ইসলাম আতংক না আদর্শ

স্বামী লক্ষ্মী শংকরাচার্য: কেমন করে সত্য জানলেন

আমি যখন সত্য জানলাম

স্বামী লক্ষ্মী শঙ্করাচার্য

স্বামী লক্ষ্মী শঙ্করাচার্য একজন ভারতীয় হিন্দু ধর্ম বিষয়ক চিন্তাবিদ। তিনি গত ২০০৮ সালে কতিপয় লোকের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ইসলাম বিরোধী একটি বই লিখেন। পরে ইসলাম সম্পর্কে আরো জানতে গিয়ে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং আরেকটি বই লেখেন। ইসলাম আতংক নয় আদর্শ নামের বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর আলম শোভন। সে বইয়ের পেছনের গল্পই এখানে তুলে ধরেছেন- স্বামী লক্ষ্মী শঙ্করাচার্য।

বছর কয়েক আগে আমি এক ধরনের সত্য জানলাম। সেটা ছিল দৈনিক জাগরনে ‘দাঙ্গা কেন হয়’ শিরোনামে একটি লেখা পড়ার পর। কারণ এ প্রবন্ধে কুরআন মাজীদে হিন্দু কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সংক্রান্ত জন্য কিছু আয়াতকে মুসলিম দাঙ্গা হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে প্রবন্ধে কুরআন মাজীদের সে আয়াতগুলোর উদ্ধৃতি দেয়া ছিল। পরে দিল্লি থেকে প্রকাশিত কুরআনের চব্বিশটি আয়াত সম্বলিত একটি পুস্তিকাও কোনো ব্যক্তি আমাকে দিয়েছিল। যেসব আয়াতে মুসলিমদের যুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে অন্য দেবতার অনুসারীদের বিরুদ্ধে, সেগুলো সে কাগজে ছিল।
এটা পড়ার পর আমার মনে ইচ্ছা হলো, আমিও কুরআন পড়ে দেখব। তাই আমি একটি ইসলামী বই দোকানে গিয়ে কুরআনের হিন্দী অনুবাদও পেয়ে গেলাম। কুরআন মাজীদের অনুবাদ থেকে আমি সেসব আয়াত পেলাম যেগুলো ওই চটি বইটাতেও ছিল। এতে করে আমার মনে এক ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হলো, ইতিহাসে হিন্দু রাজা ও মুসলিম বাদশাদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ এবং বর্তমানে সংঘটিত দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণ হলো ইসলাম এবং কোরআনের এসব আয়াত। আমার মাথায় এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, আর সন্ত্রাসী ঘটনায় ইসলামের সম্পর্ক দেখতে শুরু করলাম।
আমার মন সত্যি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। এ বিভ্রান্তিকর মন নিয়ে আমি ধারণা তৈরি করেছি, আমার আশপাশে যে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, তাকে আমি ইসলামের সাথে গুলিয়ে ফেলছি। তখন ইসলাম সম্পর্কে আমার জ্ঞান, মুসলিম বাদশাহদের অতীত ইতিহাস এবং আজকের বিভিন্ন জঙ্গিবাদী ঘটনা মিলিয়ে একটি বই লেখেছি, ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস’, যার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। (সিতাকুঞ্জ, লিবার্টি গার্ডেন, রোড নং ৩, মালাদ (পশ্চিম) মুম্বাই ৪০০ ০৬৪ থেকে।
পরবর্তীতে আমি ইসলাম ধর্মের আলেমদের কাছ থেকে জেনেছি, ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোন সম্পর্ক নেই। প্রেম, সদ্ভাব এবং ভ্রাতৃ-প্রতিম ধর্ম হলো ইসলাম। কোন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলাম ধর্মবিরোধী। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া বা ধর্মাদেশ জারি আছে ইসলামে।
এখন প্রশ্ন হলো, সে সব আয়াত আমি পড়েছি সেগুলো এবং তাদের সে অর্থ বা ব্যাখ্যা কোথা থেকে এলো।
এরপর আমি কুরআন মাজীদে থাকা সেসব জিহাদ সম্পর্কিত বাক্যগুলো সম্পর্কে জানার জন্য মুসলিম পন্ডিতদের কাছে গেলাম। তাঁরা আমাকে বললেনকুরআন মজীদের সব আয়াতই তৎকালীন ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে এসেছে। এ জন্য কেবল কুরআন মজীদের শুধু অনুবাদ না দেখে বরং সে সঙ্গে এটাও দেখা দরকার, কোন আয়াত কোন পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। তাহলেই তার মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য বোঝা যাবে এবং কুরআন ও ইসলাম বুঝা সহজ হবে।
এসব আয়াত আসলে এমন সব লোকদের সম্পর্কে এসেছে যারা সত্যেকে বাঁধাগ্রস্ত করছিল আর ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। সত্য ধর্মের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ওই লোকদের বিরুদ্ধে কুরআনে জিহাদের নির্দেশ রয়েছে। তারা আমাকে এও বলেছিলেন, ইসলাম সম্পর্কে না জানার কারণে লোকেরা কুরআনের পবিত্র আয়াতের আসল অর্থ বুঝতে পারে না। কুরআন মজীদের সাথে সাথে আপনি যদি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনী পড়ে নেন তাহলে আপনি আর বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ রাসূল (স.)-এর জীবনী হচ্ছে কুরআনের ব্যবহারিক রূপ।
মুসলিম আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী, আমি প্রত্যেকের সামনে নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) -এর জীবনী পড়ি। তারপর, খোলা ও পবিত্র মন নিয়ে কুরআন মজীদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ি।

তখন আমি সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারি। পড়ার পর কুরআন মজীদের সেসব আয়াত আমি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। সত্য অনুধাবনের পর আমি বুঝতে পারলাম, আমি অজ্ঞাত ও বিভ্রান্ত ছিলাম এবং এজন্যই আমি আমার বই ‘ইসলামিক সন্ত্রাসের ইতিহাস’ লেখেছি। এখন সন্ত্রাস ইসলামের সাথে যুক্ত, একথা ভাবতেই আমার মনে কষ্ট লাগে। এ সঙ্গে এটাও ঠিক, পরিবত্র কুরআন মজীদ ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.) -এর উপর প্রেরণ করা হয়েছিল। অতএব কুরআনের সঠিক মর্মার্থ অনুধাবন করার জন্য আল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধ মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়াটা দরকার।
আমি আল্লাহর কাছে, রাসূল মুহাম্মদ (স.)-এর কাছে এবং সব মুসলিম ভাইদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আমার অজ্ঞানতাবশত লিখিত ও ব্যক্ত কথাগুলো আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি। জনগণের আছে আমার নিবেদন, ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস’ গ্রন্থে যাকিছু লেখেছি সেসবকে কিছুই মনে করবেন না। মনে করবেন তা বাতিল বা শূন্য।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply