সভ্যতায় শাসক নির্বাচনে সামন্ত শ্রেনির ভূমিকা
বলা হয়ে থাকে বর্তমানে দেশে দেশে নির্বাচন ও বংশানুক্রমের বাইরে তৃতীয় পক্ষ বিশেষ করে সালিশী পদ্ধতিতে যেমন- সুশীল সমাজ, এলিট সোসাইটি ও সামন্তদের দ্বারা রাষ্ট্রের শাসক নির্বাচনের পদ্ধতিটির সূচনা হয় মধ্যযুগের ভারতে বা বাংলায়। রাজা শশাংকের মৃত্যুর পর যে অরাজকতা দেখা দেয় তা রুখতে উচ্চবংশীয় প্রজারা ‘‘ প্রকৃতিপুঞ্জ ‘’ বা ‘‘সুশীল সমাজ’’ বা সিভিল সোসাইটি গঠন করে রাজা নির্বাচন করেন গোপালকে। গোপাল ছিলেন একজন দক্ষ রাজ কর্মচারী। গোপালের বংশ ৪শ বছর রাজ্য পরিচালনা করে গেল।
যদিও ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় একে শুরা মজলিস বলা হয়। এছাড়া প্রাচীন রোমেও এ ধরনের পদ্ধতির কথা শোনা যায়। তবে সেটা প্রচলিত অর্থে সুশীল সমাজ দ্বারা নয় সেটা সামন্তশ্রেণী কতৃক নেতা নির্বাচন। সভ্যতার ইতিহাসে শাসক নির্বাচনের পদ্ধতি নানা রকম ছিল। আজকের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বা নির্বাচনব্যবস্থার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন গ্রীস থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ইউরোপ, এমনকি বাংলার ইতিহাসেও রয়েছে জনগণের দ্বারা বা নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক নির্ধারণের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
প্রাচীন গ্রীস ও রোম
৪০৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন গ্রীসে লটারির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্বাচন হতো। এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি বলে ধরা হয়। রোমান রাজ্যের সময়েও রাজা হতেন নির্বাচিত; সিনেট এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করত। একজন রাজা মারা গেলে ‘ইন্টাররেক্স’ নামক একজন অন্তর্বর্তী নেতা নতুন রাজা নির্বাচনের প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করতেন।
পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য
পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যকে একটি নির্বাচনী রাজতন্ত্র বলা হয়ে থাকে। যদিও হ্যাবসবার্গ বংশের সদস্যরাই প্রায়শই সম্রাট নির্বাচিত হতেন, তথাপি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন নির্বাচক পরিষদ দ্বারা সম্রাট নির্বাচন করা হতো। এটি ছিল একাধারে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের এক সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। এখানে যেকোনো লোককে হয়তো রাজা নির্বাচন করা হতো না। রাজা হওয়ার দাবীদার মধ্য থেকে ১ জন নির্বাচিত হতেন নিজ বংশীয় বা রাজবংশের সদস্যদের দ্বারা।
ভেনিস প্রজাতন্ত্র
৬৯৭ থেকে ১৭৯৭ সাল পর্যন্ত ভেনিস প্রজাতন্ত্রে শাসক হতেন ‘ডোজ’ (Doge)। ডোজকে আজীবনের জন্য নির্বাচিত করা হতো এবং এ নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট, যাতে কোনো একক পরিবার বা গোষ্ঠী পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। ভোটদানের আগে প্রাথমিক মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় লটারি ব্যবহার হতো। বেশকিছু প্রক্রিয়া পেরিয়ে তা সম্পন্ন হতো। ধারণা করা হয় আজকের রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা নির্বাচন বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার কিছু ছাপ রযেছে।
বোহেমিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল
বোহেমিয়ায় রাজা নির্বাচিত হতেন জমিদারদের দ্বারা। ১৬১৮ সালে স্থানীয়রা ফ্রেডেরিক পঞ্চমকে রাজা হিসেবে বেছে নেয়, যা হ্যাবসবার্গ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সূচনা করে।
বিষয়টা কিছুটা ছোটা রাজাদের দ্বারা বড়ো রাজা নির্বাচনের মতো ব্যাপার। যদিও বৃটিশ ভারতে প্রচলিত ‘‘চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত’’ এই পদ্ধতির উল্টো। বোহেমিয়ায় যেখানে জমিদারের তাদের স্বার্থের দিক বিবেচনা করে রাজা নির্বাচন করতেন। আর বৃটিশ ভারতে বৃটিশ সরকার তার প্রতি জমিদারদের আনুগত্য দেখে জমিদার নির্বাচন করতো।
বাংলার প্রেক্ষাপট
গোপালের উত্থান ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তখনকার সমাজে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলত—এই ‘মাৎস্যন্যায়’ দূর করার তাগিদেই সাধারণ মানুষ গোপালকে নির্বাচিত করে শাসনের দায়িত্ব দেন। পাল লিপিতে বলা হয়েছে, তিনি অবিচারীদের পরাভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলার ইতিহাসেও রাজা নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। শশাঙ্ক ছিলেন প্রথম স্বাধীন বাঙালি রাজা (৫৯০-৬২৫ খ্রি.)। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় পড়ে। পরে পালবংশের গোপাল মাৎস্যন্যায় অবসান ঘটাতে জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনে রাজা নির্বাচিত হন।
এখানে গোপালের রাজা হওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব প্রনিধান যোগ্য। কোনো ঐতিহাসিকের দ্বিমত থাকলেও মোটা এই তত্বটি প্রতিষ্ঠিত যে, শশাংকের মৃত্যুর পর বাংলায় অরাজকতা শুরু করে সমাজের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ সকলে সমস্যার সমাধানে আলোচনায় বসেন। তারা প্রকৃতিপঞ্জ নামে সুশীল সমাজ গঠন করে সকলের মতামত ও পরামর্শে তখনকার সবচেয়ে দক্ষ রাজ-কর্মচারী গোপলকে নতুন রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করেন।
রাজা বা শাসক নির্বাচন কেবল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থারই অংশ নয়, বরং বহু প্রাচীন সভ্যতায় এর অস্তিত্ব ছিল, কখনো আনুষ্ঠানিক, কখনো প্রথাগত রীতিতে। সময়ের ব্যবধানে এই প্রক্রিয়াগুলোর রূপ বদলেছে, কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্ব আজও অপরিবর্তিত।
আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার সূচনা
বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যবহৃত আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার শুরু হয় ত্রয়োদশ শতকে ইংল্যান্ডে, যখন প্রথম সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এরপর সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও গণতন্ত্রের ধারণা ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পায়। ১৮৭২ সালে গোপন ব্যালট চালু হয় এবং ১৯২৮ সালে ব্রিটেনে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে নির্বাচনের পদ্ধতি এক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
রাজা বা শাসক নির্বাচন কেবল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থারই অংশ নয়, বরং বহু প্রাচীন সভ্যতায় এর অস্তিত্ব ছিল, কখনো আনুষ্ঠানিক, কখনো প্রথাগত রীতিতে। সময়ের ব্যবধানে এই প্রক্রিয়াগুলোর রূপ বদলেছে, কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্ব আজও অপরিবর্তিত।

