সরকারের মেয়াদ ও সংস্কার প্রসঙ্গে
বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা তুঙ্গে। কেউ বলছে এই সরকার ৫ বছর থাকুক কেউ বলছে ১০ বছর। আবার কেউ বলছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে সরকার বিদায় নিক। আমরা দুটো মত ও তাদের যৌক্তিকতাসহ বিশ্লেষণ করবো? তারপর পাঠকের হাতে বিচারের দায় দিয়ে লেখাটি শেষ করবো। চলুন শুরু করা যাক-
প্রথমে আলোচনা করতে চাই যারা বলছেন সরকারের উচিৎ দ্রুত নির্বাচন দিয়ে সরে যাওয়া তাদের মত ও মতের পক্ষে যুক্তি নিয়ে।
- সরকারের দ্রুত নির্বাচন দিয়ে সরে যাওয়া উচিত কারণ
ক) যেহেতু অন্তবর্তীকালীন সরকার তাই এই সরকারের বেশীদিন ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়। কেয়ারটেকার সরকারের মতো সরে যাওয়া উচিৎ।
খ) যেহেতু এই সরকার জনগনের ভোটে নির্বাচিত নয় তাই তাদের বেশী সময় থাকা বেশী কাজ করা এবং বড়ো ধরনের সংস্কার করা উচিত নয়। তাদের নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার করে তারপর সরে যাওয়া উচিৎ।
গ) যেহেতু দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি ভাল নয়। সরকার ঠিকভাবে সামাল দিতে পারছেনা। তাই দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দেয়া উচিৎ। কারণ নির্বাচিত সরকার জনগনের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসবে তাই তাদের ক্ষমতাও বেশী থাকবে।
ঘ) দেশের তরুন জনশক্তি দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারছেনা। তাই সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিৎ জনগনের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
দ্রুত নির্বাচনের দাবী যৌক্তিক নয়!
* এই যুক্তিগুলো খন্ডন করে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাগরিক ও তরুনেরা অনেকে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে। এবার দেখি সেসব বক্তব্যগুলো-
ক) এটা কেয়ারটেকার সরকার নয়। এটা বিশেষ পরিস্থিতিতে অভ্ভুথ্থানের মাধ্যমে সরকার পতন হওয়ার কারণে অন্তবর্থতী সরকার গঠিত হয়েছে। েএর মেয়াদ অন্যকোনো সরকারের সাথে তুলনাযোগ্য নয়। আর যদি তুলনা করতে হয় তাহলে এই সরকারকে কমপক্ষে ৬ বছর ক্ষমতায় থাকতে হবে। কারণ ২০০৬ সালে কেয়ারটেকার সরকার আগের সরকারের সেটাপ ভেঙ্গে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর জন্য ২ বছর ক্ষমতায় ছিল। তাই এই সরকার সে হিসেবে ১৫ বছরের জঞ্জাল সরাতে অন্তত ৬ বছর থাকা উচিৎ।
খ) অতীতের ইতিহাসে দেখা গেছে নির্বাচিত সরকার কখনো বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। যেসব পরিবর্তন িএসেছে তা অনির্বাচিত এবং বৈপ্লবিক সরকার দিয়ে এসেছে। দেখতে হবে জনগন তার পক্ষে আছে কিনা? যেমন ৭২ এর সংবিধান গ্রহণ অনুমোদন ও চালু যে সরকার করেছে সেটা অনির্বাচিত ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার মেয়াদের প্রথম অংশ অনির্বাচিত ছিল, এমনকি ২০০৬ ও ২০০১ এর তত্বাবধায়ক সরকারগুলোও নির্বাচিত ছিলনা। যারা প্রশংসিত ছিল তাদের কাজের জন্য।
গ) আইনশৃংখলা একটি সার্বিক বিষয় এধরনের অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর সব দেশে সব সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে। আর যতটা সমস্যা হবে বা হচ্ছে। কোনো দলীয় সরকার আসলেও তা বহাল থাকবে।
ঘ) তরুনরা ভোট দিতে পারছেনা এটা সত্য। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখুন। তরুনরাই বর্তমান সরকারকে সময় দিতে চায়, খুনিদের বিচার চায়, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ চায় এবং সংস্কার চায় এমনকি নির্বাচন বিলম্বে চায়।
সরকারের উচিত ৫-১০ বছর থেকে দেশকে সংস্কার করে যাওয়া
এবার আসি যারা মনে করেন এই সরকারকে ৪ থেকে ৫ কিংবা ৬ বছর সময় দেয়া উচিত। সকল সিস্টেমের আগাগোড়া পরিবর্তন করে তারপর নির্বাচন দেয়া উচিৎ। তাদের যুক্তিগুলো শুনি।
ক) যেহেতু একটি বিনাভোটের সরকারের পতন হয়েছে। সে সরকার ১ বছর অতিবাহিত করেছে। এখন উচিত বাকী ৪ বছর এই সরকার থাকা। কারণ সে সরকার থাকলেও জনগত ৪ বছরের মধ্যে কোনো নির্বাচন পেতনা। তাই কমপক্ষে ৪ বছর সময় দেয়া প্রয়োজন। ৪ বছর আগে কোনো নির্বাচন নয়।
খ) যারা জীবন দিয়ে অভ্ভুথ্থানের মাধ্যমে বিশেষ করে যাদের নেতৃত্বে বিগত সরকার উৎখাত হয়েছে যারা এই সরকারকে ম্যান্ডেন্ট দিয়েছে তারা যেহেতু চায় সরকার ৪/৫ বছর থাকুক। নিদেনপক্ষে প্রয়োজনীয় সংষ্কারগুলো করুক তারা যেহেতু সরকারকে সময় দিতে চায়। সূতরাং সরকারের উচিৎ সময় নিয়ে নিজের কাজে মন দেয়া।
গ) বিগত ১৫ বছরের দূর্নীতি, অনিয়ম, দলীয় নিয়োগ অন্যায় অবিচার এগুলোর জন্য দেশের বিচার, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার দরকার। তা না হলে পরাজিত ও পলায়নকৃত শক্তি বিভিন্নরুপে দেশের ফেরত আসবে এবং আবারো দেশকে নমরুদের মৃত্যুপুরী বানাবে। তাই এই সরকারকে ৪ থেক ৬ বছর সময় দেয়া সমীচিন।
ঘ) বিগত ৫৪ বছরে দেশের পদ্বতি, কাঠামো, নীতি ও গুণগত পরিবর্তন আসেনি। এখনো বহু ব্রিটিশ আইনে দেশ চলে। ৭২ এর সংবিধান সেটাও জোড়াতালি দেয়া এবং অসম্পূর্ণ। একটি ভাল শিক্ষা পদ্ধতি তৈরী করা হয়নি, একটি উপযুক্ত স্বাস্থ্যকাঠামো গড়ে উঠেনি। বিচার বিভাগ এখনো মানুষের আস্থার জায়গায় নেই, প্রশাসনিক কাঠামো কতটা দূরবল তার প্রতি মুহুর্তে টের পাচ্ছে দেশের মানুষ। এই অবস্থায় সবকিছুর মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে সেজন্য যত সময় লাগে তা করে দিতে হবে। একবার পরিবর্তন আনলে বছরের পর বছর চলতে পারবে। আর যদি তা না করা হয় জাতি হিসেবে আমরা কেবল পিছিয়ে যেতে থাকব।
এই চারটা মতের বিপরীত মত প্রথমেই লেখা হয়েছে। তাই আর লিখলাম না।
এই মুহুর্তে আমাদের উচিত সরকারকে সংস্কারে সহযোগিতা করা। এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের দল গোছানো।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

