সামাজিক সমস্যা ও সামজিক সংগঠন এর অন্তভূক্তি
আমরা যখন পুলিশ নিয়ে কথা বলি, তখন মনে হয় সকল সমস্যা পুলিশ থেকেই হয়। যখন রাজনীতি নিয়ে কথা বলি তখন মনে এর চেয়ে খারাপ কিছু মনে হয় বাংলাদেশে নেই। যখন আমাদের সরকারী চাকুরে নিয়ে কথা উঠে তখন নীতিহীনতার চরমদিক আমরা তুলে ধরি। যখন আমরা সাংবাদিকতা পেশার কথা বলে তখন এর ভ্রষ্টতার চরম নৈরাজ্যপূর্ণ একটা দিক ভেসে উঠে। যখন আমরা ডাক্তার ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে কথা বলি তখন আমরা আমাদের প্রতারিত হওয়ার গল্প বলি। যখন আমরা শিক্ষকতা পেশা নিয়ে কথা বলি তখন সেখানেও আমাদের হতাশার শেষ নেই।
এর কারণ কি সেসব আলোচিত পেশাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আমাদের যা কিছু সমস্যা সেগুলো কোনো শ্রেণী বা পেশার নয় এমনকি ধর্ম বর্ণের নয় এলাকা ও গোষ্টিরতো নয়ই। সমস্যাটা আমাদের সামাজিক। ফলে আমরা যেখানে যাই সমস্যা দেখতে পাই। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক সমস্যা সংকুল পরিবেশ থেকে মানুষ গিয়ে সেসব ক্ষেত্রে কাজ করছে। আর সে কারণে এই পঁচন সমাজের সর্বত্রই ধরেছে।
মানে হলো আপনি একটি গুদামে বিভিন্ন রকমের ফল ও সবজি রেখেছেন। এখানে সেখানে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে সবজি ও ফল পঁচে গেছে। এখন আপনি যখন আলুর বস্তায় হাত দিচ্ছেন তখন বলছেন আলুই ভালো না, যখন টমোটোর বস্তা দেখছেন তখন বলছেন সব দোষ ওই টমোটোর এভাবে আপেল কমালা যাই নিচ্ছেন তাদেরই দোষা দিচ্ছেন। মূলত এখানে তারা মূল দোষী নয়। গুদামে যখন পঁচন ধরেছে তা সবার গায়ে লেগেছে। কম অথবা বেশী এবং সে পার্থক্যও খুব বেশী নয়।
তাহলে এর সমাধান কি?
প্রথমত, মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা
আমাদের দেশে যে পরিমাণ মানুষ দূর্নীতি করে। আমরা যদি ধরে নিই্ এই সংখ্যা ৬০% অথবা ৯০%। ব্যাপারটা একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে কোনো মানুষই তার জীবন দূর্নীতি করে গড়ে তুলবে এমন প্রত্যাশা নিয়ে বেড়ে উঠে না। সবারই সুন্দর ইচ্ছা ও নির্মল স্বপ্ন থাকে। কিন্তু একটা সময় পর যখন আর সামলাতে পারে না এবং চারদিকে বঞ্চিত হয়ে হতাশা তৈরী হয় এমনিক নিজের সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বীগ্ন হয়ে পড়ে। তখনি নানা ধরনের সুযোগ সন্ধান করতে থাকে। এভাবে মানুষ মূল পথ থেকে হারিয়ে যায়।
সূতরাং রাষ্ট্রকে মানুষের মৌলিক চাহিদার উপর জোর দিতে হবে। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত: ঠগ ও বাটপারের পাল্লায় পড়ে
উপরের অনিশ্চিয়তার কারণে সমাজে নানা ধান্ধাবাজ, ঠকবাজ, বাটপার তৈরী হয়। আমার ধারণা বাংলাদেশে এমন কোনো মানুষ নেই যিনি কখনো কোনো বাটপারের পাল্লায় পড়েনি। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিতো তো হরদম মানুষের জীবনে বিঘ্নিত করছে। ব্যবসা, বন্ধুত্ব ও টাকা ধার জনিত প্রতারণার বহু মানুষ পথে বসেছে, মানসিক রোগি হয়েছে এমনকি মুত্য বরণ করেছে।
তাই, এ ধরনের ঠকবাজ ও সামাজিক প্রতারকদের সামাজিক আইনের আওতায় আনতে হবে। এবং প্রতিটি মানুষকে সমাজে চলার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এবং বাটপারদের চিহ্নিত করে তাদের ডেটাবেজ তৈরী করতে হবে। এবং তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
চতুর্থত: প্রচলিত আইনের সংষ্কার
বাংলাদেশে অনেক অপরাধের শাস্তি প্রচলিত আইনে নেই। আবার অনেক অপরাধের শাস্তি যথার্থ নয়। যেমন জরিমানা, জেল ও ফাসি ছাড়া আর কোনো সাজা নেই। অথচ ছোট ছোট অপরাধের জন্য সামাজিক শাস্তি যেমন, ময়লা পরিষ্কার, এতিমখানায় কাজ করা এমন সাজা থাকতে পারতো। আবার প্রচলিত শাস্তির বাইরে নিভৃতমূলক সাজাও থাকাও দরকার ছিল। যেমন কেউ যদি একবার খাদ্যে ভেজাল দেয়, সে ব্যক্তি আর কখনো খাদ্য ওস্পর্শকাতর ব্যবসা করতে পারবে না। কেউ যদি ব্যাপক প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে প্রমাণিত হয়। অন্য শাস্তির পাশাপাশি তার এমন শাস্তি নির্ধারিত হওয়া উচিৎ যে, সে ব্যক্তি আর কখনো কোনো ব্যবসা করতে পারবেনা। এবং সরকারের একটি সিক্রেট পোর্টালে তাদের ডেটা থাকবে। যা ট্রেড কতৃপক্ষ চেক করতে পারবে।
পঞ্চমত: শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন
শিক্ষা সকল নীতি ও উন্নতির চাবিকাঠি। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে যুগোপোযোগী করতে হবে এবং প্রতি বছর সেটাকে রিভিউ করে আগের অবস্থা থেকে আপডেট করতে হবে। শিক্ষা জীবনেই কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত: সমাজ সেবা ও সামাজিক সংগঠন
রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় কমিয়ে সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনগনকে দাতা স্বেচ্চাসেবক বানিয়ে তাদের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করে রাষ্ট্রের ব্যং কমাতে হবে। এজন্য সামাজিক কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠন বিধি চালু করতে হবে। সকল ক্ষেত্রে বড় ধরনের সামাজিক সংগঠন কাজ করবে ও অনুমোদন দেবে এবং স্থানীয় ক্ষেত্রে স্থানীয় সংগঠন অনুমোদন নেবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সামাজিক সংগঠনকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য কাঠামোগত সংষ্কার করবে।
সামাজিক সংগঠনগুলোকে বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সহযোগীর ভূমিকায় নিয়ে আসতে হবে। এতে রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় কমে আসবে।
গঠনযোগ্য সামাজিক সংগঠন:
| ক্রম | বিষয় | স্থানীয় অনুমোদন ও মনিটরিং | জাতীয় অনুমোদন ও মনিটরিং | মন্তব্য |
| ০১ | পরিবেশ | জেলা প্রশাসন | পরিবেশ অধিদপ্তর | বৃক্ষরোপণ, নদী রক্ষা, দূষণ নজরদারি |
| ০২ | পরিচ্ছন্নতা | উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) | পরিবেশ অধিদপ্তর / স্থানীয় সরকার বিভাগ | শহর–গ্রাম পরিচ্ছন্নতা |
| ০৩ | পর্যটন | জেলা প্রশাসন | বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড | স্থানীয় ট্যুর গাইড, হেরিটেজ |
| ০৪ | শিক্ষা | উপজেলা প্রশাসন | শিক্ষা মন্ত্রণালয় | ঝরে পড়া রোধ, কোচিং, লাইব্রেরি |
| ০৫ | প্রাকৃতিক দুর্যোগ | উপজেলা প্রশাসন | দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় | বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প |
| ০৬ | ক্রীড়া | উপজেলা প্রশাসন | যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় | তৃণমূল খেলোয়াড় |
| ০৭ | প্রাণী কল্যাণ | জেলা প্রশাসন | মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় | পথপ্রাণী, পশু চিকিৎসা |
| ০৮ | কৃষি উন্নয়ন | উপজেলা প্রশাসন | কৃষি মন্ত্রণালয় | আধুনিক কৃষি, কৃষক প্রশিক্ষণ |
| ০৯ | সমবায় সমিতি | জেলা প্রশাসন | সমবায় অধিদপ্তর | কৃষক/শ্রমিক সমবায় |
| ১০ | দক্ষতা উন্নয়ন | জেলা প্রশাসন | কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ | TVET, স্কিল ট্রেনিং |
| ১১ | মানবাধিকার | জেলা প্রশাসন | জাতীয় মানবাধিকার কমিশন | অভিযোগ, সচেতনতা |
| ১২ | নারী অধিকার | উপজেলা প্রশাসন | মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় | নারীর ক্ষমতায়ন |
| ১৩ | উদ্যোক্তা উন্নয়ন | উপজেলা প্রশাসন | শিল্প মন্ত্রণালয় / SME ফাউন্ডেশন | স্টার্টআপ, SME |
| ১৪ | আইসিটি উন্নয়ন | জেলা প্রশাসন | আইসিটি বিভাগ | ডিজিটাল স্কিল |
| ১৫ | যুব উন্নয়ন | উপজেলা প্রশাসন | যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর | স্বেচ্ছাসেবক, নেতৃত্ব |
| ১৬ | শিশু কল্যাণ | উপজেলা প্রশাসন | মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় | শিশু অধিকার |
| ১৭ | প্রবীণ কল্যাণ | জেলা প্রশাসন | সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় | বয়স্ক সেবা |
| ১৮ | স্বাস্থ্য সচেতনতা | উপজেলা প্রশাসন | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর | ক্যাম্প, রক্তদান |
| ১৯ | রক্তদান সংগঠন | উপজেলা প্রশাসন | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর | স্বেচ্ছাসেবী ব্লাড ব্যাংক |
| ২০ | মাদকবিরোধী সংগঠন | উপজেলা প্রশাসন | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় | সচেতনতা |
| ২১ | ভোক্তা অধিকার | জেলা প্রশাসন | ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর | বাজার নজরদারি |
| ২২ | শ্রমিক কল্যাণ | জেলা প্রশাসন | শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় | শ্রমিক অধিকার |
| ২৩ | নদী ও জলাশয় রক্ষা | জেলা প্রশাসন | পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় | দখল–দূষণ রোধ |
| ২৪ | সড়ক নিরাপত্তা | উপজেলা প্রশাসন | সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় | ট্রাফিক সচেতনতা |
| ২৫ | সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য | জেলা প্রশাসন | সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় | লোকসংস্কৃতি |
| ২৬ | গবেষণা ও নীতিপরামর্শ | জেলা প্রশাসন | পরিকল্পনা কমিশন | থিঙ্কট্যাংক |
| ২৭ | স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী | উপজেলা প্রশাসন | মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ | জরুরি সহায়তা |
| ২৮ | প্রতিবন্ধী উন্নয়ন | উপজেলা প্রশাসন | সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় | অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ |
| ২৯ | প্রবাসী সহায়তা | জেলা প্রশাসন | প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় | রেমিট্যান্স সহায়তা |
| ৩০ | শান্তি ও সম্প্রীতি | জেলা প্রশাসন | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
