সামাজিক ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
নগরসভ্যতার এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে প্রতিদিন নতুন নতুন আর্থিক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে—শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে মুদ্রাবাজার, খুচরা বিক্রয় থেকে ভার্চুয়াল পণ্যের বিপণন, ডিজিটাল সেবা থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। প্রতিযোগিতা ও পুঁজির কেন্দ্রিক এই বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান দিনদিন বাড়ছে।
বিশ্বের শীর্ষ ১% মানুষের হাতে জমা হচ্ছে মোট সম্পদের একটি বিশাল অংশ, যখন বিশাল জনগোষ্ঠী জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে চাকরির বাজারে অসমতা, সামাজিক বৈষম্য এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। শত শত বছর ধরে আমরা দান-খয়রাত, অনুদান, এনজিও সহায়তা, রাষ্ট্রীয় অনুদানের মাধ্যমে দরিদ্রদের সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এসব প্রচেষ্টায় দরিদ্র মানুষের স্থায়ী উন্নয়ন না ঘটায় বিকল্প চিন্তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই উঠে এসেছে সামাজিক ব্যবসার ধারণা।
একটি সামাজিক ব্যবসা এমন একটি উদ্যোগ যেখানে ব্যবসার মাধ্যমে একটি সামাজিক সমস্যা সমাধান করা হয়, অথচ সেটি থেকে উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত লাভ গ্রহণ করেন না। এই ব্যবসার লাভ শুধু সমাজের কল্যাণে ব্যবহার হয়। এটি একদিকে ব্যবসার মতই টেকসই, অন্যদিকে এর উদ্দেশ্য সমাজের সমস্যা সমাধান করা। সামাজিক ব্যবসা লাভজনক হয় বটে, তবে তা ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির জন্য।
সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তা
সামাজিক ব্যবসার মূল প্রেরণা এসেছে অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস-এর চিন্তা থেকে। তিনি মনে করেন, প্রচলিত ব্যবসার উদ্দেশ্য যেখানে নিছক মুনাফা অর্জন, সেখানে সামাজিক ব্যবসা সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরণের উদ্যোগের প্রয়োজন আরও বেশি। কেননা, শুধুমাত্র দান বা অনুদানের মাধ্যমে দরিদ্রতা দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন এক ব্যবস্থা, যা মানুষকে কাজের সুযোগ এনে দেবে, সম্মানজনক জীবিকা দেবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।
সামাজিক ব্যবসার ৭টি মূলনীতি
সামাজিক ব্যবসার সাফল্য নিশ্চিত করতে এটি পরিচালিত হয় কিছু নির্দিষ্ট মূলনীতির ভিত্তিতে। এই নীতিগুলো হলো:
১. সমস্যা সমাধানে নিবেদিত লক্ষ্য:
দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, পরিবেশ—এই জাতীয় একটি বা একাধিক সমস্যা সমাধানই হবে ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য। ব্যক্তিগত লাভ নয়, সামাজিক প্রভাবই হবে এর কেন্দ্রবিন্দু।
২. অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি:
এই ব্যবসার মাধ্যমে মানুষ কেবল সহায়তা পাবে না, বরং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করবে।
৩. বিনিয়োগ ফেরত, লভ্যাংশ নয়:
বিনিয়োগকারী তার মূলধন ফেরত পাবেন ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করবেন না। এটি ব্যবসাকে শুদ্ধ ও মানবিক রাখে।
৪. লাভ পুনঃবিনিয়োগ:
মুনাফা হবে, তবে তা ব্যবহৃত হবে প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান তৈরী এবং আরও বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার সমাধানে।
৫. পরিবেশবান্ধবতা বজায় রাখা:
সামাজিক ব্যবসাকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও জলবায়ু সচেতনতা থাকবে এর নীতির অংশ।
৬. ন্যায্য বেতন ও কাজের পরিবেশ:
যারা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারা বাজারদরের উপযোগী ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাবেন। এ ব্যবস্থায় শোষণের সুযোগ নেই।
৭. আনন্দ ও উৎসাহের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা:
এই ব্যবসায় কাজ করা হবে আত্মতৃপ্তি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে উৎসাহিত হয়ে। এটি একটি আনন্দদায়ক ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা হবে।
প্রচলিত ব্যবসা বনাম সামাজিক ব্যবসা
প্রচলিত ব্যবসা যেখানে শুধু মুনাফাকেই সাফল্যের মানদণ্ড ধরে, সেখানে সামাজিক ব্যবসা সমাজে সৃষ্ট প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়।
যেখানে সাধারণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে লাভের পরিমাণ নিয়ে, সেখানে সামাজিক ব্যবসাগুলো প্রতিযোগিতা করে কে কতটা কার্যকরভাবে সামাজিক সমস্যা সমাধান করতে পারে তা নিয়ে।
এই ভিন্নধর্মী ব্যবসায়িক পদ্ধতি একদিকে সমাজে সুষ্ঠু পরিবর্তন আনে, অন্যদিকে ব্যক্তিকে মানবিক করে তোলে। এমনকি সমাজে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশেও এর প্রভাব পড়ে। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজের সমস্যার সমাধান খুঁজে পান, এবং একটি ইতিবাচক প্রজন্ম গড়ে উঠে।
ভবিষ্যতের পথে সামাজিক ব্যবসা
বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার প্রসার ঘটছে। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ থেকে ল্যাটিন আমেরিকা—প্রতিটি অঞ্চলেই সমাজসেবামূলক ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসার ধারা গড়ে উঠছে। বাংলাদেশেও সামাজিক ব্যবসা একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল, সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক হেলথ ক্লিনিক, কৃষি ভিত্তিক উদ্যোক্তা প্রকল্প ইত্যাদি আমাদের দেশে ইতিমধ্যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সামাজিক ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক রুপায়ন ও ইন্ডাস্ট্রি কাঠামো দান
সামাজিক ব্যবসা (Social Business) বাংলাদেশের মতো দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অর্জনের একটি কার্যকর উপায়। এটি একটি তৃতীয়ধরনের ব্যবসায়িক মডেল যা মুনাফার চেয়ে প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে টিকে থাকার জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক হয়। এই মডেলকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং একটি স্বতন্ত্র শিল্প (Industry) হিসেবে কাঠামোবদ্ধ করতে হলে নিম্নোক্ত করণীয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. নীতিমালা ও আইনগত স্বীকৃতি প্রদান
- “সামাজিক ব্যবসা আইন” প্রণয়ন: সামাজিক ব্যবসার সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য, কর কাঠামো, নথিপত্র ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে আইনি কাঠামো তৈরি।
- কর ছাড় ও প্রণোদনা: সামাজিক প্রভাবসৃষ্টিকারী উদ্যোগকে নির্দিষ্ট কর রেয়াত বা ট্যাক্স ইনসেনটিভ দেওয়া।
- ব্যবসা নিবন্ধনে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি: এনজিও, কোম্পানি ও স্টার্টআপের বাইরে “Social Business Entity” নামে আলাদা শ্রেণিকরণ।
- Social Business Association (SBA) নামে নতুন ও ভিন্নতর এসোসিয়েশন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা।
২. বিনিয়োগ ও অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি
- Social Business Investment Fund গঠন, যেখানে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারেন।
- ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি, যেখানে সামাজিক ব্যবসাগুলো বিনিয়োগকারীদের সাথে সংযুক্ত হতে পারে।
- MFIs ও SME ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্বল্পসুদে অর্থায়ন।
- প্রতিবছর সোস্যাল বিজনেস সামিট আয়োজনের ব্যবস্থা করা। আন্তজাতিক সামিট ভিন্ন ভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হবে এবং জাতীয় সামিট একেকবার একেক জেলায় অনুষ্ঠিত হবে।
৩. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ
- বিশ্ববিদ্যালয় ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোতে Social Business Curriculum অন্তর্ভুক্ত করা।
- উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও পরিচালন দক্ষতা।
- Yunus Centre-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি অংশীদারিত্বে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
- জেলায় জেলায় ছোট ছোট সামাজিক ব্যবসাগুলোকে বিভিন্ন ইউনিটে রুপদান করা।
- ইউনুছ সেন্টারের পক্ষ থেকে সামাজিক ব্যবসায় ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা
- সামাজিক ব্যবসার বিষয়ে ইউনুছ সেন্টারের ফ্রি কনসালটেন্সি সেবা ও সেমিনারের আয়োজন করা।
৪. মাপকাঠি ও সার্টিফিকেশন পদ্ধতি চালু করা
- সামাজিক প্রভাব নির্ধারণে KPI বা Impact Measurement Framework তৈরি করা।
- নির্দিষ্ট মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলে “Certified Social Business” লেবেল প্রদান, যা বিনিয়োগ, সরকারি সহায়তা ও সচেতনতার জন্য সহায়ক হবে।
- সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে আন্তজাতিক পুরষ্কার চালু করা।
৫. বাজারে প্রবেশাধিকার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
- সরকারি কেনাকাটায় সামাজিক ব্যবসার পণ্য ও সেবাকে অগ্রাধিকার।
- Online Social Business Marketplace তৈরি করা, যেখানে এসব পণ্য ও সেবা সহজে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।
- E-commerce ও Digital Payment একীকরণ।
- সামাজিক ব্যবসায়ে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সহায়ক এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করা।
- জাতীয় পর্যায়ে “Social Business Week” আয়োজন।
- Social Business Club প্রতিষ্ঠা করা।
৬. গবেষণা, ডেটাবেইস ও নীতিনির্ধারণে তথ্য সহায়তা
- BBS বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে Social Business Database তৈরি।
- সরকারি পর্যায়ে Annual Social Business Report প্রকাশ।
- Think Tank ও Policy Institute গড়ে তোলা।
- সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে প্রয়োজনীয় পাঠ্য, বই ও জার্নাল পর্যাপ্ত করা ।
৭. উপরের পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য করনীয়
* সামাজিক ব্যবসায় নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রকাশ করা।
* বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সামাজিক ব্যবসা সেল গঠন করা।
* সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা। যাতে পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
* সামাজিক ব্যবসায়ের জন্য একটি কমন ও আন্তজাতিক লোগো বা চিহ্ন তৈরী করা।
সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত সমন্বয় কমিটি কাঠামো
* চেয়ারম্যান: ১ জন, ইউনুছ সেন্টার কতৃক মনোনীত
* ভাইস-চেয়ারম্যান: ৩ জন: সামাজিক ব্যবসা করছেন এমন ১ জন, ১ জন নীতিবান ব্যবসায়ী, ১ জন একাডেমিশিয়ান।
* সমন্বয়ক: একজন উপসচিব পদমর্যাদার সরকারী কর্মকর্তা
* সহ-সমন্বয়ক ৩ জন: একজন তরুন উদ্যোক্তা, ১ জন ছাত্র ও ১ জন সংগঠক বা সমাজকর্মী
* সদস্য: সরকারী কয়েকটি দপ্তরের প্রতিনিধি (১০ জন)
(যেমন- স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, শিক্ষা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ইত্যাদি)
* সদস্য: প্রাইভেট সেক্টর প্রতিনিধি: বিভিন্ন ব্যবসা খাতের প্রতিনিধি (১০ জন)
* সদস্য: শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ (১০ জন)
* ছাত্র উদ্যোক্তা: (১০ জন)
* এনজিও প্রতিনিধি (১০ জন)
* দাতা সংস্থা প্রতিনিধি (১০ জন)
