সুবোধ

সুবোধ, তুমি এখন আসতে পারো ( ছোট গল্প)

ছোট গল্প

সুবোধ, তুমি এখন আসতে পারো

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

সুবোধ আজ ঢাকায় যাচ্ছে। মানে জীবনে প্রথম নয় তবে চাকরী করার জন্য প্রথম। এর আগে চাকরীর সাক্ষাৎকার দিতে এসেছিলো। পরিচিত এক বড়ভাই তারজন্য একটা চাকরী ঠিক করেছে। ভালোই হলো। বড়ো বড়ো অফিসে চাকরীর ইন্টারভিউ দিয়ে তার চাকরী হয়নি। গ্রামের কলেজ থেকে পাস করেছে তারউপর আবার কথাবার্তায় আঞ্চলিক টান। বাস স্টেশানে নেমো সোজা ঠিকানামতো সেই অফিসে। অফিসের বস অফিসেই ছিলেন। এক ঘন্টা পর ডাক পড়লো।

– আসসলামু আলাইকম

– নাম কি?

– খায়রুজ জামান সুবোধ

– সুবোধ? নাম শুনেতো হিন্দু মনে হয়।

– স্যার বাঙালী মুসলমানদেরতো মুসলিম নামের সাথে বাংলা নাম রাখার ট্রাডিশান।

– হু দেখতেও তুমি সুবোধ বালক। মনে হয় লেখাপড়া করো। বেশভালো।

– তা কি কাজ করতে হবে জানো তো?

– জি স্যার। অফিসের কাজ?

– অফিসের কাজ মানে কি সেটা জানো তো?

– জি, অফিসের সব কাজ।

– ভালো। টাকা কিন্তু ৫ হাজারের বেশী দিতে পারবো না। চলবে?

– স্যার আমি ঠিক জানি না। এখানে আমার থাকা খাওয়া কতটাকা লাগবে। আমি নিজে চলতে পারলে হবে। পরে আমার কাজ দেখে আপনি আমাকে বাড়িয়ে দেবেন। নইলে আমি যোগ্য হলে অন্য কোথাও দেখে নেব।

– বাহ। বেশ ভালোতো। চাকরীতে জয়েন না করতেই অন্য কোথাও যাওয়ার পাঁয়তারা। এজন্য আজকাল কাউকে বিশ্বাস করি না।

– কিন্তু স্যার আমি যতই বলি, আমি কোথাও যাবো না। এখানে পড়ে থাকবো। সত্যিটা হলো আমি ভালো কোনো সুযোগ পেলে অন্যত্র চেষ্টা করবো আর আপনার যদি আমাকে কাজে লাগানোর না থাকে তাহলে আপনিও আমাকে নোটিশ করে দেবেন। মিথ্যে আদিখ্যেতা দেখিয়ে লাভ কি?

– ওকে, আর কথা নয়। আমি তোমাকে নিয়ে নিচ্ছি। তবে ৬ মাসের জন্য। কারণ এরকম নীতিকথাতো অনেকেই বলে শেষে আর ওসবের ধারে কাছে থাকেনা। ৬ মাস পর তোমাকে রাখবো কিনা জানাবো এবং বেতন বাড়াবো। এখন ৫ দিয়ে শুরু কর। ম্যানেজার তোমাকে কাজ বুঝিয়ে দেব।

এভাবে চাকরী শুরু হলো। ছয়মাস নয় চার বছর হয়ে গেলো। বেতন বাড়লো ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার।

বসের একটি সুন্দরী মেয়ে রয়েছে। ঢাকা শহরে যার চারটি বাড়ি আর বিদেশে ব্যবসা। তার সুন্দরী মেয়ে কর্মচারীদের কাছে সিনেমার নায়িকার মতো। কখনো কখনো এক ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে গল্প অন্যরকম। মেয়েটি প্রতিবন্ধী। মানসিক দিক দিয়ে তার অপূর্নতা আছে শারীরিক দিক থেকেও কিছুটা কমতি আছে। কিন্তু তার ছোটবোনোর বিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স হয়ে গেছে। গায়ে গতরে যৌবন ঢলে পড়ছে। মা বাবা একটু বিব্রত। কারণ ওড়না ঠিক করার মতো মানসিক শক্তি তার নেই। বাইরের লোকের সামনে কিভাবে যেতে হবে তাও তার জানা নেই।

