সাইকেলে আমেরিকা

মন হারালো বিজন পথে

মন হারালো বিজন পথে

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

বই: পৃথিবীর পথে বাংলাদেশ

(সাইকেলে আমেরিকার সিয়াটল থেকে ওয়াশিংটন ডি.সি ভ্রমণের গল্প)

লেখক: মুনতাসির মামুন

প্রকাশক: বেঙ্গল পাবলিকেশন্স

মূল্য: ৬০০ টাকা

 

ধরুন, আপনি একটা পথ ধরে চলেছেন। অচেনা পথ। আপনার নিজের দেশ নয়। অন্য দেশ। কখনো কিছু মানুষ, গোটা কয়েক বাড়ি, ছোট ছোট শহর পেরিয়ে আপনি পথ চলেছেন। বেশিরভাগ পথ বিজন। কোনো লোকজন তেমন নেই। কোথাও রুক্ষ পথ, কোথাও খাবার পানি কম, কোথাও বাতাস কোথাও নুড়ি মেশানো পথ, কোথাওবা কিছুটা ছায়া। পথ জেনে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হয়।  আপনি প্রকৃতি আর পৃথিবীর পথ ধরে চলেছেন দিগন্তের দিকে। প্রকৃতির নানা রুপ ‍উপভোগ করছেন।

না আপনি একা নয়। আপনার সাথে আরেকজন রয়েছেন। যিনি আপনার সাথে সব সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কথা বলছেন ও তার অনূভুতি বিনিময় করছেন। না ঠিক একজন নয়। তারা ২ জন। সাথের জন  আবার খুব অভিজ্ঞ। যেকোনো সমস্যায় চট করে সমাধান করেন। না ঘাবড়িয়ে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে নেন। এভাবে চলছে ভ্রমণ। ভ্রমণটি আবার সাইকেলে। যদিও মাঝে মধ্যে পায়ে হাঁটতে হয়। ভিনদেশের প্রকৃতি ও বিরলঘণ মানুষ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কখনো কখনো নিজদেশী কেউ এসে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরছে।

আসলে উপরের ঘটনাটি হলো আপনার একটি স্বপ্ন। আপনি আসলে এতক্ষন স্বপ্নে দুজন সাইকেলচারী মুনতাসির মামুন ও আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল এর সাথে সাইকেলে চড়ে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবার মনে করুন, এই ঘুরে বেড়ানো অবস্থায় আপনার স্বপ্নটি ভেঙ্গে গিয়েছে।

এবার আপনার অনুভূতি কেমন হতে পারে?

আমি বলছি, আপনি যদি একজন ভ্রমণপ্রেমী হয়ে থাকেন। তাহলে আপনার এই সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য আপনার আফসোস হবে। যেমনটা আমার হয়েছিল মুনতাসির মামুন এর লেখা ‘‘পৃথিবীর পথে বাংলাদেশ’’ বইটা পড়ে। সাইকেলে আমেরিকার সিয়াটল থেকে ওয়াশিংটন ডি.সি ভ্রমণের গল্প।

যেহেতু প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার বেশী তাই একটানা বইটি পড়া সম্ভব হয়নি। যখনি বিরতি দিয়েছি তখনি আমার এমনটা মনে হয়েছে।

বিদেশ বিভুঁইয়ে কবির ভাষায় ‘‘অচেনা বিজন পথে’’ দুজন মানুষের ক্রমাগত দিনের পর দিন পথচলার কথা মনে পড়লে হয়তো একঘেঁয়ে গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু আপনি যখন গল্পের ভেতরে চলে যাবেন যখন লেখকের বর্ননায় প্রতিটি মানুষের মুখ আপনার সামনে বেশে উঠবে, তখন আপনি বাতাসের শন শন কিংবা নুড়ি পাথরের কটকট শব্দও শুনতে পাবেন। তখন এক প্রাণবন্ত ভ্রমনের শিহরণ আপনার রক্তে জেগে ‍উঠবে।

বিশেষ করে প্রতিটি দিনের গল্পই আলাদা। কোনোদিন মাইলের পর মাইল বাড়িঘর না পাওয়ার গল্প, কোনোদিন গ্রামের পথে ছোট পরিবারের কাছে পানি চেয়ে নেয়ার অভিজ্ঞতা, কখনো কারো উঠানে ক্যাম্প করে রাত কাটানোর অনুভূতি আবার কখনো অর্ধেক ভাড়ায় কোনো রেস্টহাউসে রাত কাটানোর কৌশল আপনাকে চমৎকৃত করবে।

বার বার মনে হবে। আচ্ছা! তাহলে এসব সমস্যা এভাবে সমাধান করতে হয়। আরো একটা ইচ্ছেও আপনার জাগতে পারে। আপনি মনে মনে হয়তো বলবেন, আমি যদি কখনো এমন ভ্রমণে যাই তাহলে আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে সাথে নিয়ে যাব। অথবা বলবেন, ইশ উজ্জ্বল ভাইয়ের মতো কাউকে নিয়ে যদি ভ্রমণে যাওয়া যেত।

কিছু গল্প সুখকর নয় কিন্তু রোমাঞ্চকর। বিশেষ করে ২৫ কিলোমিটার হেঁটে আসার পর যদি মনে পড়ে আপনিতে সাইকেলের চেইনটা কোনো এক জায়গায় রেখে এসেছেন। বা যদি জানতে পারেন পানি শেষ হয়ে গেছে কিন্তু ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাড়ি নেই, অথবা যদি জানেন যেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন সেখানে বিকেল হলে মানুষখেকো ভালুক আসে কিংবা যেখানে ক্যাম্প করেছেন সেখানে সাপের উপদ্রপ রয়েছে। এগুলো শুনে কিঞ্চিৎ ভয় লাগলেও। এই ভ্রমণে এগুলোই চমৎকার অভিজ্ঞতা। নইলে সব পানসে আর একগুঁয়ে হয়ে যেত।

সেইযে বললাম বিজন পথ। এই বই পড়ে আমি জেনেছি ২০০ জনেরও শহর হয়, ৩৪ জন মানুষ একটা শহরে বাস করে কিংবা ৪ জন মানুষ রয়েছে একটি ছোট শহর। আমারতো খুব জানতে ইচ্ছে করে কেমন সেই শহরটা। সেখানকার মানুষের জীবনইবা কেমন? আমরাতো আধা বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করি।

এবার সে বিদেশ বিভঁইয়ে সাদা চামড়ার মানুষই দেখা পাওয়া যায় মাইলের পর মাইল গেলে সেখানে যদি মাঝে মধ্যে কোনো দেশী মানুষ পেয়ে দেশী ভাষায় কথা বলা যায়। তার জীবনের গল্প জানা যায় নিজেদের গল্প করা যায়। তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়। হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েক বার। ছোট ছোট প্রান্তিক শহরগুলোতে বাংলাদেশী লোকেরা যখন দেশী মানুষ দেখে তখন যেন তারা তাদের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজে পায়। তাদের সেই আবেগ অনুভূতি আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। বইয়ের পাতায় থেকেও আপনি সেটা অনুভব করতে পারবেন।

আর একারণে বইটি দীর্ঘ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রে একইরকম হওয়া সত্বেও ধারাবাহিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, প্রতিদিনের নতুন নতুন গল্প আর বিদেশের মাটিতে বাঙালীর জীবন সবকিছু মিলিয়ে আপনাকে মনে রাখার মতো একটা অনুভূতি দিবে।

একটি ভাল গল্প পড়ার পর সেটা যেমন অনেকদিন মাথার মধ্যে ঘোরে এই ভ্রমণের গল্পও তাই। অনেক মজার ঘটনা আছে, ব্যতিক্রমী স্থানের বর্ণনা  আছে, তথ্য  আছে, খাবারের নানা অভিজ্ঞতার কথা  আছে, রাত্রি যাপনের নানা বিড়ম্বনা ও সুখের ঘটনা আছে। উদাহরণ দিতে গেলে লেখার পরিধিই শুধু বাড়বে।

লেখক ও তার সহযাত্রীর সাথে আমেরিকার পথে পথে ঘুরে বেড়াতে বইটি পড়ুন। বই পড়তে পড়তে আপনার হয়তো মনে হবে সব ঘটনা সব কথা লিখে বইটি এত লম্বা না করলেও হতো। আমারও মাঝে মধ্যে তা মনে হয়েছে। পরে মনে হয়েছে প্রতিটি স্মৃতি আসলে অমূল্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিনের শুরুগুলো একইরকম হলেও স্থান আলাদা ছিল সেটাও মাথায় রাখতে হবে।

আসলে ভ্রমণসাহিত্য এমন এক জিনিস। যার রস পুস্তক সমালোচনা পড়ে আস্বাদ করা যায় না। বইটি পড়তে হয়। তাই শেষ করার আগে বইটি পড়ার পরামর্শ ছাড়া আমার ভান্ডারে আর কোনো কথা নেই।

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply