স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
জাহাঙ্গী আলম শোভন
তৃতীয় শিল্প বিপ্লব আমরা কতোখানি আত্তীকরণ করেছি বা করতে পেরেছি তার বিচারের আগেই আমাদের সামনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যাত্রা শুরু হয়েছে। তাই বলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব থেকে থাকবেনা আর আমরাও তা থেকে দূরে থাকতে পারবো না। বরং এভাবে বলি আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দক্ষতার মাপকাঠি যাই হোক প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুসারে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কাফেলায় আমাদের শামিল হতেই হবে।
ইতোমধ্যে কথা উঠেছে যে, স্মার্ট ও রোবটিক প্রযুক্তি বিশাল একটা অংশকে বেকার করে তুলবে অথবা বিকল্প কর্মের দিকে ধাবিত করবে। বিষয়টা যদি আমরা উপকারভোগী বা ভোক্তার দিক থেকে ভাবি তাহলে একদিকে আমরা দেখতে পাবো মানুষের জীবনকে আরো সহজ ও উপভোগ্য করতে নতুন নতুন প্রযুক্ত ধরা দিবে। কোনোকিছুই এমনি এমনি হয়না। এজন্য ভোক্তাকে বাড়তি খরচ গুনতে হতে পারে। যেমন মোবাইল ফোনের জন্য আমাদেরকে প্রতি মাসে একটি খরচ রাখতে হয়। যদিও মোবাইল ফোনের কারণে দূরে না গিয়ে অনেক কাজ করার কারণে খরচ সাশ্রয়ী হয় এমনটাই বাহ্যিকভাবে দেখা গেলেও। আমাদের জীবন ও জীবনযাত্রার ব্যায়ের মোবাইল যুগ ও মোবাইল পূর্ব যুগের বিশ্লেষণ করলে বিষয়টা বোধগম্য হবে।
সত্যিকার অর্থে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করে নাকি মানুষকে নির্ভরশীল করার মাধ্যমে আরো কঠিন করে তুলে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটা সত্য যে, মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে। প্রতিটি আবিষ্কার বা যন্ত্র বা সফ্টওয়ার মানুষের কোনো কোনো সমস্যা কিংবা একগুচ্ছ সমস্যার সমাধান করে থাকে। আর এজন্যই মানুষ প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে।
প্রযুক্তি সব কিছুতে গতি দেয়। আর গতি না থাকলে আমরা পিছিয়ে যাই। তখন আমরা সবাই এক সমান্তরালে শামিল হতে প্রযুক্তি গ্রহণ করি। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শুধু বিভিন্ন সেবাকে সহজ, সুন্দর ও গতিশীল করেছে তা নয়। প্রযুক্তিকে তথ্যকে দিয়েছে সুসজ্জিত ও সংরক্ষিত রুপ, একই প্রযুক্তি জবাবদিহিতার জন্য সহায়ক হয়েছে ঠিক একই কারণে মান উন্নয়ণ, যাচাই বাছাই ও অনুসন্ধানে সহজ করেছে।
এই সূত্র ধরে বলতে পারি আগামী দিনে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। রোবটিক্স, বিগডেটা, বøকচেইন, আইওটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলেজেন্সি ইত্যাদির ব্যবহার অনেক বেশী নিশ্চিদ্র সেবাদানে সহায়ক হয়ে উঠবে।
ইতোমধ্যে আমরা চ্যাটবটে রোবটের সাথে চ্যাটিং করার এবং কথা বলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। বিশ্বের অনেক দেশে ড্রোন ডেলিভারী এবং রোবট ডেলিভারী শুরু হয়েছে। একটি ছোট রোবট একটি পিজা বক্স নিয়ে আপনার ঘরের সামনে হাজির হবে। আপনি তাতে আপনার মোবাইলে আসা পিনকোড চাপ দিতে সে বক্স কুলে পণ্য বুঝিয়ে চলে যাচ্ছে। ইউরোপের রাস্তায় এই দৃশ্য এখন চোখে পড়ছে। ড্রাইভারবিহীন গাড়ির ধারণা এখন বিশ্বে পুরনো হতে চলেছে। কারণ ড্রাইভার বিহীণ বিমান আর সাবমেরিন তাদের কাজ করে চলেছে।
প্রশ্ন হলো, এ ধরনের প্রযুক্তিগুলো কিভাবে সেবার মান ও সেবার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে? আমরা অনেকে ই-ট্রেসিবিলিটির নাম শুনেছি। যা দিয়ে আমরা প্রতিটি পণ্যকে ট্রেস করতে পারি। যদিও আমরা ই-কমার্সের সুবাধে এবং গাড়ির জন্য জিপিএস ট্রেকার এর বদৌলতে ট্রেকার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। ট্রেকার হলো সে পণ্য যে আপনার অবস্থান নির্দেশ করতে পারে। আমি ই-ট্রেসিবিলিটি আর ট্রেকারকে আলাদা করে বোঝাতে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করছি। ই-ট্রেসিবিলিটি বাংলাদেশের কাজ করা শুরু করেছে। যদি একটা গল্পের মাধ্যমে বলি তাহলে বিষয়টা বোঝাতে সহজ হবে।
মনে করুন, আপনি আজ বাজার থেকে একটা ব্রয়লার মুরগি ও এক ডজন ডিম কিনে এনেছেন। দোকানে আপনাকে প্যাকের সাথে থাকা একটি কিআর কোড দেখিয়ে বলল এই প্রোডাক্টস সম্পর্কে জানতে আপনি এটা স্ক্যান করতে পারেন।
আপনি প্রথমে মোরগের পায়ের সাথে বা প্যাকেটে থাকা কোডটি স্ক্যান করলেন। সাথে সাথে একঝাক তথ্য ভেসে উঠল। মুরগির জাত, মুরগির বয়স, মুরগি কোন ফার্মে ছিল, কোম ফার্মে জন্ম হয়েছে, কি খেয়েছে? কি ভ্যাকসিন নিয়েছে? ফার্মের তাপমাত্রা কত ছিল? মাংসে কি কি খাদ্য উপাদান আছে? আরো নানা তথ্য। এতে করে আপনি জানতে পারলেন আপনি সঠিক পণ্যটি পেয়েছেন কিনা?
ঠিক একই ভাবে ডিম, মাছ, সবজি ও অন্যান্য তৈরী ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। গতবছর (২০২৩) এই প্রযুক্তি পোল্ট্রি শিল্পে ব্যবহার করে মানু ফার্মস পেয়েছে সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ পুরষ্কার। উল্লেখ্য আমি সে দলের একজন।
মাঝে মধ্যে ডিমের বাজারে কারসাজি হয়। এই পদ্ধতি বিভিন্ন পন্যের দাম সম্পর্কে ধারণা দিতেও কাজ করতে পারে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকার আলাদা দাম সম্পর্কে ইনপুট নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এভাবে বিগডেটা প্রযুক্তির দ্বারা দেশের সব জায়গায় পন্যের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সাম্ভাব্য দাম নির্ণয়ের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর কারসাজি ধরাও কঠিন কিছু হবে না। তবে প্রযুক্তির বাহ্যিক ও ব্যবহার্য অংশ সহজ এবং আরামদায়ক হয় কারণ এর গঠন ও পেছনের অংশে ব্যাপক কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়। বিগডেটা হলো ব্যাপক এবং প্রচুর তথ্যের সম্মিলন ও বিশ্লেষণ। যার মানে হলো যত বেশী সঠিক তথ্য দেয়া যাবে তত ভাল ফল পাওয়া যাবে। এসব তথ্য শুধু একটা কাজ নয় অনেক কাজেই লাগবে। চাহিদা নির্ধারণ, উৎপাদন ঠিক করুন এবং ভোক্তার রুচির গতি প্রকৃতি নির্ধারণ ফলে অনেক কাজই তখন সহজ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা পৃথিবী সেদিকে যাচ্ছে আমদেরও যেতে হবে।
কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা অনেক কাজকে সহজ করে দিচ্ছে। কিছু সমস্যার সমাধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা করা সম্ভব। যেমন প্রস্তাবিত সিসিএমএস-এ যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করা যায় তাহলে খুব সাধারণ সমস্যাগুলো সমাধানে কোনো মানুষের হাত লাগবেনা। যেমন- একজন অভিযোগ করলো আমি সময়মতো পণ্য পাইনি। যদি বিক্রেতা অভিযোগ শিকার করে তাহলে আইন অনুযায়ী যে সিদ্ধান্ত সেটা জানিয়ে দিবে। আইনের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার হওয়া শুরু হয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
বøকচেইন এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি। এর দ্বারা ডিজিটাল মূদ্রা কিংবা সনদের সত্যয়ন নিশ্চিত ও জাল ঠেকানো শুধু নয়। বøকচেইন যেকোনো ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধের মাধ্যম হতে পারে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে বেকার হওয়ার ঝুঁকি রোধ করার দুটি উপায় রয়েছে। প্রথমত হচ্ছে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করা শিখতে হবে দ্বিতীয়ত হলো স্মার্ট প্রযুক্তির দ্বারা নতুন নতুন উদ্ভাবনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) , সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন। ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরষ্কার ২০২১ ও স্মার্ট বাংলাদেশ পুরষ্কার ২০২৩ প্রাপ্ত।