অফিসের সব কাজ করে সুবোধ। বসের সব কথা শুনে। বিশ্বস্থ এবং সৎ। বসের বাসার কিছু কাজও তার হাতে চলে যায়। যেমন

– এই সুবোধ শোন

– জি স্যার

– অফিসের পানি লাইনে সমস্যা হওয়ার তুমিনা একজন মিস্ত্রি নিয়ে আসছিলা। লোকটাতো ভালোই কাজ করে। বাসার লাইনেতো সমস্যা। ওকে একটু ডেকে আনো তো।

এভাবে বাসার বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধানের সাথে জড়িয়ে যায় সুবোধ। মিসেসের নজর পড়ে সুবোধের দিকে।

– তুমি কি মেয়েটাকে নিয়ে কিছু ভাবো? নাকি সব জ্বালা আমার।

– কি ভাববো? লোকজনকে কি বলা যায়, আমার একটা ডিজএবল ডটার আছে। একটা সুপাত্র দেখেন প্লিজ।

– সুপাত্র কেউ কাউকে দেখে দেয়না। তাদের কাছে সুপাত্র থাকলে তার কাছে তারা তাদের মেয়ে বিয়ে দেবে তোমার মেয়ে নয়। তোমার মেয়ের সুপাত্র তোমাকে খুঁজে নিতে হবে।

– তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে পত্রিকায় এড দিতে হবে?

– তুমি কাজ নিয়ে থাকো। আর অন্যকোনো দিকে মনোযোগ দেয়ার দরকার নেই।

– তুমিই বলো কি করতে হবে?

– একটা ভালো ছেলে দেখ। পরিচিতর মধ্যে।

– দেখ আমি আত্মীয় স্বজনকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাইনা।

– তোমাকে কে বলেছে আত্মীয় স্বজনকে জড়াতে?

– কি করতে বল তুমি।

– দেখ আমাদের মেয়েটা  আর দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক না। তাকেতো কেউ এমনি এমনি বিয়ে করতে আসবে না।

– এটাইতো সমস্যা। যারা বিয়ে করতে আসবে। তারা হয়তো লোভী নয়তো বাটপার। তুমি আমি কয়দিন থাকবো। মেয়েটাকে তার হাতে তুলে দেব। তারপর তার স্বার্থ হাসিল হলে একদিন মেয়েটাকে মেরে দিয়ে সে নতুন সংসার পাতবে। চারদিকে সব কি হচ্ছে দেখনা?

– দেখেই বলছি। তুমি তোমার চোখের সীমানা থেকে ভালো দেখে একজনকে নিজেই বেছে নাও। লোভি লোকদেরকে আনার দরকার কি?

– একটু ঝেড়ে কাশোতো, তুমি কি বলতে চাও?

– এইযে সুবোধ ছেলেটা। ছেলেটাকে তোমার কেমন লাগে?

– ভালো ছেলে, গরীবের ছেলে, সততা আছে। বেশ দায়িত্বশীল। কিন্তু তারওতো একটা স্বপ্ন আছে। ছেলেটার এখনো বয়স কম। তাছাড়া তার মা বাবা আছে। ছেলেটা রাজি হলে তার মা বাবা রাজি হবে কিনা?

– ছেলেটার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য আমরা হেল্প করবো। মেয়ের নামে একটা বাড়ি আছে। কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স আছে। আমরা তাকে ব্যবসায় বানিজ্য ধরিয়ে দেব। আজকাল ঢাকা শহরে কতটাকা সেলারী পেলে সে এসব স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। ছেলেটার মধ্যে মায়া আছে। যদি রাজি হয়। তাহলে মেয়েটাকে প্রতিবন্ধী বলে কোনো অবজ্ঞা করবে না। আমার অন্তত তাই মনে হয়।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে স্ত্রীর সাথে একমত হলেন ইশতিয়াক সাহেব। মনে মনে ভাবলেন আসলে কাজের ছাপে মেয়েটার একটা গতি করার কথা ভুলে গেলেন। মনে মনে স্ত্রীর বুদ্ধির প্রশংসা করলেন। আর সুবোধের বেতন বাড়িয়ে দিলেন। তাকে আরো বেশী বাসার কাজে লাগালেন। ‍তিনি নিজে ২বার বিদেশ যাওয়ার সময় সাথে নিয়ে গেলেন। বিষয়টা অফিসের অন্য স্টাফদের চোখে পড়লো। এবং তারা প্রথমবারেই সেটাই সন্দেহ করলো যা সত্যি।

