সনাতন বৈদিক ধর্ম ও ইসলাম

সনাতন বৈদিক ধর্ম ও ইসলাম

সনাতন বৈদিক ধর্ম ও ইসলাম

স্বামী লক্ষ্মী শঙ্করাচার্য

বই: ইসলাম আতংক না আদর্শ

একেশ্বরবাদী সত্যধর্ম হলো ইসলাম। ইসলামের তাওহীদের বার্তা নতুন কিছু নয়। ইসলাম এক চিরন্তন বা সনাতন এক ধর্ম যা এই পৃথিবীতে চিরকাল বিরাজমান ছিল। আসুন এবার ভিন্নদৃষ্টিকোণ থেকে জেনে নিই।
কিছু হিন্দু ভাই ভুলবশত এটা মনে করেন যে, ইসলাম হলো আরব থেকে আগত এক বিদেশী ধর্মমত, আর তা হিন্দুত্ববাদের সাথে সাংঘর্ষিক বা এর বিপরীত। আগে আমিও এমনটা মনে করতাম। কিন্তু প্রকৃত ইসলামকে জানার পর আমি বুঝলাম যে, ইসলাম আরব থেকে আসা নয়, তা আরববাসীদের ধর্ম নয় এবং শুধুমাত্র আরববাসীদের জন্যও নয়। বরং তা ইসলাম সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে গোটা মানবজাতির জন্য। সেকথা ইসলাম নিজেই বলেছে।

কুরআনে এসেছে-
কুরআন মাজীদের সূরা-বাকারা, আয়াত-১৮৫-তে উল্লেখ হয়েছে ‘রমযান এমন একটি মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কুরআন (হচ্ছে) মানব জাতির জন্য জীবন বিধান, সৎপথের দিশা এবং (সত্য মিথ্যার) পার্থক্যকারী, অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে রোযা রাখবে; যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে বা সফরে থাকে, সে পরবর্তী (সময়ে) গুনে গুনে সেই পরিমাণ দিন রোযা পূরণ করে নেবে; (এতে) আল্লাহ তাআলা তোমাদের (জীবনকে) সহজ করে দিতে চান, আল্লাহ কখনোই তোমাদের (জীবন যাপন) কঠিন করতে চান না। আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুনে গুনে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূরণ করতে পারো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের যে পথ দেখিয়েছেন আশা করা যায় তোমরা তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করবে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করবে।’
এখানে ‘মানব জাতির’ কথা বলা হয়েছে। মুসলিম কিংবা আরববাসী শব্দ বলেনি।

এ রকমই সূরা-২৫, আল ফুরকান এ ১ নং আয়াতে আছে : ‘ কতো মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দার ওপর (সত্য মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী এই) ‘ফুরকান’ নাযিল করেছেন, যাতে করে সে (ব্যক্তি এর দ্বারা) সৃষ্টিকুলের জন্যে সতর্ককারী হতে পারে, এ নির্দেশ কোনোভাবে হিন্দু বা অন্যদের বিরোধী নয়, কেননা ইসলাম কোনো ব্যক্তি অথবা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় কিংবা কোনো ধর্মের বিরোধিতা করে না। ইসলাম কেবল ভ্রান্ত কথা এবং অন্যায়ের বিরোধিতা করে এবং এই বিরোধিতা কেবলমাত্র মৌলিক ও নীতিগত। এজন্য কোনো প্রকারের জোর জবরদস্তি ইসলামে নেই।

কুরআন মজীদের সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬-তে আল্লাহর আদেশ হলো ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই, (কারণ) সত্য (এখানে) মিথ্যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহদ্রোহী পথকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর দ্বীনের উপর ঈমান আনে, এতে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো, যা কোনোদিনই ছিঁড়ে যেতে পারেনা; আল্লাাহ সব কিছুই শোনেন এবং জানেন।’

সূরা ১০৯, আয়াত ৬-তে আছে: ‘(হে নবী,) তুমি বলে দাও, হে কাফিরগণ, আমি তার ইবাদাত করি না, তোমরা যার ইবাদাত করো, তোমরা তাঁর ইবাদাত করো না, যার ইবাদাত আমি করি, এবং আমি তাদের ইবাদাত করবো না, যাদের ইবাদাত তোমরা করো, তোমরা কখনো তাঁর এবাদাত করবে না, যাঁর ইবাদাত আমি করি; তোমাদের বিধান তোমাদের জন্য আর আমার বিধান আমার জন্য।’

আমি লক্ষ্য করেছি যে, ইসলাম প্রসঙ্গে হিন্দুদের এবং সনাতন ধর্ম প্রসঙ্গে মুসলিমদের ভালো ও সঠিক জ্ঞান না থাকার কারনে এক ধর্মকে অন্য ধর্মের বিপক্ষে মনে করে থাকে। আমার মতে, বাস্তবতা হলো এই যে, ইসলামের সবচেয়ে কাছাকাছি চিন্তার যদি কোনো ধর্ম থাকে তবে তা হলো ‘সনাতন বৈদিক ধর্ম’। তবে, বৈদিক সনাতন ধর্মকে বর্তমান হিন্দু ধর্ম মনে করে পাঠকরা যেন ভুল না করেন। কেননা হিন্দুধর্ম নামের কোনো ধর্ম নেই। হিন্দু ধর্ম বলে যা বলা হয় তা জীবনযাপনের একটা পদ্ধতি বা আচার মাত্র। মনে রাখা দরকার হিন্দুদের প্রকৃত ধর্মের নাম সনাতন বৈদিক ধর্ম, কিন্তু অত্যন্ত কষ্টের বিষয় যে, অধিকাংশ হিন্দু নিজেদের প্রকৃত ধর্ম অর্থাৎ সনাতন বৈদিক ধর্মকে প্রায় ভুলে গিয়ে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।

ভারতে বর্তমানে প্রায় পঁচাত্তর কোটি হিন্দু এবং পঁচিশ কোটি মুসলিম জনতা পাশাপাশি বসবাস করে। যদি আমরা একে অপরের ধর্মকে, একে অপরের চিন্তাভাবনাকে না জানি তাহলে মানবতা বিরোধীতত্ত্ব, সমাজবিরোধীতত্ত্ব অনায়াসে আমাদের মধ্যে ভুল-ভ্রান্তি, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস জন্ম দিতে পারে। যেমনটা আজকাল হচ্ছেও। এই দেশের জন্য এটা সব চেয়ে বড় সমস্যা। এজন্য এটা জরুরী যে, মুসলিম ভাইদের ধর্মকে হিন্দু ভাইয়েরা জানুক এবং সনাতন বৈদিক ধর্ম অর্থাৎ বেদ, উপনিষদ এবং গীতাকে মুসলিম ভাইরা জানুক। যেন ধর্মের নামে কেউই আমাদের মাঝে ভ্রান্তি অর্থাৎ ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে না পারে।

এটা একটা হিকমত বা কৌশল অন্য কথায় প্রজ্ঞা বা তত্ত্বপূর্ণ কথা। এই হিকমতের মাধ্যমে সত্য আমাদের সামনে চলে আসবে। অনেক ভ্রান্তি এবং সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থা বাড়বে। সত্যের প্রতিও বিশ্বাস বাড়বে এবং এই বিশ্বাস ও আস্থা ভবিষ্যতে মানুষদের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দেবে।
এ হিকমত (তত্ত্বপূর্ণ শিক্ষা) কুরআন থেকে এসেছে : ‘(হে নবী,) তুমি বলো, হে ঐশ্বী কিতাবধারীরা, এসো আমরা এমন এক কথায় একমত হই যা আমাদের কাছে এক, তাহলে আমরা উভয়েই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবো না এবং তাঁর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার বানাবো না, এবং আল্লাহ ছাড়া আমরা আমাদের কেউ অন্য কাউকে রব হিসেবে মেনে নেবো না; অতপর তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদের বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেকো, আমরা মুসলিম আমরা আল্লাহর সামনে আনুগত্যের মাথা নত করে দিয়েছি)।

-সূরা ৩ : আলে ইমরান, আয়াত ৬৪।

এই হিকমত অনুসারে আমরা দেখব সনাতন বৈদিক ধর্ম এবং ইসলামের কি কি মিল রয়েছে। এটা আমাদের উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক। (তবে আমরা যে, আমাদের প্রতিবেশীর ধর্ম সম্পর্কে জানব, সে জানা যেন ভুল পদ্ধতিতে না হয় এবং ভুল সূত্র থেকে জানা না হয়।)

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply