Osman hadi

স্বাধীনতা-পরবর্তী আন্দোলন: জুলাই অভ্যুত্থান ও ভবিষ্যৎ

স্বাধীনতা-পরবর্তী আন্দোলন: জুলাই অভ্যুত্থান ও ভবিষ্যৎ

বিপ্লবের ফল কি জনগণ ভোগ করবে?
১৭৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব হলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সরে গেল। বিপ্লব সফল হলো। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলো না। কারণ আমরা স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বিপ্লবের ফসল তুললো ব্রিটিশ সরকার।
১৯৪৭ সালে ধারাবাহিক বিপ্লব ও বিশ্বযুদ্ধের ফল হিসেবে দেশ স্বাধীন হলো তথা দেশ ভাগ হলো। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার সুফল লুট করে নিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি।
১৯৭১ সালে দেশকে আমার স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ দিলো লাখো শহীদ। এবারো জনগন সামান্যই ফল ভোগ করলো। মূল ফসল চলে গেলো আওয়ামী লুটেরা আর তাদের তাবেদার প্রভুদের ঘরে।
২০২৪ সাল এলো রক্তঝরা এক অনাবিল মুক্তি। আমাদের এই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে হায়েনারা চারদিকে নি:শ্বাস ফেলছে।

স্বাধীনতার চেতনার পুনর্জাগরণ নাকি নতুন সংগ্রামের সূচনা?

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা কোনো সমাপ্তি নয়—এটি একটি ধারাবাহিক যাত্রা। ১৯৭১ সালে আমরা একটি রাষ্ট্র, একটি মানচিত্র এবং একটি পতাকা অর্জন করেছি। কিন্তু সেই পতাকার মর্যাদা, সেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ—তা প্রতিনিয়ত রক্ষা ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হয়েছে।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু আন্দোলন, অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং স্বাধীনতার চেতনার পুনর্জাগরণের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

স্বাধীনতার পর আন্দোলনের ধারাবাহিকতা

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়, তা ছিল জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশে রাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন আন্দোলন ও অভ্যুত্থান দেখা যায়। প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন দাবি, কিন্তু একটি সাধারণ সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়— রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফাঁক।এই ফাঁক যত বেড়েছে, আন্দোলনের তীব্রতাও তত বৃদ্ধি পেয়েছে।

জুলাই ২০২৪: একটি পুনর্জাগরণের মুহূর্ত

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে অনেকেই স্বাধীনতার চেতনার পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখেন।  এই অভ্যুত্থানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল— এটি শুধুমাত্র ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং একটি হারিয়ে যাওয়া আদর্শ পুনরুদ্ধারের দাবি নিয়ে গড়ে উঠেছিল। একে “বেহাত বিপ্লবকে হাত করার চেষ্টা” বলা যেতে পারে— অর্থাৎ, যে স্বাধীনতা একসময় অর্জিত হয়েছিল, কিন্তু সময়ের সাথে তার প্রকৃত চেতনা ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, সেটিকে পুনরুদ্ধারের একটি প্রয়াস।

১৯৭১ বনাম ২০২৪: তুলনা নয়, ধারাবাহিকতা

অনেক সময় ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে তুলনার মধ্যে ফেলা হয়, যা আসলে একটি ভুল পদ্ধতি। ১৯৭১ ছিল— রাষ্ট্র অর্জনের লড়াই, অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, একটি পতাকা ও মানচিত্রের জন্ম|  অন্যদিকে ২০২৪— সেই রাষ্ট্রের ভেতরে ন্যায়বিচার, অধিকার ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আর পতাকার প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা

তাই বলা যায়: ১৯৭১ আমাদের পতাকা দিয়েছে, ২০২৪ সেই পতাকার অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন তুলেছে।

জুলাই চেতনা: তাৎপর্য ও স্থায়িত্ব

জুলাই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য শুধু এর তাৎক্ষণিক ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। এর গুরুত্ব কয়েকটি কারণে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে: এটি একটি নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছে, স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে ও রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যতদিন এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য পূরণ না হবে, ততদিন এর আলোচনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে, ইতিহাসের পরিমাপে ১৯৭১-এর গুরুত্বই সর্বাধিক থাকবে—কারণ সেটিই এই রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্ত।

অসম্পূর্ণ লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— যে আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হয় না, তা কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না।

যদি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় বা অপূর্ণ থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও নতুন আন্দোলনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেই সময়— আজকের সমর্থকরা কেউ বিরোধী অবস্থানে যেতে পারে এবং নতুন প্রজন্ম নতুনভাবে পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হতে পারে। এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক চক্র।

পক্ষ-বিপক্ষের নতুন বিন্যাস

যেমন ১৯৭১ সালে পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারিত হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে, তেমনি ২০২৪ এবং ভবিষ্যতের আন্দোলনগুলোতেও নতুন করে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সময়ের সাথে সাথে অবস্থান পরিবর্তিত হয়, কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—কে জনগণের পক্ষে, কে তাদের বিরুদ্ধে?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া—এটি কোনো একক ঘটনা নয়। ১৯৭১ আমাদের রাষ্ট্র দিয়েছে।
২০২৪ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে— রাষ্ট্র থাকলেই স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না, তাকে অর্থবহ করতে হয়।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্ভর করবে— আমরা এই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখি, এবং স্বাধীনতার চেতনাকে কতটা সৎভাবে ধারণ করি তার উপর।

এই সুফল কেড়ে নিতে যতটা না উদগ্রীব ১৭ বছরের বঞ্চিতরা। তারচেয়ে বেশী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাবেদার ও তাদের দোসর রাজাকারেরা। এটা থাকবেই। আমরা যদি নিজেদের ফসল নিজেরা ঘরে তুলতে না পারি। অন্যদের দোষ দিয়ে পার পাওয় যাবে না। তাই এখন থেকে সজাগ ও সচেতন থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটু ব্যর্থতায় সুযোগ পাবে হায়েনারা।

সবশেষে বলা যায়—
স্বাধীনতার সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না; এটি কেবল রূপ বদলায়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply