Hospital

সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা: একটি সংস্কার প্রস্তাব

সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা: একটি সংস্কার প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলো। এতে ঔষধ কোম্পানির প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, এবং জনগণের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ঔষধ কোম্পানির প্রবেশাধিকার ও শর্ত

সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবাকে বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো কোম্পানি যদি হাসপাতালে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাদেরকে একবারের প্রবেশের বিনিময়ে এক লক্ষ টাকার সমমূল্যের ঔষধ বিনামূল্যে হাসপাতালে সরবরাহ করতে হবে। এই শর্ত আইনগতভাবে সংযুক্ত ও বলবৎযোগ্য করতে হবে।

 অভিযোগ ও সালিশি ব্যবস্থা

হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম দূর করতে একটি সমন্বিত অভিযোগ, সালিশ, তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং নিম্নলিখিত চারটি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন:

  • ক) ব্যবস্থাপনা বিভাগ: হাসপাতালের প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ।

  • খ) সেবাগ্রহীতা পরিষদ: হাসপাতালের সেবাগ্রহীতাদের নিয়ে গঠিত সংগঠন, যার জন্য হাসপাতাল চত্বরে পৃথক কার্যালয় থাকবে।

  • গ) নাগরিক সভা: বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সচেতন নাগরিকদের নিয়ে গঠিত সেল।

  • ঘ) মনিটরিং সেল: অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই সেলে উপজেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও ছাত্র প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

 মনিটরিং সেলের কার্যকারিতা

মনিটরিং সেল সর্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে, যাতে যেকোনো সেবাগ্রহীতা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ জানাতে এবং তার দ্রুত সমাধান পেতে পারেন।

 বেসরকারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অন্তর্ভুক্তি

সরকারি ডাক্তারের পাশাপাশি নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক বেসরকারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে চেম্বার করে সেবা দিতে পারবেন। এতে ডাক্তারের অনুপস্থিতি বা বদলিজনিত শূন্যতা পূরণ হবে। তবে তাদের ফি সরকার নির্ধারণ করবে এবং তারা হাসপাতালের অংশীজন হিসেবে সেবা দেবেন, চাকরিজীবী হিসেবে নয়। অতিরিক্ত ফি, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বা ঔষধ প্রদান, বা রোগী প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাদের নিবন্ধন বাতিল ও আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হবে।

 স্বেচ্ছাসেবক অন্তর্ভুক্তি

সেবামূলক পদে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক দুই ধরনের হতে পারে: দৈনিক ভাতাভোগী ও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমিক। তবে সবার জন্য বয়সসীমা, সময়সীমা ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

 নিম্নপদস্থ কর্মীদের মর্যাদা ও নিয়োগকাঠামো

হাসপাতালের আয়া, বুয়া, নার্স, বয় ইত্যাদি পদের কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তাদের উৎকোচ নির্ভরতা থেকে মুক্তি আনতে হবে। তাদের নিয়োগ কাঠামো হতে পারে: ৫০% সরকারি, ২৫% বেসরকারি (বেতনভুক্ত), ১০% স্বেচ্ছাসেবক, ১৫% ইন্টার্ন, এবং অতিরিক্ত ১০% এনজিওর মাধ্যমে। এতে কম খরচে উন্নত সেবা নিশ্চিত হবে এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে মান বৃদ্ধি পাবে।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ

সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ডায়াগনস্টিক টেস্ট পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। যেমন: এক্সরে মেশিন ও অপারেটর নিয়োগ দিয়ে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেবা দেবে। সরকার নির্ধারিত মূল্য ও নীতিমালা অনুসরণ করে “মেশিন নষ্ট”-এর অজুহাত এড়ানো সম্ভব। একইভাবে শৌচাগার পরিষ্কার, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, ও প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবায় এনজিও ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে।

 ঔষধ ব্যবস্থাপনা বেসরকারিকরণ

সরকারি হাসপাতালে ঔষধ চুরি একটি সাধারণ সমস্যা। এর সমাধানে ঔষধ সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তারা সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করবে এবং একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে রোগীর তথ্য সংরক্ষণ করে ঔষধ প্রদান করবে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।

 ডাক্তারদের জবাবদিহিতা

অতিরিক্ত ঔষধ ও টেস্ট প্রদান নিয়ন্ত্রণে ডাক্তারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তদারকি জোরদার করতে হবে।

 পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্ব স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা সংগঠন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে। তাদের কার্যালয় হাসপাতালের অভ্যন্তরে রাখার সুযোগ দিয়ে দ্রুত ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

 প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস

বর্তমান কর্মীদের ছাঁটাই না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত হয়ে কাজের নীতিমালা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, অ-ডাক্তার নিয়োগে পৃথক প্রশাসনিক (এডমিন) পোস্ট তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও মনোযোগ দিতে পারেন।

 বিভাগীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল

প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিশ্বের উন্নত মানের হাসপাতালের আদলে একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে ১০% বিদেশি ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান কাজের সুযোগ পাবেন। জনসংখ্যার অনুপাতে সিঙ্গাপুরের আদর্শ অনুসরণ করে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব।

 হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় উচ্চশিক্ষা

মেডিকেল কলেজগুলোতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডাক্তার ও অ-ডাক্তার উভয়ের জন্য এক বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা চালু করতে হবে।

 পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বে হাসপাতাল (হাইফাইভ হ্যান্ডশেক)

বিভাগীয় উন্নত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় “পাঁচ স্তম্ভ” পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও পরিচালনায় অংশ নেবে:

  • সরকার

  • বেসরকারি বিনিয়োগকারী

  • বিদেশি দাতা সংস্থা বা বন্ধুপ্রতিম দেশ

  • স্থানীয় জনগণ (হেলথকার্ডের মাধ্যমে)

  • দেশীয় সামাজিক সংগঠন ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা

জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল

প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশেষায়িত হাসপাতাল (পিজি হাসপাতালের মানসম্পন্ন) প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় নীতি, জমি বরাদ্দ ও কমিটি গঠন করতে হবে। এখানেও পাঁচ স্তম্ভ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে, যেমন: সরকার ৩০%, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ২৫%, বিদেশি সংস্থা ও এনজিও ২৫%, স্থানীয় জনগণ ১০% এবং প্রবাসীরা ১০% অংশীদার হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই অংশীদারিত্বের হার পরিবর্তনযোগ্য।

এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান উন্নত হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষ আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply