটি স্বপ্নের এক বিস্তৃত আখ্যান, যেখানে প্রতিটি গল্পে আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রতিটি পদক্ষেপে আছে দেশের প্রতি ভালোবাসা, এবং প্রতিটি মাইলেজে আছে ‘পারবো’ এই দৃপ্ত প্রত্যয়।

সূত্র: পত্রিকা, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম
ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শোভনের সৌজন্যে