অফিস স্টাফরা প্রথমে আড়ালে আবেড়ালে কানাঘুষা শুরু করলো। তারপর প্রকাশ্যে বলতে লাগলো।

-কিহে সুবোধ বালক। কপালতো খুলে যাবে। ইশতিয়াক সাহেবের মেয়ের জামাই হতে চলেছেন।

সুবোধ হেঁসে উড়িয়ে দিলো।

একদিন বস অফিসে নেই। সবাই মিলে জেঁকে ধরলো সুবোধকে। সত্যি বল ঘটনাকি। তুমি কি ও প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে বিয়ে করছো, টাকার লোভে?

– কি বলেন ভাই, এমনটা কেন হবে? ওই মেয়ের সাথে  আমার বিয়ের কথা আসবে কেন?

– আমরা কিন্তু সব বুঝি। আজ পর্যন্ত ইশতিয়াক সাহেব কোনো স্টাফকে বিদেশ নিয়ে যায়নি।

– জানি না, ভাই। এসব ভাবার সময় নেই।

– আচ্ছা বলইনা ভাই। তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে কি করবে? রাজি হবে?

– সেটাতো এখনো জানি না।

– তবে ভাই তোমার জন্য এতকিছু করলো, তুমি কিন্তু ফেঁসে গেছ ওই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে তোমার।

– হলে করবো, অসুবিধা কি?

কিন্তু সত্যি অসুবিধা হয়ে গেলো। তার কিছুদিন পর এক আত্মীয়  মারফত প্রস্তাব দেয়া হলো সুবোধকে। সে আসলেই ব্যাপারটা সত্যি হবে ভেবে দেখেনি। তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো সে এই কাজ করবে না। তার মনে হলো তার দারিদ্রতা নিয়ে তাকে কিনে নিতে চাইছে। কিন্তু মুখের উপর না করার ক্ষমতাও তার ছিলো না। সে মুখে মৃদু সম্মতি দিলো আর একটু সময় নিলো। মনে মনে একটা ফন্দি আঁটলো।

শুরু হলো তার অলিখিত জামাই আদর। অফিসে নয়, বাসায়। এদিকে সে বুদ্ধিমত কাজ শুরু করে দিলো মাস দুয়েক পর। সে বাসার কাজের লোকদের খবরদারী শুরু করলো, না বলে কিছু কাজ করলো, ইশতিয়াক সাহেব আর তার স্ত্রীর সব কথা শুনলো না। আর ওই মেয়ের ধারে কাছে যাওয়াই বন্ধ করে দিলে। তারা আশংকিত হলেন। ভাবলেন বিয়ের পরে এই ছেলেতো আপদ হয়ে দাড়াবে। এজন্যই গরীবদেরকে উপরে তুলতে নেই। তাদেরকে তাদের মতই রাখা উচিত।

মাস তিনেক এভাবে চলার পর। স্বামী স্ত্রীর মনে হলো তারা ভুল করছেন। ছয়মাসের মাথায় তারা তাদের সিদ্ধান্ত বদলালো এবং সুবোধকে জানিয়ে দিলো যে, তার কাজকর্মে তারা অসন্তুস্ট। তারা তাকে জামাই বানাচ্ছেন না। সুবোধ পরের দিন চাকরীও ছেড়ে দিলে। বারোদিন বাইরে ঘুরে সে অন্য জায়গায় একটা চাকরী খুঁজে নিল।

