সেন্ট পল ক্যাথেড্রাল (St. Paul’s Cathedral) খ্রিস্টান বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও মহিমান্বিত গীর্জা। ভ্যাটিক্যানের পরই এর অবস্থান বলা হয়ে থাকে। লন্ডন শহরের সর্বোচ্চ স্থাপনার মধ্যে একটি এই ক্যাথেড্রাল লুডগেট হিলের ওপর সৌন্দর্যে ও ইতিহাসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজকের সেন্ট পল ক্যাথেড্রাল যে রূপে দেখা যায়—তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, ধ্বংস, পুনর্নির্মাণ এবং চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর অনন্য মেলবন্ধন।
বর্তমান সেন্ট পল ক্যাথেড্রালের স্থানে বহু শতাব্দী আগে ডায়না (Diana) দেবীর একটি মন্দির ছিল। খ্রিস্টধর্ম ব্রিটেনে আসারও আগে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়।
সপ্তম শতাব্দীতে কেন্টের খ্রিস্টান রাজা ইথেলবার্ট (Ethelbert) এই প্রাচীন মন্দিরটি ভেঙে সেখানে প্রথম সেন্ট পল গীর্জা নির্মাণ করেন। এরপর এটি ব্রিটেনের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে এক বিশেষ স্থান দখল করে নেয়।
১০৬৬ সালে ইংল্যান্ডে নরম্যান আক্রমণের সময় গীর্জাটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়। পরে এটি পুনর্নির্মাণ করা হলেও পূর্বের চেয়ে অনেক বড় ও সুদৃশ্য রূপ লাভ করে। এই সংস্কারিত গীর্জার নামই পরবর্তীতে পরিচিত হয় Old St Paul’s নামে।
কিন্তু এই বিশাল গীর্জাও স্থায়ী হয়নি। ১৬৬৬ সালের ভয়াবহ লন্ডন অগ্নিকাণ্ডে পুরো পুরনো গীর্জাটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ধ্বংসের এই ট্র্যাজেডির মধ্যেও আশার আলো ছিল। কারণ অগ্নিকাণ্ডের মাত্র চার মাস আগে বিখ্যাত স্থপতি স্যার ক্রিস্টোফার রেন (Sir Christopher Wren) পুরনো গীর্জাটিকে নতুন নকশায় রূপান্তর করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গীর্জা যখন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল, তখন তাকে বলা হলো—মেরামত নয়, সম্পূর্ণ নতুন গীর্জার একটি নকশা তৈরি করতে।
রেন ছিলেন সৃজনশীল ও দূরদর্শী স্থপতি। তিনি কয়েক মাস সময় নিয়ে এক অভূতপূর্ব স্থাপত্যশিল্পের নকশা তৈরি করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
রেনের নকশা অনুযায়ী নতুন সেন্ট পল ক্যাথেড্রাল নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় ৩৫ বছর। গীর্জার কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল একটি গম্বুজ (Dome), যা লন্ডনের আকাশরেখায় বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর। গম্বুজের ভেতরে আরও একটি অভ্যন্তরীণ গম্বুজ এবং তার মধ্যবর্তী অংশে আছে ফাঁপা মৌচাকৃতি কন (Cone), যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাতি, গোলক (Ball) এবং ক্রস (Cross)।
এই ক্রসটি মাটি থেকে মোট ১১১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত—যা সেন্ট পলকে আরও বিশাল ও মর্যাদাবান করে তোলে।
মূল গম্বুজের ভেতরে রয়েছে বিখ্যাত Whispering Gallery। এর দেয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে আলতো করে ফিসফিস করে কথা বললেও প্রায় ৩০ মিটার দূরের অপর পাশ থেকেও সেটি পরিষ্কারভাবে শোনা যায়। স্থাপত্যের এমন নিখুঁত শব্দপ্রতিফলন গুণ আজও দর্শনার্থীদের বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয়।
গম্বুজের উপরের গোলকটি ফাঁপা এবং সোনার পাতে মোড়া। এই গোলকের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় দশজন মানুষ দাঁড়াতে পারে। এটি ক্যাথেড্রালের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ।
সেন্ট পল ক্যাথেড্রালের ভেতর সমাধিস্থ করা হয়েছে ব্রিটেনের তিনজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে। এ বিরল সম্মান পেয়ে থাকেন—
-
স্যার ক্রিস্টোফার রেন – সেন্ট পলের স্থপতি
-
অ্যাডমির্যাল হরেশিও নেলসন – ট্রাফালগার যুদ্ধ (১৮০৫)–এর নৌবীর
-
ডিউক অব ওয়েলিংটন – ব্রিটিশ সামরিক বীর
এ পর্যন্ত এই তিনজনকেই এই বিশেষ সম্মান জানানো হয়েছে।