আগের সহকর্মীদের সাথে সম্পর্কের সূত্রে সেখানে তার যাতায়াত আছে। পুরো বিষয়টি তাদের কাছে একটা সেলিব্রেটি গসিপিং এর মতো। তারা বার বার ফোনে সুবোধের কাছে জানতে চাইলে ব্যাপারটা কি কেন সবকিছু এমন উল্টা পাল্টা হয়ে গেল।

দিন পনের পরে পুরনো অফিসের সহকর্মীরা ওকে একদিন দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিয়ে ‍চেপে ধরলো সত্যিটা বলার জন্য। সে আসল কথাটা ফাঁস করে দিল। যে আসলে সে মেয়েটাকে বিয়ে করতে চায়নি। কিন্তু মুখের উপর নিষেধ করাও যায়না। আবার বসের কাছ থেকে সে বাড়ীতে ঘর মেরামত করার জন্য লোন নিয়েছে। সুবোধ বলল

– তাই আমি চিন্তা করলাম। যা করার অন্যভাবে করতে হবে। তাই এমন কিছু কাজও আচরণ করলাম। যাতে তারাই বাধ্য হলে বলে। এই ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবনা। বুদ্ধিটা কেমন হলো।

– আরে ভাই, তোমার মাথায় মাল আছে। বসের সাথে থেকে তুমি বসকে কাঁচকলা দেখিয়ে দিলে।

গল্পটা এখানে শেষ হয়ে গিয়েছিলো। ‍কিন্তু ম্যানেজার বিষয়টা বসকে জানিয়ে দিল। বস আগের চেয়ে বেশী অবাক হলো। এতদিনের চেনাজানা একটা ছেলেকে তাদের অচেনা মনে হলো। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েকে বিদেশে তার বোনের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আর বিয়ে শাদি দেবেন না। বোন যতদিন পারে দেখাশোনা করবে। তারপর কোনো একটা সরকারী আশ্রমে দিয়ে দেবে। কানাডাতে এসবের অভাব নেই।

এক বছর পরের কথা। ‍সুবোধ তার সিদ্ধান্ত বদলালো। তার মনে হলো। এটাতো একটা সোস্যাল ওয়ার্ক হতে পারে। একটা অক্ষম মেয়ের দায়িত্ব নেয়া। আমাকে অন্য সবার মতো হতে হবে কেন? আমি একটু আলাদা হবো। তাছাড়া আমি বিয়ে করার পর যদি আমার স্ত্রী কোনো দূর্ঘটনায় প্রতিবন্ধি হয়ে যায়, আমি কি তাকে ফেলে দেব? তাছাড়া মেয়েটার প্রতিও ওর মায়া পড়ে গেছে। বাসায় গেলে কেমন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকতো। ওর কাছে চলে আসতো, গল্প করতে চাইতো। ৩/৪ বছর বয়সের শিশুদের মতো আচরণ করতো।

সুবোধ সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন তার সাবেক বসের বাসায় চলে গেলো। তার মত পরিবর্তনের কথা বলল। বেগম ইশতিয়াক কোনো কথাই শুনলেন না। বল্লেন-

  • ও কোনো বিপদে পড়েছ। টাকা পয়সা দরকার? মায়ের চিকিৎসা নাকি বাবার অপারেশন। নাকি জমি কিনতে হবে? বোনের বিয়ে হচ্ছেনা টাকার জন্য?
  • সেসব কিছু নয়। টাকা পয়সার বিষয়টি আমার কখনো মাথায় ছিলো না। আমি শুধু ভেবেছি লোকে বলবে আমি লোভে পড়ে…
  • একটা কথাও তুমি বলবেনা।
  • আমার কথাতো শুনুন।
  • আমি এখন ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি। তখন আমি না বুঝে বলেছি। এখন আমি বুঝে শুনে বলছি। আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে ওকে বিয়ে করতে চাই। আমি জিনাতকে ভালোবাসি।
  • কিসের ভালোবাসা। এটা তোমার নুতন কোনো ফন্দি। তুমি বহু চালাক ছেলে। তোমার সাথে আমাদের হবে না।
  • আমি ক্ষমা চাইছি।

একক্ষণ বেগম ইশতিয়াকের সহিত কথা হচ্ছিলো। ইশতিয়াক সাহেব বের হয়ে এসে বললেন।

  • তুমি এখন আসতে পারো

—-